আলম তালুকদার : ছড়ার মতোই উজ্জ্বল

আমীরুল ইসলাম
১০ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৯ জুলাই ২০২০ ২৩:২৩

দুর্দান্ত এক ছড়াকর্মীর নাম আলম তালুকদার। ছড়ার নাচন তাকে প্রতিমুহূর্তে দোলায়িত করে। ছড়া কৃত্রিমভাবে নির্মাণের কোনো বিষয় নয়। ছড়া সব সময় স্বতঃস্ফূর্ত। ছড়ার বাকভঙ্গি অতিসহজ। শিশুর চোখ নিয়ে বিশ্বের দিকে তাকিয়ে থাকাই ছড়া। ছন্দ, ধ্বনিব্যঞ্জনা ও সুরে সুরে ছড়া গতিময়। চিরকালকে সমকালের সঙ্গে কিংবা সমকালকে চিরকালের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার নামই ছড়া। ছড়া ক্ল্যাসিকাল সাহিত্য মাধ্যম। আর এতসব কথা চেতনায় ঝঙ্কার তুলে আলম তালুকদারের নানাবিধ ছড়া পড়ে। কত সহজভাবে ভারী কথা বলা যায়। কত সহজে লোকছড়াকে বিনির্মাণ করা যায়। কত সহজে বিষয়কে গভীরতা দান করা যায়, সেসবের অসংখ্য উদাহরণ আলম তালুকদারের ছড়ায় ছড়িয়ে আছে।

কয়েকটি ছড়া থেকে উদাহরণ দেওয়া যাক-

১। যার কোনো কাম নেই/তার কোনো দাম নেই।

২। সামনে যখন ঘোড়া/তখন তুমি খোঁড়া/সামনে যখন ছাগল/তখন তুমি ভাগল।

৩। খাচ্ছিলাম খাই তো তাই/যাচ্ছিলাম যাইতো তাই।/পাচ্ছিলাম পাইতো তাই/নাচ্ছিলাম তাইতো তাই।

৪। ঐ দেখা যায় তালগাছ/এবং ভূতের সারি/তার ভেতরে একটা আছে/রাজাকারের বাড়ি।/ঐ রাজাকার চায় কি?/চুপিচুপি খায় কি? এ রকম অসংখ্য পঙ্ক্তি লিপিবদ্ধ করা যায়।

আলম তালুকদারের ছড়ার কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়-

১। খুব সহজভাবে তার ছড়া ছন্দ-সুরে নেচে ওঠে। ২। সহজ কথার আড়ালে অনেক গভীর কথা তিনি উপস্থাপন করেন। ৩। তিনি কষ্ট করে কোনো পঙ্ক্তি কৃত্রিমভাবে বানিয়ে তোলেন না। ৪। সমকালীন বিষয়কে তিনি চিরকালীন করে তোলার চেষ্টা করেন। ৫। ছড়ার রূপ-রস-গন্ধ তিনি সাম্যক উপলব্ধি করেন। হালকা চালের পদ্যে রূপান্তরিত করেন না। ৬। যেসব বিষয় নিয়ে প্রকৃত ছড়া তৈরি হয়, আলম তালুকদারের আগ্রহ সেদিকে। ৭। লোকছড়াকে ভেঙে তিনি আধুনিক ছড়া নির্মাণ করেন। ৮। অর্থহীন ধ্বনিপ্রধান শব্দ ব্যবহার করে তিনি অনেক অর্থ আবিষ্কার করেন। ৯। জন প্রচলিত শব্দকে তিনি অনায়াসে ব্যবহার করেন। ১০। নানা ধাঁচের ছড়া লিখে থাকেন তিনি। ছড়াকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রূপায়িত করেন।

আলম তালুকদারের ছড়া নিয়ে আরও অনেক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাবে। ছড়ার শিরোনাম, বইয়ের শিরোনাম- এসবের মধ্যেও ছড়াত্ব বজায় রেখেছেন নিপুণভাবে তিনি। এমন ছড়া অন্তঃপ্রাণ। ছড়ামগ্ন চঞ্চল ছড়াকার খুব বেশি দেখা যায় না। আলম তালুকদারের সঙ্গে দেখা হলেই একরাশ উচ্ছ্বাস। পান চিবানো মুখে অনর্গল ছন্দে ছন্দে কথা বলতে থাকেন। দ্বিধাহীন চিত্ত, পরোয়াহীন ব্যক্তি। মনের মধ্যে কিছু রাখেন না। সব খুলে বলে দেন। মুক্তজানালা তিনি। তিনি তার ছড়ার মতোই উজ্জ্বল। আজকাল অপ্রকৃত ছড়ায় ভরে গেছে ছড়ার অঙ্গন। ছন্দে ছন্দে কথা বললেই, ফুল নিয়ে কিছু লিখলেই যেন ছড়া হয়ে যায়। আলম তালুকদার এ ভিড়ের ভেতরেই আলাদা লেখক। তিনি নিজের মতো ছড়া লেখেন। তার ছড়ার মধ্যে নিজস্বতা খুঁজে পাওয়া যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে আলম তালুকদারের ছড়ার মনোযোগী পাঠক। কোনো কোনো ছড়া পড়ে চমকে উঠি, মুগ্ধ হই। কখনো তার মতো ছড়া লিখতে পারি না? কেন অর্থহীন শব্দবন্ধ তৈরি করতে পারি না? কেন আমার ছড়া সরল হয় না?

আলম তালুকদার আপনার সোনার কলমে আমাদের ছড়াসাহিত্য সমৃদ্ধ করেছে। তার জীবন ও কর্ম না লিখলেই নয়। নূর হোসেন তালুকদার তার আসল নাম। আর লেখক নাম আলম তালুকদার। তিনি ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছে গ্রামে। তিনি এক সময় বেগম সুফিয়া কামাল গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলেন। পরে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। আলম তালুকদার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার প্রথম বই ‘ঘুম তাড়ানো ছড়া’ প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। তার ছড়ার উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে ‘খোঁচান ক্যান’, ‘চাঁদের কাছে জোনাকি’, ‘ডিম ডিম ভূতের ডিম’, ‘ঐ রাজাকার’, ‘যুদ্ধে যদি যেতাম হেরে’, ‘বাচ্চা ছড়া কাচ্চা ছড়া’, ‘ছড়ায় ছড়ায় আলোর নাচন’, ‘জাদুঘরের ছড়া’, ‘ছড়ায় ছড়ায় টক্কর’, ‘ছড়া সমগ্র’ প্রভৃতি। তার লেখা শিশুতোষ গল্পের বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘মহাদেশ বাংলাদেশ উপদেশ’, ‘শিশুদের শিশুটামি’, ‘অবশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা’, ‘নাই দেশের রূপকথা’, ‘ভূতের সঙ্গে ভূত আমি’, ‘কিশোর সমগ্র’, ‘গল্প সমগ্র’ প্রভৃতি। উল্লেখযোগ্য সম্পাদিত বই হচ্ছে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল আহসান স্মারক গ্রন্থ’, ‘জাদুঘর বিচিত্রা’, ‘টাঙ্গাইল জেলার স্থান নাম বিচিত্রা’, ‘ছোট ছোট উপাখ্যান হাসিতে আটখান’।

লেখালেখির কারণে অনেক স্বীকৃতিও পেয়েছেন গুণী এই শিশুসাহিত্যিক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পালক অ্যাওয়ার্ড ১৯৯৬, চোখ সাহিত্য পুরস্কার ২০০০, অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার ১৪০৫, জসীমউদ্দীন পুরস্কার ২০০১, কবি কাদির নওয়াজ পুরস্কার ২০০৪, স্বাধীনতা সংসদ পুরস্কার ২০০৬, অলোক আভাষ সাহিত্য পত্রিকা পুরস্কার ২০০৬, শিল্পাচার্য জয়নুল পুরস্কার ২০০৮, সাহস সম্মাননা ২০১০, ফুটতে দাও ফুল সম্মাননা পদক ২০১১। সাহিত্যে জাতীয় পর্যায়ে অবদান রাখার জন্য টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ পুরস্কার লাটাই ছড়া সাহিত্য পুরস্কার ২০১৫ পেয়েছেন তিনি। আলম তালুকদার করোনা আক্রান্ত হয়ে ৮ জুলাই বিকালে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। তার মৃত্যুটা সবার কাছেই নিতান্ত অপ্রত্যাশিত ছিল। তার বিখ্যাত ছড়ার লাইন আমাদের প্রায় সবার মুখস্থ- ‘পড়িলে বই আলোকিত হই, না পড়িলে বই অন্ধকারে রই।’ তাই বলব সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষটি ছড়ার মধ্যেই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন।

আমীরুল ইসলাম : শিশুসাহিত্যিক