অপরাধের ভিন্ন মাত্রা : গুম

ড. সা’দত হুসাইন

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০১:৪০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বছরের প্রতিটি দিনই বর্তমানে কোনো না কোনো ‘দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। এর মধ্যে কিছু মজার বিষয়ও থাকে। সাধারণ মানুষের কাছে তেমন প্রাসঙ্গিকতা না থাকলেও ওই বিষয়ের মানুষের কাছে এর গুরুত্ব রয়েছে। তারা ওই ‘দিবস’ উদযাপনের মাধ্যমে সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি তুলে ধরে। দেখা যাচ্ছে, এই দিবসগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিককালে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বিশ্ব গুম দিবস, যা ৩০ আগস্ট তারিখে পালিত হয়। এ দেশের সাধারণ মানুষ এ অপরাধের ব্যাপকতা কয়েক দশক আগে অবহিত ছিল না। আসলে বাংলাদেশে এ অপরাধটিও ঘটত না বললেই চলে। ঘটলেও সংখ্যাস্বল্পতার কারণে তা মানুষের অনুভবকে তেমনভাবে নাড়া দেয়নি। গত এক দশকে গুমের ঘটনা মাত্রাতিরিক্ত সংখ্যায় ঘটছে বলে মনে হয়। ফলে এ অপরাধটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও অপরাধটি সম্পর্কে মানবাধিকার সংস্থা, রাজনৈতিক সংগঠন ও বুদ্ধিজীবী মহল উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

গুমের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে ঊহভড়ৎপবফ ফরংধঢ়ঢ়বধৎধহপব। বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করলে এর অর্থ দাঁড়ায় কোনো রাজনৈতিক দল, যা এর অঙ্গসংগঠন অথবা সরকারের কোনো বিশেষ সংগঠন বা বাহিনী কর্তৃক ব্যক্তিবিশেষকে তার বাড়ি, অফিস, রাস্তাঘাট অথবা জনস্থান (পাবলিক প্লেস) থেকে তুলে নিয়ে তাকে কোনো গোপন স্থানে আটক করে রাখা অথবা লোকচক্ষুর আড়ালে হত্যা করা। লাশ কখনো গোপন করে ফেলা হয় বা কখনো প্রকাশ্যে পড়ে থাকে। ব্যক্তিকে গোপন স্থানে আবদ্ধ রেখে অপহরণকারীরা কখনো কখনো তার নিকটাত্মীয়র কাছে মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণ আদায় করে কখনো গুম করা ব্যক্তিকে অপরাধীরা ছেড়ে দেয়। আবার কখনো বা মুক্তিপণ পাওয়া সত্ত্বেও তাকে হত্যা করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে অপহৃত ব্যক্তিকে কয়েক মাস, এমনকি বছরাধিক সময় আটক রেখে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ছেড়ে দেওয়া হয়। দেখা গেছে, মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা তাদের অপহরণ বা আটক অবস্থায় থাকার অভিজ্ঞতার ব্যাপারে বেশি কিছু বলতে চায় না। ভয়ঙ্কর ভয়ভীতি তাদের জেঁকে বসে।

দ-বিধিতে গুম কথাটি সুনির্দিষ্টভাবে না থাকলেও এ ধরনের অপরাধ ভালোভাবেই উল্লেখ করা আছে। এ অপরাধকে বাংলায় অপহরণ বা বেআইনিভাবে আটক রাখা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ইংরেজিতে একে বলা হয় করফহধঢ়ঢ়রহম অথবা অনফঁপঃরড়হ। এর জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রয়েছে। গুমের ব্যাপারটি প্রায় সমরূপ অপরাধ হলেও অপরাধীর পরিচয়, চরিত্র ও অপরাধের প্রকৃতিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। গুমের ক্ষেত্রে অপরাধীরা সাধারণত রাজনৈতিক অথবা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ধরনের অপরাধের কথা হিটলার, ফ্রেংকো, সালজার, মুসোলিনি শাসনামলে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। হিটলারের ‘গেস্টাপো’ বাহিনী আজও দেশ-বিদেশে সজ্জন ব্যক্তিদের মনে ভয়ঙ্কর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এরা বাড়িঘর থেকে ভিন্ন মতাদর্শের অনুসারী সন্দেহে লোকজনকে ধরে নিয়ে যেত। তার পর তাদের আর কোনো হদিস পাওয়া যেত না। সাধারণত মনে করা হয়, এদের কোনো গোপন স্থানে নিয়ে হত্যা করা হতো। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে, সত্তরের দশকের পর লাতিন আমেরিকায় ব্যাপকভাবে গুমের ঘটনা ঘটতে থাকে। মেক্সিকো, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, বলিভিয়ায় ভিন্ন মতাবলম্বী ব্যক্তিকে গুম করা হতো। নগণ্যসংখ্যক ব্যক্তি ছাড়া পেলেও বাকি সবাইকে হত্যা করা হয়। ভাগ্যবান কিছু ব্যক্তি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ইরানে শাহের আমলে ‘সাভাক’ বাহিনী অনেক লোককে গুম করে। সাম্প্রতিককালে ইরাক, আফগানিস্তান, ইসরায়েল, সিরিয়া, পাকিস্তানে অপহরণ ও গুমের ঘটনা ঘটছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি হানাদার দোসর আলবদর-আলশামস বাহিনী দেশের স্বনামধন্য ব্যক্তিদের তাদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গোপন জায়গায় নৃশংসভাবে খুন করেছে। দুঃখজনক হলেও বাংলাদেশে প্রায় প্রতি মাসে পত্রপত্রিকায় গুমের ঘটনা প্রকাশিত হয়। মানুষের মনে দিন দিন আতঙ্ক বাড়ছে।

গুমের সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে, গুম হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না বা চায় না। সরকারি কর্তৃপক্ষ সরাসরি বলে দেয় এ ব্যাপারে তারা কিছু জানে না। তারা এমনও বলে যে, গুম হওয়া ব্যক্তি নিজেই কোথায় পালিয়ে আছে। একসময় সে নিজেই বেরিয়ে আসবে। গুম হওয়া ব্যক্তি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলে তারা বলে যে, এটি গুম হওয়া ব্যক্তির নিজের দলের কারসাজিমাত্র। তারা পরিকল্পিতভাবে গোপনে গুম হওয়া লোককে অন্য কোথাও সরিয়ে রেখেছে। এটি সরকারকে বিব্রত করার একটি কৌশলমাত্র। সময়-সুযোগমতো গুম হওয়া বা ব্যক্তি তার গোপন অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসবে। এ কথা সত্যি যে, এমন দু-একটি দৃষ্টান্ত তারা দেখাতে পারছে। সাম্প্রতিককালে জঙ্গি আক্রমণের ক্ষেত্রে জঙ্গিদের কেউ কেউ কয়েক মাস ধরে নিরুদ্দেশ ছিল। তাদের কেউ অপহরণ করেনি, পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা জঙ্গিদের গোপন আস্তানায় দিন কাটিয়েছে। এর সূত্র ধরে কর্তৃপক্ষের জোর দাবি হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি গুম হলেই তাকে আটক করা হয়েছে বা হত্যা করা হয়েছে এমনটা বলা যাবে না। গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের বড় দুঃখ হচ্ছে, তারা জানে না গুম হওয়া ব্যক্তি মৃত না জীবিত আছে। তারা একটি দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে সময় কাটায়। যদি তারা জানত গুম হওয়া ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে, তাহলে হয়তো ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী তার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারত।

গুম হওয়া ব্যক্তির আইনি মর্যাদা কী, সেটাও সঠিক বোঝা যায় না। তার সম্পর্কে কীভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে, সে কথাও তার আত্মীয়স্বজন বলতে পারে না। এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের দিন কাটে। আসলে কষ্ট সহ্য করা ও হা-হুতাশ ছাড়া তাদের কিছুই করার থাকে না। এদিক থেকে গুমের অপরাধ খুনের অপরাধ থেকে নিকৃষ্টতর, অধিকতর ব্যথাদায়ক।

এ অপরাধ থেকে সমাজকে মুক্তি দিতে হবে। যারা এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের সম্ভব হলে আইনের আওতায় আনতে হবে; যা আসলে দুরূহ ব্যাপার। একমাত্র নিয়তির নির্দেশেই কোনোদিন হয়তো এর বিচার হবে। যেমন হয়েছে চিলির স্বৈরাচারী একনায়ক পিনোসের।

য় ড. সা’দত হুসাইন : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে