আমাদের নিরাশা আমাদের আশা

আজাদুর রহমান
১৩ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২০ ২১:৪৬

যে কোনো দুর্যোগে মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়ে। তারা অস্থির ও অসহায় হয়ে যায়! কিন্তু আশা ছাড়ে না। বিপদের কামড় যত তীব্র হয়, মানুষের বুকে আশাও তেমন টান টান হয়ে যায়। মানুষের ওই এক স্বভাবÑ মরতে মরতেও সে প্রবলভাবে জীবনকে প্রাণপণে আকড়ে ধরে। শেষমেশ আশাই মানুষকে হাত ধরে টেনে তোলে। আকস্মিক বন্যা কিংবা নিকট অতীতের ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’-এর কথাই ধরুনÑ যেন মুহূর্তের এক আতঙ্ক ত্রাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের উপকূলজুড়ে। মানুষ ভয় পেয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কেউ কেউ মারা পর্যন্ত গেছেন। কিন্তু মানুষ তবুও আশা ছাড়েনি। আশা মানুষকে প্রাণশক্তি দেয়, ভরসা ও স্বস্তি দেয়। মানুষের এই যে আশা, এই যে নিরন্তর জীবনের প্রতি ভরসাÑ তা কেবল তাদের অভিজ্ঞতা আর বিশ্বাসের ফল। কারণ মানুষ জানে দুর্যোগের তা-ব যতই ভয়াবহ হোকÑ সময়ে ঝড় থেমে যাবে, পৃথিবী আগের মতো শান্ত হবে, মানুষ আবার নতুন করে ফিরে পাবে বাঁচার আশা ও উপায়। তবে ব্যাপারটা যদি একভাবে না ঘটে, যদি আর কোনো আশা না থাকে, যদি জানা যায় নিকট ভবিষ্যতে কেবল অন্ধকার, যদি বিপদের সীমানা জানা না থাকেÑ তা হলে! জালে আটকা পড়া মাছের ভাগ্যের মতো মানুষ কেবল ভেঙে ভেঙে পড়তেই থাকে।

হ্যাঁ, করোনার কথা বলছি। মানুষবিনাশী মহামারীর কথা বলছি। মানুষের মতো এত বড় কৌশলী প্রাণী ঢাল-তলোয়ারহীন হয়ে এভাবে বিপদের মুখে পড়বে, ভাবায় যায়নি! বিপদটা আঞ্চলিক বা মহাদেশীয় হলেও না হয় কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। আইসল্যান্ড থেকে শ্রীলংকা, অস্ট্রেলিয়া থেকে আফগানিস্তানÑ কোথাও বাদ পড়েনি। এ গ্রহের সব কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়েছে এই মারণাস্ত্র, জীবনধ্বংসী অণুজীব কোভিড-১৯ নামের ভাইরাস। চীনের উহান শহর থেকে বেরিয়ে পড়া এই করোনা দিন কে দিন ছড়িয়ে যেতে যেতে এখন বিশাল এক মানুষখেকো দানবে পরিণত হয়েছে। বিরাট এ জীবজগতে বেছে বেছে শুধু মানুষকেই যেন হত্যা করতে নেমেছে এটি! মানুষ জান বাঁচাতে ঘরে ঘরে উঠে এসেছে আর প্রকৃতিও যেন বহু বছর পর নিজেদের মতো করে স্বচ্ছন্দে বাঁচার অধিকারটুকু ফিরে পেয়েছে। কোথাও মানুষের অত্যচার নেই। ফলে মানুষ ছাড়া সব জীব আজ সুখী, ঝলমলে, প্রাণবন্ত, ভয়হীন, বর্ণিল। অবাধ প্রাণী ও উদ্ভিদ নিজের স্বভাবে ফিরে এসেছে। জেলি ফিশ পর্যন্ত ভেসে ভেসে চলে এসেছে শহরের ক্যানেলে। দিল্লির রাস্তায় নীল গাই। ইতালির পথে হরিণ আর পিচ কিংবা পাথুরে পথেও সুযোগমতো মাথা তুলেছে ফুল, তরুলতা। কিন্তু মানুষ! তার কী হবে!

মানুষের চোখ-মুখে লেগে আছে গাঢ় অন্ধকারের কালো। তারা নিরুপায়, সহায়হীন। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে বিশ্বের বিজ্ঞানীদের মুখের দিকে। চেয়ে আছে ল্যাবরেটরিগুলোর দিকে! দুরাশা সেখানেই। কোভিড-১৯ মোকাবিলা করতে পারেÑ এমন কোনো ভ্যাসসিন কোথাও এখন পর্যন্ত সরাসরি মানবদেহে কার্যকারিতাসহকারে প্রয়োগিক পথ পায়নি! এতদিনে যে পথ বিজ্ঞানীরা পাড়ি দিতে পেরেছেন, তা কেবল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বৃত্তের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে! তাই মোদ্দা কথা, কোনো আশা নাই!

এদিকে ফেসবুক থেকে শুরু সবখানে মেডিসিনের ব্যাপারে আমরা কেবল কান পচানো সস্তা বুলি শুনে চলেছি। সত্যি কথাটা হলো, কোভিড ১৯-এর সুনির্দিষ্ট কোথাও কোনো মেডিসিন আবিষ্কার হয়নি! সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হলো, কবে নাগাদ ভ্যাসসিন বা মেডিসিন পাওয়া যাবেÑ এসবেরও কেউ কোনো ঠিকানা করতে পারেননি। ভয়াবহ আতঙ্কটা হলো এইÑ আমরা কেউ জানি না, এই মহামারীর শেষ কোথায়! ফলে আমরা একটা অনিশ্চিত এবং আপাতদীর্ঘস্থায়ী এক অন্ধকার চোখে-মুখে নিয়ে বসে আছি! আমরা নিয়ম করে প্রতিদুপুরে করোনার আপডেট শুনছি। আমরা আক্রান্ত হচ্ছি। আমরা মারা যাচ্ছি। ভেতরে ভেতরে চরম ভয়ে এতটুকু হয়ে যাচ্ছি। আমাদের ঘুম হচ্ছে না। আমাদের শরীর ভেঙে যাচ্ছে! আমরা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি, একাকী নিরাত্মীয় অসহায় এক মুত্যু!

ক্রমেই গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে ভয়! আগে তবুও কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস আর তর্ক ছিল! এখন সবাই জেনে গেছেন, বুঝে নিয়েছেন। যে মানুষের পেটে বিজ্ঞানের ‘ব’ নেই, সেও এখন জানেÑ কোয়ারেন্টিন কী, আইসোলেশন ঠিক কাকে বলে! হ্যাঁ, উচ্চারণে সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষও আজ জেনে গেছে মাস্ক কী এবং কেন, করোনা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে। হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবহারবিধিসহ তারা এও জেনে ফেলেছেন, লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব কেন এত ভালো আমাদের জন্য! এসব সামান্য কিছু আশাই এখন অসামান্য হয়ে টিম টিম করে জ্বলছে আমাদের চারপাশে। এ সচেতনতা টিকিয়ে রাখাই আমাদের একমাত্র ভরসা, সুনির্দিষ্ট সম্বল।

আজাদুর রহমান : গবেষক ও লেখক