প্রযুক্তি ও সামাজিক বন্ধন

রায়হান আহমেদ
১৩ জানুয়ারি ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২১ ২৩:৩৬

জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃতির ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা খুব কম মানুষই বোঝে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কল্যাণে যে কেউ ইন্টারনেটের মাধ্যমে অবারিত জ্ঞানের সাগর থেকে তাদের জ্ঞানের ভা-ার সমৃদ্ধ করতে পারে। আমাদের এই বর্তমান আধুনিক বিশ্বে সামাজিক মাধ্যম আমাদের সমাজ, অর্থনীতি ও সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যে প্রভাব ফেলছে, তা অনস্বীকার্য। যদিও এই সামাজিক মাধ্যমগুলো আমাদের সমাজ, দেশ ও সংস্কৃতির দেয়াল ভেঙে সব মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, তবুও এর সবকিছুরই একটা মূল্য আছে। সামাজিক মাধ্যমগুলোর কিছু খারাপ প্রভাবও আমাদের জীবনে দৃশ্যমান। কারণ অন্তঃকরণ-বিচ্ছিন্নকরণের সংযুক্তি ও বৈশ্বিক পরিব্যাপ্তি আমাদের কৃষ্টিকে ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু করে দিচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমগুলো আমাদের পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা হরণ করছে এবং মানবিক, শারীরিক ও অনুভূতির সাহচর্যকে ভার্চুয়াল যোগাযোগ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করছে। বর্তমান যুগে সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতার মাত্রা যে হারে বেড়ে যাচ্ছে, তা দেখে রীতিমতো ভয় হয়। সম্পর্কের এই ধরন ধীরলয়ে পরিবর্তন হতে শুরু করেছে নগরায়ন ও ভূগ্রামের দেশগুলোয় যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। করোনাকালের সঙ্গে এর সম্পর্ক খোঁজার প্রয়োজন নেই। করোনাকালে মানুষে মানুষে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সঙ্গত কারণে অনেক কমে গেছে। করোনা-পূর্বকালে কি যোগাযোগ খুব বেশি ছিল? সবাই মিলে একত্র হয়ে সামাজিক উদ্যোগে সমাজ উন্নয়নমূলক কাজ, পাড়া-প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়ার মতো অনানুষ্ঠানিক ও আন্তরিক যোগাযোগগুলো এখন আর দৃশ্যমান নয়।

সামাজিক মাধ্যম মানুষের পারিবারিক ও ব্যক্তিজীবন থেকে মূল্যবান সময় কেড়ে নিয়ে তাদের আসক্ত করে ফেলে। ফলে তাদের সামাজিক দক্ষতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায় ও অসামাজিক আচরণ বেড়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমগুলো অপরাধীদের জন্য একটি হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। এটি খুব সহজে ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন রকমের অপরাধ কর্মসম্পাদন করেন এবং জটিল মানসিক সমস্যার সঙ্গে অপরাধপ্রবণতার সংযোগ রয়েছে। এমনকি সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি এই বিশ্বাস ও আস্থার মূলে কুঠারাঘাত করেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষ করে তুলেছে অসামাজিক। বস্তুত ভার্চুয়াল যোগাযোগের সুযোগ যত বাড়ছে, মানব সম্পর্ক তত ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে। কাছে আসার ছলে মানুষ চলে যাচ্ছে দূরে। সম্পর্কের জাল যত বিস্তৃত হচ্ছে, সম্পর্কের মূল্য বিষয়ে মানুষ তত বেশি বেখেয়াল হয়ে যাচ্ছে। এখন সম্পর্ক আলগা, হৃদয়াবেগরহিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবারিত ব্যবহারের কারণে মানবীয় সম্পর্কের আবেগ ও হৃদয়ানুভূতি হারিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের বন্ধুর সংখ্যা বৃদ্ধি হলেও প্রকৃতপক্ষে তাকে বন্ধুহীন করে ফেলেছে। শিল্পবিপ্লবের পর মানুষ নিঃসঙ্গ শুরু করে, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসে সে হয়ে পড়েছে চরম নিঃসঙ্গ। অসংখ্য মানুষের ভিড়ে সে একা। এসব সমস্যা শুধু তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যবয়সী, এমনকি প্রবীণদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে এই আসক্তি।

পুনর্মিলনী বা এ ধরনের অনুষ্ঠানে কারও সময় নেই নির্ভেজাল আড্ডা দেওয়ার। এমনকি মোবাইল কিংবা সেলফিস্টিক হাতে ব্যস্ত সবাই ছবি তুলতে। ভাবের আদান-প্রদান গৌণ হয়ে মুখ্য হয়ে পড়েছে ছবি তোলা ও সামাজিক মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেওয়া। চলমান আসরেই সামনাসামনি গল্প ভুলে ছবিতে লাইক কিংবা মন্তব্য করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অনেকে। একই পরিবারের মধ্যে বসবাস করেও প্রত্যেকে যেন আলাদা গ্রহের বাসিন্দা। ছেলেমেয়েরা যেমন ব্যস্ত ভিডিও গেমস, মোবাইল অ্যাপস কিংবা সামাজিক নেটওয়ার্ক নিয়ে- তেমনিভাবে মা-বাবাও ব্যস্ত তাদের নিজস্ব জগৎ কিংবা কর্মক্ষেত্র এবং পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম নিয়ে। এই আসক্তি হয়তো দূরের বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়াচ্ছে। কিন্তু শীতল করে তুলছে পারিবারিক বন্ধন ও সম্প্রীতি। এই আসক্তির রাশ টেনে না ধরতে পারলে এর পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। আমরা নতুন প্রযুক্তির বিপক্ষে নই। আমরা চাই, প্রযুক্তির বিস্তার ঘটুক এবং মানুষ এগিয়ে যাক। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার আমাদের কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছে, এর মূল্যায়ন করা অত্যাবশ্যকীয়।

রায়হান আহমেদ : প্রাবন্ধিক