সংশোধন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত

আইনেই ধ্বংস হবে ব্যাংকিং খাত

  হারুন-অর-রশিদ

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

সংশোধন হচ্ছে ব্যাংক কোম্পানি আইন। চলতি বছরের ৮ মে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর গত মঙ্গলবার এর খসড়া সংসদেও উত্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী। যেখানে একই পরিবার থেকে ব্যাংকে চার পরিচালক এবং একটানা নয় বছর এই পদে থাকার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এমনটা করলে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এ আইনের ফলে ‘ফ্যামিলি ব্যাংকিং’ গড়ে উঠবে। একই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে অরাজকতা ও লুটপাটেরও সুযোগ পাবেন। থেমে যাবে ব্যাংকিং খাতের অগ্রগতি ও প্রগতি। ব্যাহত হবে জনকল্যাণ। তবে সরকারের মতে, নয় বছর একটি ব্যাংকের ইতিহাসে কিছুই না।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান আইনে এক ব্যক্তি দুই মেয়াদে ছয় বছর এবং একই পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজন ব্যক্তি পরিচালক হতে পারেন। আর সংশোধিত আইনে ব্যাংকে একই পরিবারের চারজনকে পরিচালক নিয়োগ এবং একটানা নয় বছর পরিচালক পদে থাকতে পারবেন। তা ছাড়া এখন ৪০০ কোটি টাকা মূলধনের জোগান দিয়ে ব্যাংকের মালিক হওয়া যায়। অথচ ব্যাংকের আমানত হাজার হাজার কোটি টাকা। সেই আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যাংক পরিচালনায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তাই অনেক মালিকই পরস্পরের যোগসাজশে আমানতের হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকরা প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে।
এদিকে পরিচালকদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাকে মারধর, বেনামে ঋণ নেওয়া, অন্যের নামে শেয়ার কেনারও অভিযোগ রয়েছে। একই পরিবারের সদস্যরা পাঁচ থেকে ছয়টি ব্যাংকের পরিচালকও রয়েছেন। এর মধ্যে আবার বিদ্যমান আইন সংশোধন করা হলে আইনগতভাবে একই পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে একক আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হবে। কারণ মালিকরাই বসে নীতি প্রণয়ন করেন, আবার তারাই সে নিয়ম ভাঙেন।  
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এই সংশোধনী একেবারেই অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয়। এটি হলে ব্যাংকের সুশাসন আরও ভেঙে পড়বে। লুটপাট আরও বাড়বে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাও নষ্ট হবে। সার্বিকভাবে আর্থিক খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গত মঙ্গলবার চলমান সংসদ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল-২০১৭ উপস্থাপন করেন। সংশোধনের যুক্তি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনটি ১৯৯১ সালের। ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, এটা অকল্পনীয়। আগে ব্যাংকে মূলধন লাগত আট কোটি, এখন লাগে ৪০০ কোটি। তা ছাড়া শুরু থেকেই ব্যাংক পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ছিল। এর ব্যাপারটাই এমন যে উদ্যোক্তাদের বিশেষ ভূমিকা থাকে। আর নয় বছর একটি ব্যাংকের ইতিহাসে কিছুই না। যদিও এটির বিরোধিতা করা হলেও কণ্ঠভোটে তা নাকচ হয়ে যায়। পরে বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়।
তবে এ আইন কার্যকর হলে ব্যাংকিং খাতে লুটপাট বাড়বে উল্লেখ করে জাতীয় পার্টির সাংসদ ফখরুল ইমাম বলেন, একজন ব্যক্তির স্বার্থে আইন হতে পারে না। একই পরিবারের চারজন করে পরিচালক করা হলে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। এতে ‘ফ্যামিলি ব্যাংকিং’ নামে দেশে ব্যাংক দেখা যাবে। ফ্যামিলি ব্যাংক হলে অর্থনীতির আর কিছু বাকি থাকবে না, সব লুটপাট হয়ে যাবে। একমাত্র ব্যাংকের পরিচালকের আত্মীয়স্বজনই সুবিধা পাবেন, আর কেউ পাবেন না। খেলাপি ঋণও বেড়ে যাবে।
একই কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তিনি বলেন, এই আইন আমরা সমর্থন করতে পারছি না। এতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিছু ব্যক্তি ও পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত হবে। বাংলাদেশ জন্মের সময় ও বর্তমান সরকারের লক্ষ্য কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন। ব্যাংক ও বীমা এই দুটো খাত কিছু ব্যক্তির কাছে চলে গেলে জনকল্যাণ ব্যাহত হবে। আগে এক পরিবারের একজনের পরিচালক হওয়ার সুযোগ ছিল। সেটি বাড়িয়ে পরে দুজন, এখন চারজন করা হচ্ছে। আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, একজন পরিচালকের মেয়াদ ছয় বছরই যথেষ্ট, নয় বছর অনেক লম্বা সময়। কারণ নতুন নেতৃত্ব আসতে হবে। এক ব্যক্তির মাধ্যমে অগ্রগতি ও প্রগতি সম্ভব নয়।  
সাবেক এই গভর্নর আরও বলেন, আইনটি চূড়ান্ত করার আগে বিষয়গুলো আবার পর্যালোচনা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ব্যাংক বিষয়ে অভিজ্ঞদের মতামত নেওয়া দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ড. ইব্রাহীম খালেদ বলেন, সংশোধিত আইনটি ব্যাংকের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে। এটি না করার জন্য আমরা বলেছিলাম। সরকার আমাদের কথা শোনেনি। অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সরকারি ব্যাংক শেষ হয়ে গেছে। এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। ব্যাংকে দীর্ঘদিনের জন্য পরিবারতন্ত্র কায়েম হবে। সর্বক্ষেত্রে সামাজিকীকরণের যে কথা বলা হচ্ছে, এ আইনের কারণে তা আর হবে না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে