নতুন আশ্রয়ে রোহিঙ্গারা

আরিফুজ্জামান মামুন,ঢাকা হামিদ উল্লাহ,চট্টগ্রাম সরওয়ার আজম মানিক,কক্সবাজার শামীম উজ্জামান শামীম,হাতিয়া
৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৫ ডিসেম্বর ২০২০ ১২:০৯


কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির থেকে ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্পে পা রেখেছেন ১ হাজার ৬৪২ রোহিঙ্গা। গতকাল নৌবাহিনীর ছয়টি এলসিইউ এবং সেনাবাহিনীর জাহাজ ‘শক্তি সঞ্চার’ যখন ভাসানচরের মাটি স্পর্শ করে, তখন বেলা ২টা। স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যেতে রাজি হওয়া রোহিঙ্গাদের নৌবাহিনী ও নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রহণ করে নেওয়া হয়। এর আগে করোনা সতর্কতায় তাদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয়। তার পর ওয়ার হাউসে নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের ব্রিফ করেন। এর পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে জেটি থেকে গাড়িতে করে তাদের আবাসস্থলের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শিশুদের চলাচলের জন্য সাহায্য করেন নৌবাহিনীর সদস্যরা। আগে থেকে প্রস্তুত রাখা ৭, ৮, ৯, ১০ নম্বর ক্লাস্টারে তাদের রাখা হয়েছে।
সূত্রমতে, ভাসানচরের রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিশু রয়েছে ৮১০, পুরুষ ৩৬৮ ও নারী ৪৬৪ জন। এর আগে সকালেই নৌবাহিনীর জাহাজ শাহ মখদুম ও শাহপরানে রোহিঙ্গাদের মালপত্র ভাসানচরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
কক্সবাজারের ঘিঞ্জি পরিবেশে পাহাড়ের খাদে ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের চেয়ে ঢের ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখা রোহিঙ্গারা
কক্সবাজার ক্যাম্পে লালন-পালন করা হাঁস-মুরগিও নিয়ে এসেছেন। তারা হাঁস-মুরগি লালন-পালন করে জীবিকা চালাবেন।
এর আগে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশে বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের উখিয়ার আশ্রয় শিবির থেকে রোহিঙ্গাদের ৪২টি বাসে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হয়। রাতে তাদের রাখা হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনী রেডি রেসপন্স বাথ জেটি ও বিএএফ শাহীন কলেজ মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী ট্রানজিট ক্যাম্পে। অবশ্যই গত বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের চট্টগ্রামে পাঠানোর আগে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবান খাওয়ানো হয়। এ উপলক্ষে টাঙানো হয় রঙিন শামিয়ানা। সাদা পোশাকের বয়-বেয়ারা এসে টেবিলে টেবিলে দেন সাদা ভাত এবং গরুর মেজবানি মাংস।
ভাসানচরে যাওয়া রোহিঙ্গা রফিকুল ইসলাম, ফরিদুল আলম, কুলসুম বেগম ও আমিনা খাতুন জানান, তারা নিজের ইচ্ছায় ভাসানচরে এসেছেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় অভ্যন্তরীণ মারামারি ও ঝামেলার মধ্যে তারা থাকতে অস্বস্তি বোধ করছেন। তাই তারা সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য ভাসানচরে এসেছেন। রোহিঙ্গা নারী মরিয়ম খাতুন বলেন, এখানে এসে পরিবেশ দেখে অনেক ভালো লাগছে। তিনি বলেন, আমরা আসার আগে সবকিছু প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। সন্ধ্যার আগেই নির্ধারিত কক্ষে প্রবেশ করে বাসাটি গুছিয়ে নিলাম। সন্ধ্যায় আমাদের রাতের জন্য রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয়েছে।
সরকারি সূত্র বলছে, বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য ভাসানচরে অবকাঠামোসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে। প্রথম দফায় যেসব রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেওয়া হলো তাদের জন্য খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ অন্তত এক মাসের রসদ দ্বীপটিতে মজুদ রাখা হয়। কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় থেকে ভাসানচরে স্থানান্তররত রোহিঙ্গাদের জন্য এক বছরের রসদ মজুদ করা হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য নানা ধরনের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে দেশি-বিদেশি ২২টি সাহায্য সংস্থাকে যুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে ওই সংস্থাগুলোর শতাধিক কর্মী ভাসানচরে অবস্থান করছেন।
এর আগে চট্টগ্রাম বিএএফ শাহীন কলেজ মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী ট্রানজিট ক্যাম্পে অনেক রোহিঙ্গা জানান, তারা সেখানে চাষাবাদ থেকে শুরু করে নিজেরা আয়-রোজগার করতে পারবে সে আশায় ভাসানচরে যাচ্ছেন। গতকাল শুক্রবার সকালে জাহাজে ওঠার আগে বিএএফ শাহীন কলেজের মাঠে ভাসানচরে যেতে রাজি হওয়ার বিষয়ে ৬৫ বছরের বয়স্ক আকমল আলী আমাদের সময়কে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিজেদের অনেক জমি ছিল। যেগুলোয় হালচাষ করে অনেক টাকা আয় করতেন। কোনোদিন কারও কাছে হাত পাততে হয়নি। সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে আসার পর থেকে এক বেলা খাওয়ার জন্য ত্রাণের অপেক্ষা করতে হয়। আমরা তো ত্রাণ চাই না। নিজেরা কিছু করতে চাই। নিজেদের রোজগার নিজেরাই করতে চাই। যখন শুনলাম ভাসানচরে গিয়ে থাকার মতো ভালো জায়গা পাব আর নিজেদের আয়-রোজগার হবে, তখনই রাজি হয়েছি।
৪৩ বছরের জান্নাত আরা বেগম নামে আরেক রোহিঙ্গা বলেন, উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পে একটু বৃষ্টি হলে ঘরের মেঝে কর্দমাক্ত হয়ে যেত। বাঁশ আর পলিথিনের বেড়া আর ছাউনি দিয়ে তৈরি করেছিলাম ক্যাম্পের ঘর। শুনেছি নতুন জায়গায় নাকি আমাদের পাকা বাড়িতে থাকতে দেওয়া হবে। ভালোভাবে থাকতে পারব। বাচ্চাদের নিরাপদে রাখতে পারব। তার কথার সঙ্গে যোগ করলেন আরেক রোহিঙ্গা নারী জায়েদা বেগম।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ রেজওয়ান হায়াত বলেন, রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর কার্যক্রম ঘিরে ভাসানচর দ্বীপ ঘুরে আসে ২২টি এনজিওর প্রতিনিধি দল। ভাসানচরে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের জন্য মজুদ করা হয়েছে প্রায় ৭০ টন খাদ্যসামগ্রী। ইতিপূর্বে উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ে ঠাসাঠাসির বসবাস ছেড়ে ভাসানচরে যেতে তিন হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা রাজি হয়েছেন। তবে সব মিলিয়ে চার-পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
সমাজকল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থার (স্কাস) চেয়ারম্যান জেসমিন প্রেমা বলেন, সরকার ও নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। ২২টি এনজিও ভাসানচরে কাজ শুরু করেছে। যেসব রোহিঙ্গা ভাসানচরে আসছে তাদের আপ্যায়ন করার জন্য নৌবাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব নিয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের দেখভাল করার জন্যও সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা। শিশু ও নারীদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। নারীদের জন্য সরকারি নারী কর্মকর্তা রয়েছেন।
এনজিও সংস্থা সোশ্যাল এইডের কর্মকর্তা নুরুজ্জামান বলেন, উন্নত মানের একটি আবাসিক এলাকায় যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকে, তার সবই ভাসানচরে রয়েছে। কক্সবাজারের চেয়ে শতগুণ ভালো ভাসানচর। ফলে না দেখেই কারও বিরোধিতা করা উচিত নয়। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য যেসব সুবিধা রয়েছে, এসবের অনেক সুবিধা আমার দেশের মানুষও পায় না।
উল্লেখ্য, নোয়াখালীর হাতিয়ায় সাগরের মাঝে ভেসে থাকা ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসংবলিত ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থাও রয়েছে। বসবাসের যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা দেখতে গত সেপ্টেম্বরে দুই নারীসহ ৪০ রোহিঙ্গা নেতাকে সেখানে নিয়ে যায় সরকার। তারা ভাসানচরের আবাসনব্যবস্থা দেখে মুগ্ধ হন। তারা ক্যাম্পে ফিরে অন্যদের ভাসানচরে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন।
প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায় নির্মিত রোহিঙ্গাদের জন্য এই অস্থায়ী আবাসস্থল এখন কর্মমুখর। দ্বীপটি বাসস্থানের উপযোগী করা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বনায়ন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের জন্য আধুনিক বাসস্থান ছাড়াও বেসামরিক প্রশাসনের প্রশাসনিক ও আবাসিক ভবন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভবন, মসজিদ, স্কুল হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ভবন, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও খেলার মাঠ নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালনার জন্য সেখানে মহিষ, ভেড়া, হাঁস, মুরগি ও কবুতর পালন করা হচ্ছে। আবাদ করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। পরীক্ষামূলকভাবে ধান চাষও করা হচ্ছে এখানে।
এদিকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা হলেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনকেই বাংলাদেশ সরকার অগ্রাধিকার দেবে। ভাসানচরে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেওয়া হলেও মিয়ানমারে তাদের ফিরতেই হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রোহিঙ্গাদের প্রথম দল শুক্রবার ভাসানচরে পৌঁছেছে। সেখানে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি রোহিঙ্গা গেছেন। যারা স্বেচ্ছায় সেখানে যেতে চেয়েছেন তাদেরই পাঠানো হয়েছে। ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গাকে পাঠানো হবে। রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেওয়ার আগে তাদের কমিউনিটি থেকে নেতারা পরিদর্শন করেছেন। এনজিও ও গণমাধ্যমের কর্মীরাও পরিদর্শন করেছেন। ভাসানচর পুরোপুরি সুরক্ষিত। রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার থেকে ভাসানচরে বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। ভাসানচরে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও ২২টি এনজিও সহায়তা দেবে।
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। তাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফিরতে হবে। অস্থায়ীভাবে আশ্রয়প্রাপ্ত মিয়ানমার নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়াটাই এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান। একই সঙ্গে আমরা সবাইকে বাংলাদেশ সরকারের প্রকৃত প্রচেষ্টাকে দুর্বল বা ভুল ব্যাখ্যা না করার জন্য সর্বাত্মক সতর্কতা অবলম্বন করার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, রোহিঙ্গারা যেন মিয়ানমারে দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে ফেরার লক্ষ্যে রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে তাদের প্রচেষ্টা যেন অব্যাহত রাখে।