জাতির মুক্তির পথ

প্রকাশ | ০৫ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০৭

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ

মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে প্রাণ পাওয়া স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ যখন তার জয়যাত্রা শুরু করেছিল তখন থেকে আজ পর্যন্ত এই রাষ্ট্রটি সম্পর্কে দেশি ও বিদেশি বহু পর্যালোচক এর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই আশার কথা শুনিয়েছেন। অন্য নতুন রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ যে তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে এবং এসব বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের জন্য কালে যে শুভফল বয়ে আনবে তাও বলেছেন।

এক. ছোট্ট ভূখ-ে বিরাট জনসমষ্টি বসবাস করলেও এই জনসমষ্টি নৃতাত্ত্বিক সূত্রে সমজাতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিম-লে সমমাত্রিক। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এমনটি সাধারণত দেখা যায় না। বাংলাদেশে বাঙালিরাই হলো ৯৭ শতাংশ। এ দেশে অন্যূন ৫৭টি ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ বাস করলেও তাদের সংখ্যা ৩ শতাংশের মতো। ৯৭ শতাংশ বাঙালির মধ্যে ৯০ শতাংশ মুসলমান। ভাষার দিক থেকেও দেখা যায় প্রায় ৯৭ শতাংশ জনসমষ্টির ভাষা বাংলা। জীবনাচার, চালচলন, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং প্রাত্যহিক জীবনের আচার-আচরণে এক ধরনের সমজাতীয়তা পরিস্ফুট।

দুই. ছোট বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুষম অগ্রগতির নিদর্শন এখনো সুস্পষ্ট হয়নি বটে, কিন্তু আঞ্চলিকতার বিষাক্ত দন্ত-নখরের তীক্ষèতা যা জাতীয় রাজনীতিকে খ-ছিন্ন করতে পারে তা অনুপস্থিত।

তিন. অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমানভাবে বঞ্চিত হয়, সমানভাবে শাসকশ্রেণি ও পীড়নকারীদের নির্যাতন সহ্য করে, বিরাট জনসমষ্টির বৃহৎ অংশটি শিক্ষাদীক্ষায় অনগ্রসর থেকেও আশা-আকাক্সক্ষায় ভয়ঙ্করভাবে ভবিষ্যৎমুখী।

চার. বাংলাদেশের জনসমষ্টিগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য থাকলেও উন্নয়নমুখী রাজনীতি সম্পর্কে তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক ধরনের সহমত। হাজার বছর ধরে একই ভূখ-ে বসবাস করে, সনাতন কৃষির ওপর নির্ভরশীল থেকে, পদ্মা-মেঘনা-যমুনাবিধৌত সমতলে দারিদ্র্যক্লিষ্ট হয়ে জীবিকা নির্বাহ করে পারস্পরিক সহযোগিতার মন্ত্রে হয়েছে দীক্ষিত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে তাই গড়ে উঠেছে সহনশীলতা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তাই হয়েছে এ সমাজের উল্লেখযোগ্য সম্পদ।

১৯৪৮-৫২ সময়কালের ভাষা আন্দোলন, বিশেষ করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নির্মম সময়েও দেখা গেছে বাংলাদেশের মানুষ কত ঐক্যবদ্ধ, কত সংহত, কত দৃঢ়সংকল্প। নেতৃত্বের দিকে না তাকিয়ে সাধারণ মানুষ এগিয়ে গেছে মিছিলের অগ্রভাগে। কারো ডাকের অপেক্ষা না করে ছুটে গেছে সবার আগে। অনেকে আহত হয়েছে। কেউ বা নিহত হয়েছে। কেউ কিন্তু আর্তনাদ করেনি।

মাত্র চার দশকের মধ্যে জাতি হিসেবে বাংলাদেশ আজ বিভক্ত। খ-বিচ্ছিন্ন। বিভক্ত-বিদগ্ধ সমাজ। সাংবাদিকতা জগৎ, কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী মহল, সংস্কৃতিসেবী, এমনকি ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক পর্যন্ত। বিভক্ত প্রশাসকরা। ব্যবহারবিদ, প্রাণরক্ষাকারী চিকিৎসকরাও। বিভক্ত সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল বিচারকরাও। শুধু বিভক্ত নয়, অসহিষ্ণুতার তীর ঘেঁষে, পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুত। এমনিতেই এই সমাজ ধনী-দরিদ্র, সাক্ষর-নিরক্ষর, গ্রামবাসী-নগরবাসী প্রকরণে খ-ছিন্ন। রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত ডান-বাম-কেন্দ্র এই বিভাজন তো রয়েছেই। তার ওপর ক্ষমতাসীনরা নতুন বিভক্তি রেখা টেনেছেন স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ। সব মিলিয়ে জাতীয় ঐক্য এবং সম্প্রীতির ক্ষেত্রে এখন চলছে এক নৈরাজ্য। এই অবস্থা অনভিপ্রেত। হাত-পা বেঁধে কাউকে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামালে যা হয়, হাজারো প্রকরণে বিভক্ত জাতির অগ্রগতি অর্জনের প্রতিযোগিতায় তেমনি ফল আসে। মতাদর্শভিত্তিক বিভাজন কাম্য, কেননা তা সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে কিন্তু ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলের সেøাগানে বিভাজন অনাকাক্সিক্ষত। এই বিভাজন স্বাধীন চিন্তা অথবা স্বাধীনভাবে মতবাদ ব্যক্ত করার ক্ষেত্র সঙ্কুচিত করে। এতে আক্রমণাত্মক উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। হিংসা-প্রতিহিংসামূলক কার্যক্রমের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে। পরিশীলিত রুচির ক্ষেত্র সীমিত হয়ে আসে। অশোভন উচ্চারণের প্রবণতা ভয়ঙ্করভাবে বৃদ্ধি পায়। জাতীয় জীবন হারায় তার সৃষ্টিশীলতা। অগ্রগতির প্রতি স্তরে স্থবিরতার জন্ম হয়। রাজনীতি ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রদর্শন শুরু হয়। প্রতিপক্ষ দলনের মাত্রা আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। নেতার প্রতি আনুগত্য ছাড়া অন্য কোনো আচরণ কর্মীদের কাছ থেকে আসে না। নেতাকেন্দ্রিক দলীয় বিভাজনের কবলে আজ বাংলাদেশ। এর অবসান হওয়া প্রয়োজন জাতীয় স্বার্থে, সুস্থ রাজনীতির স্বার্থে, দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাফল্যের স্বার্থে।

সমাজে কোন কাজটি উত্তম আর কোনটি মন্দ তা কোনো নাগরিক সরকারের কাছ থেকে শিখতে চায় না। শিখতে চায় না কোনটি নীতিসম্মত আর কোনটি নীতিবিরুদ্ধ। জনগণ শুধু জানতে চায়, যারা নিজেদের জন্য সোনা-চাঁদির পাহাড় গড়েন আর যারা নিভৃতে নীরবে নিজেদের অন্তরের উষ্ণতা এবং আত্মার মহিমায় সমাজে ছোট ছোট শান্তির নীড় রচনা করেন তাদের পার্থক্য নির্ণয় করতে সরকার শিখেছে কিনা। আর এ জন্য প্রয়োজন যে অন্ধকার কুঠুরিতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বন্দি হয়ে পড়েছে তার দ্বার উন্মোচন যেন মুক্ত আলোয়, নীল আকাশের নিচে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার খোলস পাল্টাতে সক্ষম হয়। রাজনীতি সুস্থ না হলে বিভাজনের অভিশাপ থেকে এ জাতি মুক্তি পাবে না। অসুস্থ রাজনীতি কাছ থেকে দূর করেছে। আপনাকে পর করেছে। ঐক্যের গ্রন্থি শিথিল করে বিভক্তির মাত্রা বাড়িয়েছে। সহনশীল উদারতাকে নির্বাসন দিয়েছে। বিভক্তির আগ্রাসনে সমগ্র জাতীয় জীবন আজ ক্ষতবিক্ষত। এই বিভক্তির অবসান না ঘটলে বাইরের চাপ বা শত্রুর প্রয়োজন হবে না। শুধু অন্তস্ফোটনের (ওসঢ়ষড়ংরড়হ) মাধ্যমেই জাতির ধীশক্তিসহ অন্তরাত্মা পর্যন্ত অসার হয়ে পড়বে। ধসে পড়বে হাজার বছরে গড়া জাতীয় সৌকর্যের সৌধটি পর্যন্ত।

 

 

 রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ