ভুয়া সনদে চাকরি : যা বললেন শিক্ষকরা

জনি রায়হান
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১১:৪৭ | আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৯:০৩
রংপুরের পীরগঞ্জের সরকারি শাহ আব্দুর রউফ কলেজ

জাল সনদে চাকরি পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় এক কলেজেই জাল সনদে চাকরি করছেন আট শিক্ষক। রংপুরের পীরগঞ্জের সরকারি শাহ আব্দুর রউফ কলেজের ঘটনা এটি। কয়েক বছর ধরে জাল সনদে ৮ শিক্ষক চাকরি করে আসলেও নজরে আসেনি কর্তৃপক্ষের। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) ওই শিক্ষকদের সনদ ভুয়া নিশ্চিত করার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।

এনটিআরসিএ বলছে, কলেজটি সরকারি হওয়ার পর শিক্ষকদের সনদ যাচাই-বাছাইয়ের সময় গড়মিল পেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শাহ আব্দুর রউফ কলেজের অধ্যক্ষকেও শিক্ষকদের সনদগুলো ভুয়া এবং জাল জালিয়াতি মাধ্যমে তৈরি করা- জানিয়েছে এনটিআরসিএ। এমনকি এনটিআরসিএ থেকে ৮ শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে মামলা করার জন্যও বলা হয়েছে।

কারা এই ৮ শিক্ষক

ভুয়া এবং জাল জালিয়াতি মাধ্যমে তৈরি করা সনদের দায় ওঠা শিক্ষকরা হলেন- সরকারি শাহ আব্দুর রউফ কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মোছা. সুরাইয়া বেগম, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মোছা. হাসিনা আক্তার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অপর প্রভাষক মো.শহীদ বদরুদ্দোজা, ব্যস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মো. জিল্লুর রহমান, ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মোছা. কেয়া সারমিন, ইতিহাস বিভাগের আরেক প্রভাষক মোছা. ফারহানা খাতুন, দর্শন বিভাগের প্রভাষক মোছা. হুরুন্নাহার খাতুন ও ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মোছা. আয়শা প্রধান।

কী বক্তব্য তাদের

এই ঘটনাটি নিয়ে দৈনিক আমাদের সময়ের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত শিক্ষকরা আলাদা আলাদাভাবে তাদের যুক্তি তুলে ধরেছেন। সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মোছা. সুরাইয়া বেগম বলেন, ‘এই কলেজে আমি ২০১১ সাল থেকে আছি। এর আগেও একটা চক্র এমন কাজ করেছিল। তারা এমন একটি চিঠি খামে ভরে বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দিয়েছিল। সেখানেও বলা হয়েছিল কয়েকজন শিক্ষকের সনদ ভুয়া। আসলে শিক্ষকের মধ্যে একটি চক্র আছে তারা এই কাজটি করে।’

এনটিআরসিএ সনদ যাচাই-বাছাইয়ের পর আপনার সনদটি ভুয়া বলে জানিয়েছে বললে এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি এই শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি কোনো কথা বলব না।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মোছা. হাসিনা আক্তারের কাছে সনদ জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে সনদ যে ভুয়া সেটা আমি জানতাম না। আমি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়েছিলাম। কিন্তু ফলাফল কি হয়েছে, সেটা জানার আগেই ওই কলেজে চাকরির কথা শুরু হয়। কলেজে খুব তাড়াতাড়ি সনদ দরকার হওয়ায় তখন আমার বড় ভাই কোথা থেকে ভুয়া সনদটি জোগাড় করে জমা দিয়েছেন; তাও আমি জানি না।’

হাসিনা আক্তার আরও বলেন, ‘এখন যদি সম্ভব হয় তাহলে আমি আবারও পরীক্ষা দিতে চাই। আমি সরকারি কলেজ থেকে অনার্স কমপ্লিট করেছি। কারমাইকেল কলেজ থেকে মার্স্টাস করেছি। দরকার হলে আবারও পড়াশোনা করে পরীক্ষা দেব।’

সনদ জালিয়াতির অভিযোগের ব্যাপারে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অপর প্রভাষক মো. শহীদ বদরুদ্দোজার বক্তব্য জানতে বার বার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। জালিয়াতির বিষয়টি নিয়ে ব্যস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমি জানি না ভাই। এই প্রথম শুনলাম। কিছুই জানি না।’

ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মোছা. কেয়া সারমিনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি পরিচয় জানার পরই কল কেটে দেন। অপর দিকে ইতিহাস বিভাগের আরেক প্রভাষক মোছা. ফারহানা খাতুন ভুয়া সনদের বিষয়ে বলেন, ‘আমি যখন ২০১৪ সালে কলেজে যোগদান করেছি; তখন কলেজটি এমপিওভুক্তও ছিল না। তাই তখন শিক্ষক নিবন্ধন সনদের এতটা জরুরি মনে হয়নি। আর কলেজ কর্তৃপক্ষও তেমন জোর দেয়নি শিক্ষক নিবন্ধন সনদের ব্যাপারে। তাই নিয়োগের সময় একটি সনদ ম্যানেজ করা হয়েছিল।’

ফারহানা আরও বলেন, ‘আসলে আমিও চাইনি এমন ভুয়া সনদ ব্যবহার করে চাকরি করতে। কিন্তু মফস্বলের কলেজ তেমন বেতন ভাতাও নেই। আর এটা যে সরকারি হতে পারে; সেটা কখনোই ভাবিনি। নানা কারণে নিবন্ধন পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগও হয়নি। কলেজ সরকারি হয়ে যাওয়ার পর ঢাকায় কাগজ পাঠানোর সময়ও আমি প্রিন্সিপালকে বলেছি কোনো সমস্যা হবে কিনা। কিন্তু তিনি বার বার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, “পাঠিয়ে দেখি কি হয়।” আসলে কলেজ কর্তৃপক্ষেরও গাফিলতি আছে। এ ঘটনায় এখন আমার পরিবার, আত্বীয়-স্বজন ও সমাজের কাছে লজ্জিত হতে হচ্ছে আমাদের।’

রংপুরের পীরগঞ্জের সরকারি শাহ আব্দুর রউফ কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক মোছা. হুরুন্নাহার খাতুনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার সব কিছু ঠিক আছে।’ ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মোছা. আয়শা প্রধানের মোবাইলে একাধিক বার ফোন করা হলেও ফোনটি রিসিভ হয়নি।

এ ব্যাপারে কথা বলতে সরকারি শাহ আব্দুর রউফ কলেজের অধ্যক্ষের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, দেশের যেসব উপজেলায় কোনো সরকারি কলেজ ছিল না, সেগুলোতে একটি করে বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণ বা সরকারি করা হয়েছে। এই কলেজগুলো সরকারিকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। পরে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট দেশের ২৭১টি বেসরকারি কলেজকে সরকারি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগে-পরে আরও ৩২টি কলেজ জাতীয়করণ হয়। কলেজ সরকারি হলেও এখনো সরকারি বেতন-ভাতাসহ অনান্য সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না কলেজগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীরা। কারণ সংশ্লিষ্ট কলেজের শিক্ষকদের সব সনদ যাচাই-বাছাই করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রথমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) যাচাই-বাছাই করার পর এখন মন্ত্রণালয়ে আবার যাচাই-বাছাই করছে। শিক্ষকদের সব সনদ যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি করছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। আর যাচাই করতে গিয়েই সরকারি শাহ আব্দুর রউফ কলেজের ৮ শিক্ষকের সনদের গড়মিল পেয়েছেন তারা। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সনদগুলো ভুয়া এবং জাল জালিয়াতি মাধ্যমে তৈরি করা। তাই যাচাই-বাছাই শেষে ওই ৮ শিক্ষকের সনদ ভুয়া উল্লেখ্য করে সরকারি শাহ আব্দুর রউফ কলেজের অধ্যক্ষকে একটি চিঠি দিয়েছে এনটিআরসিএ। ওই চিঠিতে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে মামলা করার জন্যও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সেই চিঠির একটি অনুলিপি পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও (ওসি) পাঠানো হয়েছে।

প্রসঙ্গত, রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার শাহ আব্দুর রউফ কলেজ ১৯৭০ সালে স্থাপিত হয়েছে। অত্র প্রতিষ্ঠানে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষায় শাখা, ডিগ্রি পর্যায়ে বিএ, বিএসএস, বিএসসি সম্মান কোর্স বাংলা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ভূগোল ও পরিবেশ এবং উদ্ভিদবিদ্যা বিষয় চালু রযেছে। বর্তমান অত্র শিক্ষার প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়নরত বলে কলেজ সূত্রে জানা যায়।