ভালোবাসি তোমায় ঢাকা...

  জান্নাতুল ফেরদৌস মিতু

০২ অক্টোবর ২০১৭, ২০:৫৫ | আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০১৭, ১৬:০৯ | অনলাইন সংস্করণ

ফাইল ফটো
তিন বছরের প্রবাস জীবনে বাংলাদেশ নামটাই আমার আত্মা আর মগজের একমাত্র প্রশান্তি। আর অনেক যন্ত্রণা সত্ত্বেও তাবৎ দুনিয়ায় আমার প্রিয় শহর ঢাকা। আমার ঢাকার বাসা হতে অফিসের গাড়িতে মতিঝিল বিমান অফিসে যেতাম ৪০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টায় (১০ মিনিটের পথ)। যদিও আমার পরিচিতদের মতে সেটা দাঁড়িয়েছে এখন দেড় ঘণ্টায়। ওই একঘণ্টায় আমি প্রতিদিন জেগে ওঠা ঢাকা শহরকে নতুন করে দেখতাম। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার দৃষ্টিতে গত পাঁচ-ছয় বছরে বাংলাদেশ কতটা বদলেছে সে হিসেবে যাবোনা। তবে শহুরে জনগোষ্ঠীর একটা অংশ সাদামাটা জীবনের খোলস ভেঙে আপাত দৃষ্টিতে একটা চাকচিক্যময় জীবনকে ফেসবুকে মেলে ধরে। যা দেখে আমি খুব তৃপ্তি পাই। মনে হয় বদলে যাচ্ছে আমার গরীব দেশ। অন্তত ফেসবুকীয় জীবনে ঢাকাকে ভীষণ ঝকঝকে আর বিলাসী শহর মনে হয়। আদতে কি তাই? আমি আর আমরা ভীষণ আবেগী ঢাকার ব্যাপারে কিন্তু আমরা সবাই চোখের ঠুলি আর মুখের কুলুপ খুলে যদি সত্যিটা না উপলব্ধি করি তবে বিষফোড়া লুকিয়ে রেখে একদিন ক্যান্সারে রুপান্তর হবে। তখন মানুষ পেছন ফিরে নতুন করে শুরু করতে চাইবে কিন্তু পারবে না।

একটা জনবহুল শহর হিসেবে ঢাকাকে অল্প সময়ে পরিপাটি করা কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব না। কিন্তু নূন্যতম সুবিধাগুলোর প্রয়োজনে ঢাকার মানুষ হাঁপিয়ে উঠছে।

প্রথম সমস্যা যানজট আর যথাযথ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট। আপনাদের কাছে জানতে চাই যানজট কি, আর কত প্রকার? এটা কি ঢাকার মানুষের চাইতে বেশি আর কেউ জানে? কত রোগী যে অ্যাম্বুলেন্সে মারা যায় তার হিসেব নেই। মৃত কর্মঘণ্টার কথা বাদই দিলাম। একটা শহরের কেন্দ্রস্থলে হাজার হাজার গার্মেন্টস আর কল-কারখানা রেখে ঢাকার যানজট কমবে কি না সেটা বিশেষজ্ঞরা ভাল জানেন।

এবার একটু ভাবেন পাবলিক টয়লেট নিয়ে। প্রাকৃতিক এই আদি প্রয়োজন প্রতিটি মানুষের সহজাত নিয়ম। বাসা থেকে বের হয়ে এই প্রয়োজনে পড়লে বাসায় ফিরে যাওয়া অথবা দামি শপিংমলে ঢোকা ছাড়া গত্যন্তর নেই। প্রতিটি এলাকায় একটা পাবলিক টয়লেট করলেও আমাদের নিয়ম না মানা জনগণই কি সেটা সঠিকভাবে ব্যবহার করবে?

শহরের যত্রতত্র আবর্জনার স্তূপ (ভি আই পি এলাকা ছাড়া)। তবে যদি বলেন এই শহরের আবর্জনাকেও বড় ভালোবাসি তবে আমার কিছু বলার নাই। জনগণকে সচেতন করা তো বটেই, এই সমস্যা এলাকাভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্তদের দ্বারা সমাধান করা কি খুব কঠিন?

এই শহরের ৯০ শতাংশ এলাকার বাড়ি-ঘর এতটাই কাছাকাছি বানানো যেন জমজ ভাই-বোন। এই সুযোগে মাদকসেবীরা কার্নিশ বেয়ে ছয়তলা পর্যন্ত উঠে পড়ছে চুরি করতে। কতৃপক্ষের কোনো নজর নাই।

এবার আসি বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তির যুদ্ধ নিয়ে। এই শহরে নাকি গলির চাইতে স্কুলের সংখ্যা বেশি। তবুও একটা ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য বাবা-মা’র মরণপ্রাণ যুদ্ধ আমার নিজের জীবনেই ঘটেছে। বাইরের দেশগুলোর মত শিক্ষাবোর্ডের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক স্কুলে ভর্তি বাধ্যতামূলক করলে এই সমস্যার সমাধান হয় কি না ভেবে দেখা দরকার।

শহরের প্রাণ তার নদী। অথচ ছোটবেলায় “ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরে ”এটা পাঠ্যবইতে আর স্থান পাওয়ার যোগ্য নয়। যদিও নদী পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে তবে সেই সম্ভাবনা নাকি ক্ষীণ। মৃত নদীর গল্প এখন থাক।
 
এবার আসি ফুটপাত আর সরকারি জায়গা দখল প্রসঙ্গে। কার এত বুকের পাঠা শীর্ষ পর্যায়ে মদদ ছাড়া সরকারি সম্পদে হাত দেওয়ার। অবশ্য শুনি প্রতি সরকারের আমলেই দলীয় লোকজন জায়গা দখলের প্রতিযোগীতায় নামে। আমি অবশ্য শোনা কথায় কান দেইনা। তবে ফুটপাত এত মানুষের শহরে খালি থাকা দরকার নাকি ইজারা দেওয়া দরকার সেটা ভাবুন।

ভেজালে ভরা সুস্বাদু খাবার এখন ঢাকার প্রথম আকর্ষণ। সেটা ফুটপাতের হোটেল থেকে শুরু করে পাঁচতারা পর্যন্ত। বাড়িতে বসে যা খাই সে সবও বিষাক্ত। খাবার গ্রহণের সাথে একটা শব্দই সবচেয়ে উপযুক্ত “আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান।”

এতবড় শহরের কয়টি এলাকায় পার্ক তো ডূরের কথা অন্তত ১০ ফুট বাই ১০ ফুট মাপের মাঠ আছে? এই জ্যামের শহরে স্কুল ফেরা বাচ্চাদের প্রতিদিন কি দূরের খোলা বাতাসে নেওয়া সম্ভব? নিরুপায় বাবা-মা বাচ্চাদের যন্ত্রের হাতে সপে দিচ্ছে আর বাচ্চারা ভিডিও গেইম বা পর্ণে আসক্ত হয়ে পড়ছে।

সমস্যা অনেক তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা আমরা জনগণ। আমরা বোধ হয় নিয়ম না মেনে চলতেই পছন্দ করি। যেকোনো সৌন্দর্য স্থাপনের ছ’মাসের মধ্যে আমরা যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে তা ভাগাড় বানিয়ে ফেলি। ফুটওভার ব্রিজগুলো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এত জনবহুল শহরে সরকারের পক্ষে সম্ভব নয় পাহারা বসানো। তবে মোটা অঙ্কের জরিমানা আদায় করলে হয়তো কিছুটা কাজ হতো। অবশ্য জরিমানা সঠিক জায়গায় পড়বে কি না সেই নিশ্চয়তা নেই।

শুধু সমস্যার কথায় বললাম, প্রশংসা পাওয়ার জন্যও নয় বা কারো গালি খাওয়ার জন্যও নয়। কারণ এই শহর আপনাদেরও আপন। আপন ঘরকে নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখতে পারলে নিজের শহরকে নিয়ে দেখবো না? কখনও কি আমাদের অধিকার আদায় করে নিতে পারবো না? একবার ভাবুন তো সকালে উঠে অফিস যাওয়া থেকে শুরু করে বাড়ি ফিরে আসা পর্যন্ত আপনার কতটা ভোগান্তি হয়। আপনার শহরের উত্তপ্ত সূর্যটাও ৪০ ডিগ্রী তাপমাত্রায়ও আপনাকে প্রশান্তি দিত যদি আপনি পদে পদে নাকাল না হতেন। শহরের গলিতে খুনির রক্তচক্ষু তাকিয়ে না থাকলে মধ্যরাতে আপনিও কারো হাত ধরে হাটতেন। সব সমস্যা আস্তিনের নীচে লুকিয়ে কড়া মেকআপে ঢেকে ঢাকাকে আপাততঃ আপনি চকচকে দেখতে হয়তো ভালোবাসেন, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে আপনার সন্তান এই শহরের বাতাসে কিভাবে বড় হবে ভেবে দেখেছেন?

লেখকঃ জান্নাতুল ফেরদৌস মিতু (কানাডা প্রবাসী)

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে