ডেঙ্গু চিকিৎসায় ঢাবির দুই শিক্ষকের কীর্তি

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
২৪ নভেম্বর ২০২০ ২২:৩৫ | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২০ ০৯:১৫
প্রতীকী ছবি

ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় এলট্রোম্বোপ্যাগ ওষুধ ব্যবহারে কার্যকারিতার প্রমাণ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের নেতৃত্বে গবেষণা করা একদল গবেষক। চিকিৎসা বিষয়ক বিখ্যাত জার্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে। এছাড়া ওষুধটি তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুত বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

ডেঙ্গু চিকিৎসায় এলট্রোম্বোপ্যাগ ওষুধ ব্যবহারের সম্ভাবনা থেকে এই গবষেণা চলানো হয়। ডেঙ্গু চিকিৎসায় ১০১ জন রোগীর ওপর গবেষণাটি চালানো হয়। এলট্রোম্বোপ্যাগ ওষুধ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম দাবি করে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, এলট্রোম্বোপ্যাগ শুরুতে শুধুমাত্র ইমিউন থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া বা ক্রনিক লিভার ডিজিস জনিত অনুচক্রিকা স্বল্পতা সংশোধনে প্রয়োগ করা হতো। কিন্তু উপসর্গ জনিত মিল থাকার কারণে পরবর্তীতে ডেঙ্গু জনিত অনুচক্রিকা স্বল্পতা সমাধানে এই ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য এই গবেষণাটি পরিকল্পনা করা হয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধরণের কৌশলকে ‘ড্রাগ রিপারপজিং’ বা ‘রিপ্রোফাইলিং’ বা ওষুধের কাজের পুনর্বিন্যাস বলা হয়। যেখানে একটি ওষুধকে তার মূল প্রয়োগক্ষেত্রের বাইরে একটি সদৃশ ব্যাধি নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়।

এতে বলা হয়, রোগীদের দুই দলে ভাগ করে ২৫ ও ৫০ মিলিগ্রামের এলট্রোম্বোপ্যাগ প্রয়োগ করা হয়। এর মধ্যে ২৫ মিলিগ্রাম গ্রহণকারীরা বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছেন। এছাড়া দুই দলেরই ৯১ শতাংশ রোগী যথাসময়ে রক্তে স্বাভাবিক প্লাটিলেটের মাত্রা ফিরে পেয়েছেন। ফলে ডেঙ্গু চিকিৎসায় আলাদা করে প্লাটিলেট দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে আসবে।

এতে আরও বলা হয়, গবেষণা চলাকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বেটার লাইফ হাসপাতাল ও এ এম জেড হাসপাতাল থেকে পরিকল্পনামাফিক ডেঙ্গু রোগীদেরকে এই গবেষণায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তাদেরকে তিনটি গ্রূপে বিভক্ত করে দুটি গ্রুপকে ভিন্ন মাত্রায় এলট্রোম্বোপ্যাগ দেওয়া হয় ও একটি গ্রুপকে কন্ট্রোল হিসেবে রাখা হয়। ওষুধ প্রদানের একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর রোগীদের অণুচক্রিকার মাত্রা পরীক্ষা করা হয় এবং পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ এর পর দেখা যায় ওষুধ প্রাপ্ত দুটি গ্রুপেই শতকরা ৯১ শতাংশ রোগী যথাসময়ে স্বাভাবিক অনুচক্রিকা মাত্রা ফিরে পান। যেখানে কন্ট্রোল গ্রূপে ৫৫ শতাংশ রোগী ওই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক মাত্রা অর্জন করেন।

এছাড়াও একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে প্রত্যেক গ্রুপের রোগীদের অপরিপক্ক অনুচক্রিকার মাত্রা নির্ণয় করা হয়। এক্ষেত্রেও ওষুধ প্রাপ্ত দুটি গ্রূপে কন্ট্রোল গ্রূপের তুলনায় উচ্চ মাত্রায় অপরিপক্ক অনুচক্রিকার উপস্থিতি পাওয়া যা ওষুধটির অনুচক্রিকা স্বল্পতা নিরাময়ে কার্যকারিতার প্রমাণ দেয়। ওষুধপ্রাপ্ত দুটি গ্রুপে ওষুধজনিত বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই দ্বিতীয় ধাপের গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয় যে ডেঙ্গুজনিত অনুচক্রিকা স্বল্পতা নিরাময়ে এলট্রোম্বোপ্যাগ এর প্রয়োগ কার্যকর ও নিরাপদ। এসময় গবেষণালব্ধ ফলাফল এই ওষুধটি নিয়ে পরবর্তীতে তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করতে সহায়ক হবে আশাবাদ ব্যক্ত করে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, এর মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে ডেঙ্গু নিরাময়ে ওষুধটির কার্যকারিতা শক্তভাবে প্ৰতিষ্ঠিত করবে।

গবেষণাকর্মটি পরিচালনার জন্য  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রান বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ.এইচ.এম. নুরুন নবী এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির এবং নেতৃত্ব প্রদান করেন। এছাড়া প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রান বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. সজীব চক্রবর্তী গবেষণাকর্মটি সার্বিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যান। এছাড়া ঢাবি ও ঢামেকের গবেষকরা অবদান রাখেন। গবেষণার সার্বিক সহায়তা করেছে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল।