ঈদে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও শক্তি বৃদ্ধিতে খান পরিমিত মাংস

ফাতিম তুজ জুহুরা,নিউট্রিসন কন্সালটেন্ট
৩১ জুলাই ২০২০ ২১:০০ | আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২০ ২১:০০
ফাতিম তুজ জুহুরা

অনেকেই মনে করেন গরুর মাংস খুব ক্ষতিকর, অনেক কোলেস্টেরল, এটা খেলেই ওজন বেড়ে যাবে, হার্ট অ্যাটাক হবে, আরো কত কি?  আসলে যদি পরিমিত পরিমাণে, গরুর কম চর্বিযুক্ত অংশ নির্বাচন করে এবং সঠিক পদ্ধতিতে, জেনে বুঝে গ্রহণ করা যায় তাহলে গরুর মাংস খুবই উপকারী একটি খাবার। বিশেষ করে এটি শিশু কিশোর ও বর্ধনশীল শিশুদের জন্য খুবই দরকারি। আল্লাহপাক আমাদেরকে হালাল হিসেবে এই খাবারটা দিয়েছেন সুতরাং এ খাবার এর পুষ্টিগত উপাদান থেকে কেন বঞ্চিত হবেন?

একটি গরুর বিভিন্ন দিকের মাংসে চর্বির পরিমাণ বিভিন্ন রকম হয়। আবার ভেতরে বিভিন্ন অঙ্গ যেমন- কলিজা, বৃক্ক এখানে চর্বির পরিমাণ আরও কম। সাধারণত চর্বির তারতম্যের পরিমাণ অন্যান্য পশু ও পাখির ক্ষেত্রেও স্থানভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। সুতরাং আপনার যদি কো-মরবিডিটি বা অন্য কোনো রোগ না থেকে থাকে এবং আপনার যদি গরুর মাংস খেতে ইচ্ছে হয় কিন্তু ডায়েট বা বিভিন্ন কারণে মনে করছেন খাবেন না তাহলে নিশ্চিন্তে কম চর্বিযুক্ত মাংস নির্বাচন করুন এবং পরিমিত গ্রহণ করুন। এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনার চিকিৎসক ও একজন অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে তবে গ্রহণ করবেন। কারণ ব্যক্তি, বয়স, রোগ ও বিশেষ অবস্থা ভেদে ডায়েট ভিন্ন ভিন্ন হয়।

সবচেয়ে আদর্শ কম চর্বিযুক্ত মাংস কোথায় পাবেন?

সাধারণত ফ্লেস মাংসে চর্বির পরিমাণ তুলনামুলুক বেশি থাকে যেখানে মাসেল অংশে ফ্যাট কম থাকে। সাধারণত মাসেল অংশে তিন ভাগ অংশ পানি এবং একভাগ অংশে প্রোটিন আর খুব অল্প পরিমাণ চর্বিতে আবৃত থাকে এবং আনুমানিক এক শতাংশ খনিজ উপাদান এবং অন্যান্য ভিটামিন থাকে।

গরুর শরীরের দুটো অংশ আছে যাতে খুব কম চর্বি থাকে এমনকি মুরগির থানের মাংসে যতোটুকু চর্বি থাকে তার চেয়েও কম। এই দুইটি অংশের নাম হলো- round  এবং sirloin (আনুমানিক নিতম্ব ও এর সামনের দিকের অংশ) অঞ্চল। এই অংশগুলোতে অভ্যন্তরীণ চর্বির পরিমাণ সর্বনিম্ন ৪.২ গ্রাম থেকে সর্বোচ্চ ৮.২ গ্রাম যেখানে মুরগির মাংসে অভ্যন্তরীণ চর্বির পরিমাণ ৯.২ গ্রাম। তবে এই পরিমাণটা তখনই হবে যখন বাইরের দৃশ্যমান চর্বি গুলো ফেলে দেওয়া হবে।

কতটুকু আপনার জন্য উপযোগী?

ব্যক্তি ও রোগ ও বিশেষ অবস্থা ও উপযোগিতা ও প্রাচুর্যতা ভেদে যদিও পরিমাণটা ভিন্ন হয়। তবুও গাইডলাইন অনুযায়ী এক বারে এটি গ্রহণের নিরাপদ মাত্রা হলো তিন আউন্স বা ৮৫ গ্রাম। যেটা আনুমানিক একটি কম্পিউটারের মাউস বা একটা মিডিয়াম সাইজের মোবাইলের সম পরিমাণ টুকরাতে পাওয়া যায়। আর যদি ছোট ছোট দেড় ইঞ্চি বনাম দেড় ইঞ্চি টুকরো হয় তাহলে দুই বা তিন টুকরোতে পাওয়া যায়।

গরুর মাংসের পুষ্টি মুল্যঃ

সাধারণত গরুর মাংস একটি উৎকৃষ্ট মূল্যের সম্পূর্ণ প্রোটিন। একটি নতুন কোষের গঠন, দেহের তথা পেশির বৃদ্ধি সাধন,  রক্ষণাবেক্ষণ এবং কোনো কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেরামত, বুদ্ধি ক্ষমতা বৃদ্ধি, এন্টিবডি উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাংসে যে চর্বিটা পাওয়া যায় সেটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি উৎপাদনের উৎস। কারণ এটি সম্পৃক্ত চর্বি। মাংসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানের ভেতরে আয়রন ফসফরাস, জিংক, ক্যালসিয়াম, মেগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, কপার এবং বি ভিটামিনের যতগুলো উপাদান আছে মোটামুটি সবগুলোই পাওয়া যায়। যদি এক কথায় বলতে হয়, বলা যায়  গরুর মাংসে আয়রন এবং বি কমপ্লেক্স ভিটামিন থাকে যা আমাদের শোষণ ক্ষমতা, বুদ্ধি কার্যক্ষমতা, আমাদের চামড়ার বহিরাবরণের স্বাস্থ্য, লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনে এবং হজমে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

প্রতি ১০০  গ্রাম অল্প চর্বিযুক্ত গরুর মাংস যদি কাবাব বানিয়ে খাওয়া হয় তা থেকে ২৩৩ কিলোক্যালরি, প্রায় ১৩  গ্রাম প্রোটিন, ১৭  গ্রাম চর্বি, ০৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ক্যালসিয়াম ২৫ মিলিগ্রাম, আয়রন ২ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ২৫  মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৮৮  মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ২২০  মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ৩৪৫ মিলিগ্রাম, জিংক ৩ মিলিগ্রাম, কপার ১ মিলিগ্রাম পাওয়া যায়।(INFS,DU FCT-2014)

শিশু-কিশোর বা বর্ধনশীল শিশুদের জন্য গরুর মাংসের ভূমিকা:

যেহেতু গরুর মাংসে প্রয়োজনীয় ৯টি পুষ্টি উপাদান আছে এবং এটি শরীর গঠন, বুদ্ধিবৃত্তিক গঠন এমনকি লোহিত রক্ত কণিকা তৈরি করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে তাই বাচ্চাদের জন্য দৈনিক চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করতে পারে। বাচ্চাদের দৈনিক আমিষ, ভিটামিন ও মিনারেল চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করতে পারে গরুর মাংস।

এ ছাড়া বিভিন্ন স্টাডিতে এসেছে এটি ক্যান্সার প্রতিরোধক, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং অন্যান্য ছোটখাটো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। কারণ এতে আছে conjugated linoleic acid (CLA)

আদর্শ রান্নার পদ্ধতিঃ

এবার রান্নার পদ্ধতি সম্পর্কে একটু বলি। অনেকেই গরুর মাংস অনেকবার ধুয়ে পানিতে ভিজিয়ে রাখে এতে মাংসের লৌহের পরিমাণ কমে যায়। তাই মাংস দুই তিনবার ধুয়ে যদি প্রয়োজন হয় মেরিনেশনের জন্য সময় দিতে পারেন। অনেকেই আছে অনেক বেশি তেল মসলা দিয়ে গরুর মাংস রান্না করেন কিন্তু আমরা যদি কয়েকটা পদ্ধতি অবলম্বন করি তাহলে তেল ছাড়া অথবা বিভিন্ন সবজি যোগ করে রান্না করলে মাংসের চর্বিকে অনেক সময় ব্যালেন্স করতে পারি। এ ছাড়া মাংস কিউব করে কেটে একটু সিদ্ধ করে বিভিন্ন সালাদ উপকরণ দেওয়া একটি আদর্শ মিল তৈরি করা যায়।

তেল ছাড়া মাংস রান্নাঃ

১ কেজি পরিমাণ গরুর মাংসের বাইরে সমস্ত চর্বি ফেলে দিয়ে ছোট ছোট টুকরো (১.৫ ইঞ্চি* ১.৫ ইঞ্চি) করে তাতে ২ চা চামচ লেবুর রস, আধা কাপ পেঁয়াজ বা্টা, এক টেবিল চামচ কাঁচা মরিচ বাটা,  এক টেবিল চামচ আদা বাটা, এক টেবিল চামচ রসুন বাটা, ১ চা চামচ জিরা বাটা, ১ চামচ ধনে বাটা ও ১ চা চামচ হলুদ গুঁড়া, হাফ কাপ টক দই, ২ টেবিল চামচ খোসাসহ কচি পেপে বাটা, এক চা চামচ গোলমরিচের গুঁড়া এক  চা চামচ গরম মসলা এবং স্বাদমত লবন দিয়ে পুরো তাজা মাংস মেখে রাখতে হবে এক  ঘণ্টা।

এক  ঘণ্টা পরে ননস্টিক প্যানে বসিয়ে মিডিয়াম আঁচে, ঢাকনা দিয়ে, মাংস সিদ্ধ করে নিতে হবে। সাধারণত মাংস থেকে পানি বের হয়ে মাংস সিদ্ধ হয়ে আসবে। যখন কষানো হয়ে, পানি শুকিয়ে যাবে তখন এক থেকে দুই কাপ গরম পানি ঢেলে দিয়ে আর কিছুক্ষণ রেখে গাঢ় ঝোল হয়ে গেলে চুলা বন্ধ করে দিতে হবে। হয়ে গেল তেল ছাড়া গরুর মাংস রান্না। আরও একটু আকর্ষণীয় ও সুস্বাদু করতে পরিবেশনের সময় উপরে একটু পেয়াজ বেরেস্তা ও পুদিনা পাতা কুচি ছড়িয়ে দিন। কাউকে না বললে বোঝায় যাবে না যে, এটা তেল ছাড়া রান্না করা হয়েছে। এভাবে অন্যান্য পশু পাখির মাংস ও রান্না করা যাবে।

অল্প তেলে সবজি দিয়ে গরুর মাংস রান্নাঃ

এ ছাড়া যদি অল্প তেল দিয়ে গরুর মাংস রান্না করেন তাহলে তার সাথে তরকারি হিসেবে যোগ করা যায় জালি কুমড়া, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, পেপে, ব্রকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি এমনকি পালং শাক দিয়ে পর্যন্ত মাংস রান্না করা যায় এবং খেতে বেশ সুস্বাদু হয়। এক্ষেত্রে মাংসের চর্বি ও সবজির অন্যান্য ভিটামিন ও মিনারেলস গুলো একসাথে ব্যালেন্স হয়ে যায়।

আগের রেসিপির নিয়মে ১ কেজি মাংস সিদ্ধ করে নিতে হবে, শুধুমাত্র ১ চা চামচ তেল যোগ করতে হবে। পানি দেওয়ার বদলে যেকোনো এক বা দুই ধরনের সবজি যোগ করে কিছুটা সময় রেখে পানি শুকিয়ে কষিয়ে প্রয়োজন হলে গরম পানি যোগ করে অল্প কিছু সময় চুলায় রেখে নামাতে হবে। যদি বাঁধাকপি যোগ করতে চান তবে কুচি করে কেটে মাংস চুলা থেকে নামানোর ৫ থেকে ১০ মিনিট আগে ছড়িয়ে দিয়ে একটু ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিলেই সিদ্ধ হয়ে যাজাবে। হয়ে গেল সবজি দেওয়া মাংস রান্না।

তবে যাদের পাকস্থলীতে আলসার আছে, কিডনি রোগ, গরুর মাংসে এলার্জি, ইউরিক এসিডের আধিক্য, বাতের ব্যথা, যাদের অপারেশন হয়েছে, খুব বেশি উচ্চরক্তচাপ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি আছে সিভিআর হার্ট ডিজিজ ইত্যাদি বিশেষ সমস্যা আছে তাদের ক্ষেত্রে গরুর মাংস এড়িয়ে যাওয়াটাই ভালো। এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনার চিকিৎসক ও একজন অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে তবেই গ্রহণ করবেন। 

পরিশেষে একটি কথা বলা যায়, যদি খুব সামান্য পরিমাণ খাবার থেকে অনেক বেশি পুষ্টিমূল্য পেতে চান তাহলে গরুর মাংসের বিকল্প নেই। একটি ছোট্ট উদাহরণ দিচ্ছি, শুধুমাত্র তিন আউন্স  বা ৮৫  গ্রাম গরুর মাংস থেকে যে পরিমাণ আয়রন পাওয়া যায় তা পেতে হলে আমাদের ৮  আউন্স মুরগির বুকের মাংস খেতে হবে (USDA NDB #05064) আবার যে পরিমাণ জিঙ্ক আমরা তিন আউন্স গরুর মাংস থেকে পায় সেই পরিমাণ পেতে হলে আমাদের ২০  আউন্স মুরগির বুকের মাংস খেতে হবে (USDA NDB #13364)। তাই মাংস খাওয়ার সময় চর্বি যেন না থাকে আর তেল ছাড়া বা অল্প তেলে যেন রান্না করা হয় আর ঝোল যেন না খাওয়া হয় আর পানিযুক্ত সবজি এবং সালাদ এবং লেবু খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ধন্যবাদ সবাইকে।

ফাতিম তুজ জুহুরা

নিউট্রিসন কন্সালটেন্ট

মেরিন হেলথ কেয়ার

খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯