জঙ্গি অর্থায়নের হোতা সবুজ স্পেনে গ্রেপ্তার

১১ সহযোগী ঢাকায় আটক

  শাহজাহান আকন্দ শুভ

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:১৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে জঙ্গি অর্থায়নের অন্যতম হোতা আতাউল হক সবুজকে স্পেনে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। তার স্প্যানিশ স্ত্রীকেও আইনের আওতায় আনা হয়। স্পেন গোয়েন্দা সংস্থা ও র‌্যাবের সমন্বিত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত শুক্রবার সবুজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানায় র‌্যাব। একই সময় ঢাকায় সবুজের মালিকানাধীন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানের ১১ কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের সবাই জঙ্গি অর্থায়নে সবুজের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন।

আতাউল সবুজকে গ্রেপ্তারের জন্য কয়েক মাস আগে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পেন পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠির সূত্র ধরে স্পেন পুলিশ ঢাকায় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে যান। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, আতাউল হক সবুজ ওয়ামি টেকনোলজি সফটওয়্যার কোম্পানিতে স্পেন থেকে টাকা পাঠাতেন। আর ঢাকায় এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা-কর্মচারীরা নির্দিষ্ট গন্তব্যে সেই টাকা পৌঁছে দিতেন।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদে অর্থায়ন করতে স্পেন থেকে ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা পাঠান আতাউল হক সবুজ। কিন্তু এই টাকা জঙ্গিবাদে কাজে লাগানোর আগেই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয়। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলায় পুলিশ সবুজের বাবা আবুল হাসনাতসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। আবুল হাসনাত পরবর্তীকালে মারা যান। অপর ৫ আসামির সবাই জামিনে আছেন।

ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা বলেছেন, আতাউল হক সবুজের আরেক ভাই সাইফুল হক সুজন ২০১৫ সালে সিরিয়ার রাক্কায় মার্কিন বাহিনীর বিমান হামলায় নিহত হন। এই সুজনই মূলত তার পুরো পরিবারকে জঙ্গিবাদে ধাবিত হতে উদ্বুদ্ধ করে। যে টাকা পুলিশ ২০১৫ সালে জব্দ করেছিল, তা স্পেন থেকে পাঠান আতাউল হক সবুজ। সেই অর্থ চীন হয়ে আসে। সবুজের মালিকানাধীন আইব্যাকস সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই টাকা আসে। পরে জঙ্গি নেতা বাশারুজ্জামান চকলেটের হাত হয়ে তামিম চৌধুরীর কাছে পৌঁছনোর কথা ছিল। কিন্তু ধরা পড়ে যাওয়ায় সবুজ পরে স্পেন থেকে ওয়ামি টেকনোলজি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে টাকা পাঠানো শুরু করেন, যেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখে ধরা না পড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত র‌্যাবের গোয়েন্দাদের কাছে বিষয়টি গোপন থাকেনি। তারা অনেক দিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নজর রাখছিলেন। সবুজ ঢাকায় বড় ধরনের জঙ্গি হামলা চালানোর জন্য ওই সময় ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন বলে জানান র‌্যাব কর্মকর্তারা।

র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল ওয়ামি টেকনোলজি কোম্পানি জঙ্গি অর্থায়নে জড়িত। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার বিকালে র‌্যাব সদস্যরা প্রতিষ্ঠানটির পল্লবী অফিস ছাড়াও খুলনা ও রাজশাহীতে অভিযান চালান। রাত ৮টা পর্যন্ত অভিযানে প্রতিষ্ঠানের ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এদের অধিকাংশই আগে সবুজের মালিধানাধীন আইব্যাকস সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তাদের কাছ থেকে ১১টি ল্যাপটপ, পাসপোর্টসহ অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। তিনি বলেন, ঠিক একই সময় স্পেনে গ্রেপ্তার হন আতাউল হক সবুজ। তাকে গ্রেপ্তারে অনেক দিন ধরেই র‌্যাব প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে স্পেনের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে আসছিল। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গুলশানে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর থেকে র‌্যাব এ পর্যন্ত জঙ্গিবাদে ব্যবহৃত ৬৮ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে।

জানা গেছে, ২০০৫ সালে সাইফুল হক সুজন ও তার ভাই আতাউল হক সবুজ আইব্যাকস সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯টি দেশে এর শাখা ছিল। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় ছিল যুক্তরাজ্যে। ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর সিরিয়ায় মার্কিন বাহিনীর বিমান হামলায় সাইফুল হক সুজন মারা গেলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য আইব্যাকসের কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পরই স্পেনে থাকা সবুজ সিমটেল নামে স্পেনে নতুন একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঢাকায় ওয়ামি টেকনোলজি কোম্পানিতে টাকা পাঠাতেন। সেই টাকা ব্যবহৃত হতো জঙ্গি অর্থায়নে।

জানা গেছে, পড়াশোনা করার জন্য ২০০৩ সালে সাইফুল হক সুজন ও আতাউল হক সবুজ লন্ডনে যান। মূলত লন্ডনে থাকা অবস্থায় তারা ২০১১ সালের দিকে উগ্রপন্থা চর্চায় ধাবিত হন। পরবর্তীকালে জঙ্গিবাদ কার্যক্রমের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন। সুজন আইএস ঘাঁটিতে বসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আইএস যোদ্ধা সংগ্রহ করতেন। এ কাজ করতে গিয়ে সুজনের সঙ্গে বিশ্বের অনেক দেশের উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর নিবিড় যোগাযোগ তৈরি হয়।

জানা গেছে, সিরিয়ায় সুজন আইএসের তথ্যপ্রযুক্তি-বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর সিরিয়ার বিমান হামলায় সাইফুল হক সুজন নিহত হন। এর পরই আলোচনায় চলে আসেন এই বাংলাদেশি নাগরিক। জুনাইদ হুসেন নামে এক ব্রিটিশ তথ্যপ্রযুক্তি-বিশেষজ্ঞ সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের ড্রোন হামলায় নিহত হলে সুজন আইএসের নতুন তথ্যপ্রযুক্তির বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। এই দায়িত্ব পাওয়ার পরই সুজন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আইএস যোদ্ধা সংগ্রহের কাজ করতেন। স্পেনে থাকা বড় ভাই সবুজের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হতো।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে