রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির দায় নিচ্ছে না কেউ

দুলাল হোসেন
১৪ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২০ ০১:০৭
পুরোনো ছবি

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতি মানেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হাসপাতালটির লাইসেন্স না থাকা, নিম্নমানের চিকিৎসা, আইসিইউর যথাযথ সুবিধা না থাকাসহ নানা অসঙ্গতির কথা জেনেই গত ২১ মার্চ তাদের সঙ্গে চুক্তি করে অধিদপ্তর। কিন্তু এখন এ চুক্তির দায় নিচ্ছে না কেউ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এ চুক্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে এমন বক্তব্যের কারণে অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজনের নির্দেশে অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক রিজেন্ট হাসপাতাল পরিদর্শন করে রিপোর্ট দেন। সে অনুযায়ী সমঝোতা স্মারক তৈরি করে চুক্তি স্বাক্ষর করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। রিজেন্টের কেলেংকারি প্রকাশের পর গত শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক ব্যাখ্যায় জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এমন বক্তব্যের একদিন পরই বিবৃতির ব্যাখ্যা চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক একজন কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য রিজেন্ট হাসপাতালের নথি চাইলে শাখার অফিস সহকারী ও জুনিয়র কর্মকর্তা হাসপাতালটির অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছিলেন। বিষয়টি মহাপরিচালকের অজানা থাকার কথা নয়। পরিচালক তার সরেজমিনে রিজেন্ট হাসপাতাল পরিদর্শনের রিপোর্ট,

হাসপাতালের লাইসেন্স ২০১৪ সালের পর নবায়ন না করা, তিনবার নোটিশ দিয়ে জরিমানা করাসহ যেসব অনিয়ম রয়েছে সেগুলো উল্লেখ করে নথি মহাপরিচালকের কাছে উপস্থাপনও করার নিয়ম। এর পর একইভাবে মহাপরিচালকও নথিতে হাসপাতালের লাইসেন্স নেই ও তিনবার জরিমানা করার ঘটনাসহ আরও যেসব অনিয়ম আছে তার নোট দিয়ে নথিটি উপস্থাপন করার কথা। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখা বা মহাপরিচালক এসব না করেই নথি করলে তারা অন্যায় করেছেন। তারা যদি মন্ত্রণালয়ের মৌখিক বা লিখিত নির্দেশে করে থাকেন, সেটি নথিতে নোট দেবেন। সবকিছু যথাযথভাবে উল্লেখ করার পর যদি মন্ত্রণালয় চুক্তি সম্পন্ন করতে নির্দেশ দেয় তার দায় মন্ত্রণালয়ের। আর যদি অনিয়মের বিষয়গুলো গোপন করে নথি প্রস্তুত করা হয়ে থাকে তার দায় অধিদপ্তরের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (প্রশাসন) ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যদি কোনো হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করার ইচ্ছা পোষণ করে তা হলে অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখা প্রথমেই নথিপত্র যাচাই করে দেখবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা। ঠিক থাকলে চুক্তি করতে পারে। আর যে হাসপাতালের কাগজপত্র ঠিক নেই, তার সঙ্গে চুক্তি করা যাবে না। লাইসেন্সহীন রিজেন্ট হাসপাতাল একটি অবৈধ প্রতিষ্ঠান, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চুক্তি করতে পারে না। যদি করে থাকে সে জন্য পরিচালক (হাসপাতাল) ও মহাপরিচালক দায়ী হবেন।

গত শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি গ্রুপের প্রতারণার ঘটনায় নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (সমন্বয়) ডা. জাহাঙ্গীর কবির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সম্প্রতি রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে কিছু আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. সাহেদ করিমের বিভিন্ন প্রতারণার তথ্য বেরিয়ে আসছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ সম্পর্কে অবগত ছিল না। মার্চে করোনা আক্রান্ত রোগী যখন কোনো হাসপাতাল ভর্তি নিচ্ছিল না তখন রিজেন্ট হাসপাতাল কোভিড ডেডিকেটেড হিসেবে চুক্তি করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে। তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করে। তবে তার আগে ক্লিনিক দুটি পরিদর্শন করে চিকিৎসার পরিবেশ উপযুক্ত দেখতে পেলেও তার লাইসেন্স নবায়ন ছিল না। লাইসেন্স নবায়নের শর্ত দিয়ে ২১ মার্চ রিজেন্টের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয়। গোয়েন্দা ও অন্যান্য সূত্রে রিজেন্ট নিয়ে তাদের কাছে অভিযোগ আসছিল, এর ভিত্তিতে ৬ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রতিনিধির উপস্থিতিতে র‌্যাব অভিযান চালায়। রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে অধিদপ্তরের অবস্থান পরিষ্কার এবং একটি ভালো কাজ করতে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতারিত হয়েছে। ৭ জুলাই হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’

এমন বিজ্ঞপ্তির পরদিন পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে ব্যাখ্যা চায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব (পার-২) শারমিন আক্তার জাহান স্বাক্ষরিত ওই অফিস আদেশে বলা হয়, ‘বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির প্রতি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করেছে। প্রসঙ্গত, যে কোনো হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির আগে তা সরেজমিন পরিদর্শন, হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি, জনবল ও ল্যাব ফ্যাসিলিটি বিশ্লেষণ করে বিবেচিত হলেই চুক্তি করার সুযোগ রয়েছে। রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তির আগে কী কী বিষয় বিবেচনা করা হয়েছিল, চুক্তি করার শর্তগুলো প্রতিপালনে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে কী বোঝানো হয়েছে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রদান করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’