শাজাহান সিরাজকে শেষ বিদায়

কাজল আর্য টাঙ্গাইল
১৬ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২০ ০০:২৫

তিনি ছিলেন গণমানুষের নেতা। স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক। তাই তো শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর চোখের জলে সাবেক মন্ত্রী শাজাহান সিরাজকে শেষবারের মতো বিদায় জানালেন টাঙ্গাইলের কালিহাতীর মানুষ। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় অ্যাম্বুলেন্সযোগে শাজাহান সিরাজের মরদেহ ঢাকা থেকে এলেঙ্গায় পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

এর আগেই প্রিয় নেতাকে একবার দেখার জন্য দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। তার দীর্ঘ দিনের শতশত রাজনৈতিক সহকর্মী, ভক্ত অনুসারীরা অপেক্ষায় থাকেনÑ কখন একটু সুযোগ পাবেন শেষ দেখাটা দেখার।

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা সরকারি শামসুল হক কলেজ মাঠে বুধবার দুপুর ১২টার দিকে প্রথম জানাজা ও দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে কালিহাতী সদরের শাজাহান সিরাজ কলেজ মাঠে দ্বিতীয়

জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীম আরা নিপার উপস্থিতিতে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় জাতির এই বীর সন্তানকে। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ জানাজায় অংশ নেন। করোনা ভাইরাসের কারণে সামজিক দূরত্ব মেনে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় মাঠে লোক সংকুলান হয়নি। পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ জানাজা পড়েন।

দুই স্থানেই প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এ সময় বক্তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের কথা স্মরণ করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে সবার উদ্দেশে কথা বলেন শাজাহান সিরাজের মেয়ে ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা।

জানাজায় অংশ নেন টাঙ্গাইল-৪ কালিহাতী আসনের সংসদ সদস্য হাছান ইমাম খান সোহেল হাজারী, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী বিকম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য লুৎফর রহমান মতিন, টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল, টাঙ্গাইল জেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম রফিক। আরও ছিলেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শুকুর মাহমুদ, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও কালিহাতী পৌরসভার মেয়র আলী আকবর জব্বার, এলেঙ্গা পৌর মেয়র নূর এ আলম সিদ্দিকীসহ জেলা ও উপজেলা বিএনপি, আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতারা।

শাহজাহান সিরাজ মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকৎসাধীন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন। তার মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে। শাজাহান সিরাজের স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ জানিয়েছেন মরদেহ ঢাকার বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে।

রাজনীতিবিদ শাজাহান সিরাজ ১৯৪৩ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। শাজাহান সিরাজ স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী রাজনীতির ‘চার খলিফা’র একজন। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ৩ মার্চ ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ।

শাজাহান সিরাজ একজন তুখোড় ছাত্রনেতা হিসেবে ষাটের দশকে ‘বঙ্গের আলীগড়’খ্যাত টাঙ্গাইলের করটিয়ার সরকারি সা’দত কলেজের ছাত্র সংসদের ২ বার ভিপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে দক্ষ, জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ শাজাহান সিরাজ জাসদ ও বিএনপির প্রার্থী হয়ে ১৯৭৯, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে ৫ বার টাংগাইল-৪ (কালিহাতী) আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিএনপি সরকারের নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, বন ও পরিবেশ, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন। স্বাধীনতার পর শাজাহান সিরাজ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি জাসদ থেকে বিএনপিতে যোগ দেন। পরে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান হন।

শিক্ষানুরাগী হিসেবে তিনি কালিহাতী উপজেলা সদরে কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজসহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তিনি স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ, এক ছেলে রাজীব সিরাজ শুভ এবং এক মেয়ে ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।