কেয়ামত থেকে কেয়ামত ইতিহাসের একটি অধ্যায়

ফয়সাল আহমেদ
১১ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২০ ০৯:০৭

অবশেষে তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করা শুরু করলেন। এটাই বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের শেষ লাইন! নায়ক-নায়িকার দেখা হবে, অতঃপর প্রেম, কয়েকটি গানের সঙ্গে নাচানাচি, তারপর বিয়ে করে সুখের সমাপ্তি। এটি যেন একটি সূত্র। এই সূত্র না মেনে আশির দশকের একদম শেষদিকে এসে হিন্দি রোমান্টিক ছবির ধারা পাল্টে দেয় ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’। আমির খান ও জুহি চাওলা অভিনীত ছবিটি ১৯৮৮ সালের ২৯ এপ্রিল মুক্তি পেয়েছিল, হয়েছিল ব্লকবাস্টার। কিশোর প্রেমের এই চলচ্চিত্র ওই সময় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ লুকে নয়, বরং সেখানে পাশের বাড়ির ছেলের মতো একটি চরিত্রে অভিনয় করেন আমির। এটি আশির দশকের ভারতীয় ছবির ধারা থেকে ছিল অনেক দূরে।

তবে দুটি অল্প বয়সের ছেলেমেয়ের মধ্যে সেই ধরনের প্রেমের গল্প এখানে চিত্রায়িত হয়েছে, তা মোটেও অবাস্তব ছিল না। আমির খান ও জুহি চাওলার সঙ্গে পরিচালক মনসুর খানের এই সিনেমার মাধ্যমে অভিষেক হয়। গতানুগতিক প্রেমের ছবির মতো ‘মধুরেন সমাপয়েৎ’-এ একেবারে ঝোঁক ছিল না মনসুরের। বাস্তবে তিনি আমিরের কাজিন। আবার ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবির চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক নাসির হুসেইন মনসুরের বাবা, অর্থাৎ আমিরের চাচা।

সিনেমার সমাপ্তি সুখের হবে, নাকি দুঃখজনক, এই নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে রীতিমতো গোল বেধে গিয়েছিল। নাসির হুসেইন চেয়েছিলেন নায়ক-নায়িকার মিলন। কিন্তু মনসুর হিন্দি ছবির প্রচলিত ধারা ভেঙে নায়ক-নায়িকার মৃত্যু দেখাতে চান। প্রযোজকের মতে, নায়ক-নায়িকা মরে গেলে সেই ছবি দর্শক ‘খাবে’ না! কিন্তু পরিচালক অনড়। একপর্যায়ে রাগ করে ছবির ক্রেডিট লাইন থেকে তার নাম বাদ দিয়ে দিতে বলেন। ‘লাইলি-মজনু’, ‘হীর-রানঝা’ আর ‘রোমিও-জুলিয়েট’-এর তো মধুর সমাপ্তি হয়নি। কিন্তু যুগ যুগ ধরে তাদের প্রেমকাহিনি তো হয়ে এসেছে উদাহরণ। ছেলের যুক্তির কাছে বাবা হার মানলেন।

‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবির মধুর ও বিষাদময় দুই ধরনের সমাপ্তিই শুট করা হয়। তবে চূড়ান্তভাবে আমির-জুহির সুখের মিলন নয়, বরং মৃত্যুর মাধ্যমে সমাপ্তি বেশি গ্রহণযোগ্য হয়। সেভাবেই ছবি মুক্তি দেওয়া হয়। বাকিটা ইতিহাস।

এদিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যদি জিজ্ঞেস করা হয় সর্বাধিক জনপ্রিয় নায়কের নাম কী? সবাই এক বাক্যে বলবেন সালমান শাহ। সে সালমান শাহের অভিষেক হয়েছিল ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মাধ্যমে। তার সঙ্গে অভিষেক হয় আরেক জনপ্রিয় অভিনেত্রী মৌসুমীর। ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ ছবিটি মুক্তি পায়।

মুক্তির এত বছর পরও এ দেশের মানুষের কাছে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ অনেক জনপ্রিয়। সে সময়ে প্রথম দিকে সিনেমা হল মালিকরা নতুন নায়ক-নায়িকার ছবি বলে চালাতে চায়নি। কিন্তু পরে ছবিটি এক ইতিহাস সৃষ্টি করে। বয়স্ক নায়কদের ভার্সিটিপড়–য়া ছাত্র দেখতে দেখতে ক্লান্ত দর্শকরা দারুণ পছন্দ করে তরুণ সালমান-মৌসুমী জুটিকে।

বলিউডের ছবি ‘কেয়ামত তক কেয়ামত’র অফিসিয়াল রিমেক ছিল এটি। পরিচালনা করেছেন সোহানুর রহমান। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আনন্দ মেলা তিনটি হিন্দি ছবি ‘সনম বেওয়াফা’, ‘দিল’ ও ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর কপিরাইট নিয়ে সোহানুর রহমান সোহানকে যে কোনো একটির বাংলা রিমেক করতে বলে। সেই সময় উপযুক্ত নায়ক-নায়িকা পাচ্ছিলেন না বলে সম্পূর্ণ নতুন মুখ দিয়ে ছবিটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রথমে নায়িকা হিসেবে মৌসুমীকে নির্বাচিত করা হয়। নায়ক হিসেবে তৌকীর আহমেদকে প্রস্তাব দিলে তিনি রিমেক চলচ্চিত্র হওয়ায় প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। পরে মডেল-অভিনেতা আদিল হোসেন নোবেলকে প্রস্তাব দিলে তিনিও তা ফিরিয়ে দেন। তখন নায়ক আলমগীরের সাবেক স্ত্রী খোশনুর আলমগীর ‘ইমন’ নামের একটি ছেলের সন্ধান দেন। প্রথম দেখাতেই তাকে পছন্দ করে ফেলেন পরিচালক এবং ‘সনম বেওয়াফা’ ছবির জন্য প্রস্তাব দেন। কিন্তু যখন ইমন ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবির কথা জানতে পারেন তখন তিনি এই ছবিতে অভিনয়ের জন্যই আগ্রহ প্রকাশ করেন। তার কাছে ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবি এতই প্রিয় ছিল যে, তিনি মোট ২৬ বার ছবিটি দেখেছেন বলে পরিচালককে জানান। শেষ পর্যন্ত পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তাকে নিয়ে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন এবং নায়কের ‘ইমন’ নাম পরিবর্তন করে সালমান শাহ রাখেন। এটিও একটি ইতিহাস।