যেভাবে চীনের মহা [নিয়ন্ত্রণ]প্রাচীর ভেঙেছিল সামাজিক মাধ্যম

ক্লে শারকি
১৪ জুলাই ২০২০ ১৮:৫৮ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২০ ২০:৪৯

সামাজিক মাধ্যম তাত্ত্বিক ক্লে শারকি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইটে তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট প্রযুক্তির সামাজিক ও অর্থনেতিক প্রভাব বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখিতে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। ২০২০ সালে তিনি ফরেন পরিলিসর শীর্ষ শত বৈশ্বিক চিন্তকের তালিকায় তার নাম ছিল। শারকি ২০০৯ সালের জুনে টেড প্ল্যাটফর্মে তিনি এই বক্তৃতা করেন। বক্তৃতাটি বাংলায় ভাষান্তর করার জন্য শারকি অনমুতি দিয়েছেন দৈনিক আমাদের সময়কে

ধারাবাহিক তিন পর্বের রচনার দ্বিতীয় পর্ব এটি—

দ্বিতীয় গল্পটা শোনা যাক। [২০০৮ সালের] মে মাসে চীনের সিচুয়ান প্রদেশে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয় [৪]। রিখটার স্কেলে মাত্রা সাত দশমিক নয়। বিশাল এলাকাজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভূমিকম্প যখন হচ্ছিল, খবরটা তৎক্ষণাৎ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, লোকজন তাদের ফোন থেকে তাৎক্ষণিক তথ্য জানানো শুরু করে। তারা ভবনগুলোর ছবি তোলে। কেঁপে উঠা ভবনগুলোর ভিডিও ধারণ করে। সঙ্গে সঙ্গে এসব ছবি ও ভিডিও তারা চীনের সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট সেবা কিউকিউ সাইটে আপলোড করে দেয়। ছড়িয়ে দেয় টুইটারেও। ফলে, ভূমিকম্প আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদও ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক সংযোগের সুবাদে যে যেখানে ছিল—চীনের স্কুলশিক্ষার্থীরা, অফিসের কর্মীরা কিংবা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষই সংবাদটা তৎক্ষণাৎ শুনতে পায়। বিবিসি ভূমিকম্পটার কথা প্রথম জানতে পারে টুইটার থেকে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ দপ্তর যতক্ষণে অনলাইনে এ কম্পনের তথ্য জানায়, তার কয়েক মিনিট আগেই টুইটারে খবরটা ছড়িয়ে পড়ে। চীনে এর আগে শেষবার যখন এ ধরনের শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল, তখন কর্তৃপক্ষের তিন মাস সময় লেগেছিল শুধু তা স্বীকার করতে যে, হ্যাঁ এটা বাস্তবিকই ঘটেছে।

সম্ভবত এবার দ্রুত জানতে পেরে চীন খানিকটা খুশি। কিন্তু বিপর্যয়ের ছবিগুলো অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ায় কর্তৃপক্ষ কীভাবে দেখছে বিষয়টাকে? তাদের তো আসলে কিছুই করার ছিল না। কারণ, কাণ্ডটা তো ঘটিয়েছে নিজ দেশের নাগরিকরাই। এমনকি স্বয়ং সরকারও ভূমিকম্পের খবর প্রথম শুনেছে নাগরিকদের থেকেই, সিনহুয়া বার্তা সংস্থা থেকে নয় কিন্তু।

অবশ্য সে খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে। বিশ্বের সবচেয়ে খুদে বার্তার প্ল্যাটফর্ম টুইটারে শীর্ষ দশটা ক্লিকের মধ্যে নয়টাই ছিল ওই কম্পন নিয়ে। ব্যবহারকারীরা যে যতটুকু জানে তথ্য সংযুক্ত করছিল, কেউবা সংবাদসূত্রগুলো উল্লেখ করছিল, কেউবা মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার কথা বলছিল। শীর্ষ দশের শেষেরটা ছিল ট্রেডমিলে উঠে পড়া একটা বিড়ালছানার খবর, ইন্টারনেট বলে কথা!

কিন্তু প্রথম কয়েক ঘণ্টায় শীর্ষ দশ ক্লিকের নয়টাই ছিল কম্পন নিয়ে। রাত গভীর হবার আগেই তহবিল সংগ্রহের সাইটগুলো বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। সারা বিশ্ব থেকেই অর্থসাহায্য জমা পড়ছিল। সে এক অবিশ্বাস্য বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ার উদাহরণ। চীনে যে কবার মুক্তসংবাদ প্রবাহ ঘটেছে, ওই সময়টা ছিল অন্যতম। তখন চীন ভাবল, জনগণকে তথ্য বা খবর প্রকাশে সুযোগ দেওয়াই যায়। কিন্তু তারপর যা ঘটল—কী কারণে সিচুয়ান প্রদেশের অনেক স্কুলের ভবন ভূমিকম্পে ভেঙে পড়েছে, লোকে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে শুরু করল। দুঃখের বিষয় হলো, স্কুল চলাকালে ভূমিকম্পটা আঘা হেনেছিল। জনগণ আওয়াজ তুলল, বহু স্কুলভবন ধ্বংসের নেপথ্যের কালপ্রিট আসলে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। এসব কর্তাব্যক্তি ঘুষ খেয়েছিলেন বলে নির্মাণনীতি উপেক্ষা করে দুর্বল ভবনগুলো গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। নাগরিক সাংবাদিকরাও এ বিষয়ে জোর আওয়াজ তুললেন। একটা ছবি তো বেশ আলোচিত হয়েছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম পৃষ্ঠায় সে ছবি ছাপা হয়েছিল। প্রতিবাদীরা ঘরে ফেরানোর অনুরোধ করতে গিয়ে একজন স্থানীয় আধিকারিক রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের সামনে সেঁজদায় পড়ে গিয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে বিনয়ের সুরে বলেছিল, ‘তোমাদের ক্ষোভ দূর করতে আমরা সব কিছুই করব, শুধু তোমরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করা বন্ধ করো।’

কিন্তু বিক্ষোভকারীরা চটে গিয়েছিল আরও। চীন যেহেতু এক সন্তান নীতির দেশ, ভূমিকম্প তো ওদের পরবর্তী প্রজন্ম বলতে আর কিছু রাখেনি। যে লোকের একমাত্র সন্তানটি মারা গেছে, তার তো আর হারানোর কিছু নেই। ফলে, বিক্ষোভ চলতে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে চড়াও হলো চীন সরকার। নাগরিক মিডিয়া যথেষ্ঠ বাড় বেড়েছে, নিয়ন্ত্রণ করতে তাই শুরু হলো ধরপাকড়। যারা বিক্ষোভের খবর দিচ্ছিল, সেসব মিডিয়া বন্ধ করে ছাড়ল।

ম্যাজিনো দুর্গরেখার মতোই চীনের এই দমনদেয়াল তোলা হয়েছিল ভুল দিকে, ভুল নিশানায়। অলঙ্করণ : হাইড ডট মি

 

ইন্টারনেট অবদমনে (সেন্সরশিপ) চীনই সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে সফল শাসক। এই দমনটা তারা চালায় একটা শাসননীতির মাধ্যমে, যাকে বলা হয় ‘গ্রেট ফায়ারওয়াল অব চায়না’ বা ‘চীনের মহানিয়ন্ত্রণপ্রাচীর’ [৫]। চারটা বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে চীন এই নীতিটা তৈরি করে। তারা মনে করে : এক. যোগাযোগ মাধ্যমগুলো পেশাদারী ব্যক্তিরা চালায়; দুই. সমালোচনাগুলো সব দেশের বাইরে থেকে হয়; তিন. কথাবার্তাগুলো তুলনামূলক কম বিক্ষিপ্ত এবং চার. কথোপকথনের প্রবাহ তুলনামূলক মন্থরগতির।

চীনের ভাবনা ছিল, দেশের ভেতর যখন সমালোচনামূলক কথাবার্তা ‘অনুপ্রবেশ’ করবে, তখন তারা সেগুলোকে ছেঁকে ফেলতে সক্ষম হবে। কিন্তু ম্যাজিনো দুর্গরেখার [৬] মতো চীনের এই দমনদেয়াল তোলা হয়েছিল ভুল দিকে, ভুল নিশানায়। কেননা, এই পরিস্থিতিতে ওই চারটা ভাবনার একটাও সঠিক ছিল না। মিডিয়া সরব হয়েছিল স্থানীয়ভাবে। অপেশাদাররাই আওয়াজ তুলেছিল। সবকিছু যেন ‘একটা দমকা হাওয়া’র মতো ঘটে গিয়েছিল। আর এত অবিশ্বাস্য পরিমাণে বেশি কথা উঠেছিল যে, তা ছাঁকার কোনো সুযোগমাত্র পায়নি কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু টানা কয়েক বছর ধরে ওয়েব নিয়ন্ত্রণ করে এ বিষয়ে ভালোই হাত পাকিয়ে ফেলেছে চীন সরকার। তারা এখন সিদ্ধান্ত নিতে শিখে গেছে, কোনটা গ্রাহ্য করবে আর কোনটা করবে না। আবার কখনও কখনও পুরো সেবাটাই তারা বন্ধ করে দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ, অপেশাদার যোগাযোগ মাধ্যমে রূপান্তরটা এত বড় পরিসরে ঘটে গেছে যে, এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই আর সম্ভব হচ্ছে না।

এমনকি এ সপ্তাহেই এরকম ঘটনা ঘটেছে। চীন ঘোষণা দিয়ে টুইটার পুরোপুরি বন্ধ করেছে, তিয়ানানমেন বসন্তের ২০ বছর পূর্তির ঠিক দুদিন আগে [৭]। তাদের মনে হয়েছে, এ সেবা বন্ধ না করলে তিয়ানানমেন কাণ্ড নিয়ে সমালোচনা দমন করা সম্ভব হবে না। কষে ছিপি আঁটা ছাড়া গত্যান্তর নেই।

ভাষান্তর : জাহাঙ্গীর আলম : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী এবং দৈনিক আমাদের সময়-এর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক।

তথ্যটীকা

[৪] শক্তিশালী ভূমিকম্পটিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৮০ হাজারের বেশি মানুষ। সূত্র : www.xinhuanet.com/english/2018-02/13/c_136972273.htm

[৫] সাইবারজগৎ নিয়ন্ত্রণে চীনের এ পদক্ষেপ নিয়ে সাংবাদিক জেমস গ্রিফিথস একটি বই লিখেছেন একই নামে, ‘দ্য গ্রেট ফায়ারওয়াল অব চায়না’। সাইবার-সার্বভৌমত্ব নিয়ে রাষ্ট্রীয় মাথাব্যথা নতুনও না, শুধু চীনেরও না। গ্রিফিথস বইতে বলছেন, ইন্টারনেট অধিকার সংস্থা ইলেক্ট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা জন পেরি বারলো যুক্তরাষ্ট্র সরকারের যোগোযোগ শালীনতা আইনের বিরুদ্ধে ‘সাইবার স্বাধীনতরা ঘোষণা’ দিয়ে ১৯৯৬ সালে লিখেছিলেন, ‘হে শিল্পবিশে^র সরকারেরা, ...আমার বসবাস সাইবারবিশে^। এ হলো মনের নতুন বাড়ি। ভবিষ্যতের পক্ষ থেকে বলছি, হে সেকেলে অতীত, তোমরা আমাদের মুক্ত থাকতে দাও। ... আমরা যেখানে সমবেত হই, সেখানে তোমাদের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই। ...আমাদের শাসন করবার কোনো নৈতিক অধিকার তোমাদের নেই। তোমাদের কোনো জোরজবরদস্তিই আমরা থোড়ায় পরোয় করি।’ সূত্র : www.newscientist.com/article/mg24132210-400-chinas-great-firewall-and-the-war-to-control-the-internet

[৬] ম্যাজিনো দুর্গরেখা (maginot line) ছিল জার্মানির বিরুদ্ধে ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান রণকৌশল। ইতালি, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও লাক্সেমবার্গের সঙ্গে নিজ সীমান্ত ধরে এ প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করেছিল ফরাসিরা। যুদ্ধমন্ত্রী আন্দ্রে ম্যাজিনোর নামে নাম। জার্মানির সঙ্গে থাকা সীমান্তে এ দুর্গরেখায় সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মজুদ রেখেছিল ফ্রান্স। কিন্তু বেলজিয়াম ও লাক্সেমবার্গের সাথে সীমান্তে আরদেনেস বনের দিকে প্রতিরক্ষাপ্রস্তুতি দুর্বল ছিল। আর ওই দুর্বল দিক দিয়েই জার্মানি আক্রমণ চালিয়েছিল যা ফ্রান্স কল্পনা করতে পারেনি। এজন্য ম্যাজিনো দুর্গরেখাকে ‘বড় সামরিক ভুল’ বলে অভিহিত করা হয়। সূত্র : web.archive.org/web/20071202110359/http://www.dushkin.com/text-data/articles/23427/23427.pdf  

[৭] সংবাদক্ষেত্রের ও মনোভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের দাবিতে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়ানানমেন চত্বরে ১৯৮৯ সালের বসন্তে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শুরু করেছিল স্বাধীনতাকামীরা। বিক্ষোভ দমনে কঠোরভাবে চড়াও হয়েছিল তৎকালীন সরকার; ৪ মে সামরিক অভিযান চালানো হয়। সরকারি হিসেবে এতে মারা যায় তিনশর কম মানুষ। কিন্তু বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ উপন্যাসিক মা জিয়ান ২০০৯ সালে ‘বেইজিং কোমা’ বইতে লিখেছেন, ‘বিশ বছর আগে তিয়ানানমেন হত্যাকাণ্ড বেইজিংকে ছারখার করে দিয়েছিল। হাজার হাজার নিরস্ত্র নাগরিক খুন হয়েছিল। লাখ লাখ মানুষের জীবনধারা উল্টে গিয়েছিল।’ সূত্র : www.theguardian.com/world/2009/jun/02/tiananmen-square-protests-1989-china

 

প্রথম পর্ব : যোগাযোগে নতুন ইতিহাস নির্মাণ করছে সামাজিক মাধ্যম