রোহিঙ্গা সমস্যা : মানবিক বিবেচনা ও বাস্তবসম্মত সচেতনতা চাই

আবুল মোমেন

১১ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৭, ০০:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা সংকটটি মিয়ানমার বাংলাদেশের কাঁধে তুলে দিতে চাইছে। আমাদের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৯৯২-৯৩ এবং তারও আগে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ রয়ে গেছে। এবারে এসেছে কমপক্ষে সাড়ে ছয় লাখ। ভারত জানাচ্ছে, সে দেশে অবৈধ রোহিঙ্গা রয়েছে ৪০ হাজার। সৌদি আরবে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা শোনা যায় দুই লক্ষাধিক। এ ছাড়া পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ এবং পশ্চিমা বিশ্বে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যাও দুই লাখের কাছাকাছি। সব মিলে বিভিন্ন সময়ে দেশছাড়া হওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৪-১৫ লাখ হবে। এখনো সে দেশে বাকি যে ৫-৬ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে তাদেরও বিতাড়নের চেষ্টা চালাচ্ছে সে দেশের সেনাবাহিনী।

মিয়ানমারের এই রোহিঙ্গাবিরোধী তৎপরতা শুরু হয়েছিল গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত করে জেনারেল নে উইন ক্ষমতায় আসার পর সেই ১৯৬২ সাল থেকে। আমার মনে পড়ছে, ষাটের দশকেই চট্টগ্রাম শহরে তৎকালীন বার্মা থেকে আগত বেশ সম্পন্ন মুসলিম পরিবারের মানুষজন দেখা যেত। ১৯৭৭-৭৮ এ জেনারেল জিয়ার আমলে বড় ধরনের রোহিঙ্গা বিতাড়নের ঘটনা ঘটেছিল। তখন জিয়ার সরকার আর চট্টগ্রামের জামায়াতপন্থি জেলা প্রশাসক মিলে তাদের মধ্যে মুসলিম জাত্যাভিমান জাগিয়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। আশির দশকে আমরা রোহিঙ্গা বা আরাকান মুসলিমদের কিছু সংগঠনের নাম শুনেছি। তাদের সংগঠিত করার কাজে পাকিস্তানের আইএসআইর ভূমিকার কথাও শোনা যেত। এমনও শোনা যেত যে, আরাকান ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের কিছু অংশ মিলিয়ে একটি মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে পাকিস্তানের মদদে। এ সময় অনেকেই চট্টগ্রাম, দেশের অন্যান্য জায়গা এবং পাকিস্তান-ভারতসহ বিদেশেও পাড়ি দেয়। পরে এসব সংগঠনের তৎপরতার কথা তেমনভাবে আর শোনা যায়নি।

তবে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন কেবল বাড়িয়েই গেছে। ১৯৮২ সাল থেকে তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। তখন থেকে রোহিঙ্গারা একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে চরম মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। তারা দারিদ্র্যের কবলে পড়ে, অশিক্ষার শিকার হয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে জীবন কাটাতে থাকে। এটাও কিন্তু তাদের দেশছাড়া করার ষড়যন্ত্রের অংশ। নিশ্চিতভাবেই এ সময়ও সীমান্ত পেরিয়ে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিদেশে পাড়ি দিয়েছে। এভাবে গত অর্ধশতকে অর্ধেকের বেশি রোহিঙ্গা তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে গেছে। একটি জনগোষ্ঠীর এ রকম নীরব উৎখাতের বিষয়টির প্রতি বিশ্ববাসী যথাযথ নজর দেয়নি।

কিন্তু এবারের সামরিক অভিযানের আগেই মিয়ানমার থেকে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের তরফ থেকে আসন্ন বিপদের কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু জাতিসংঘ বিষয়টি তেমন আমলে নেয়নি। ঘটনার আগেই যদি আন্তর্জাতিক অভিমতের চাপ তৈরি করা যেত তা হলে হয়তো এমন একটি ট্র্যাজেডি পরিহার করা সম্ভব হতো। কিন্তু তা ঘটেনি। মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং সরকার কিন্তু তাদের ভূমিকা নিয়ে খুব একটা রাখঢাক করছে না। তারা যে সংগঠনটির সীমান্ত চৌকি আক্রমণের অজুহাত দিচ্ছে সেই আরসা বা আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির সাংগঠনিক কাঠামো, তৎপরতা, নেতা বা মুখপাত্রের সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়নি। আশঙ্কা হয় সেই ১৯৬২-পরবর্তী রোহিঙ্গা বিতাড়নের ধারাবাহিকতায় আজ তা আরও জোরদার করা, এমনকি এবার একেবারে এথনিক ক্লিনজিং করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই এই অভিযোগ সামরিক বাহিনীর বানানো ছুতামাত্র। এমন পেটোয়া ক্ষুদ্র দল তৈরি করা সামরিক বাহিনীর জন্য কোনো ব্যাপার নয়। দরিদ্র, ক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষকে টাকার বিনিময়ে এ ধরনের কাজে জড়ানো যায়Ñ এমন দৃষ্টান্ত আমাদের অজানা নয়। কিংবা যদি সত্যিই একটি চরমপন্থি জঙ্গি রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর কাজ হয়ে থাকে এ আক্রমণ যার ফলে ১২ জন সেনাসদস্য নিহত হয়েছিলেন তার জন্য গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে, নির্বিচারে সাধারণ বেসামরিক নাগরিক হত্যা করে, ধর্ষণ-যৌন নির্যাতন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে কোনো যুক্তি কি পাওয়া যায়? মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং সরকার ও তার প্রধান ব্যক্তি অং সান সু চি সব অভিযোগ অস্বীকার করে কেবল মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে পার পেতে চাইলেই কি হয়ে যাবে? আজকের দিনে স্যাটেলাইট চিত্রে সারা বিশ্ববাসীই তো তাদের কীর্তি দেখছে। আর কোন পরিস্থিতিতে পড়লে ছয় লাখ মানুষ জান হাতে নিয়ে ভিটেমাটি, সহায়-সম্পদ ফেলে দেশ ত্যাগ করে? এখানে তো পদে পদে অনিশ্চয়তা। কেবল নৌকাডুবিতেই প্রাণ হারিয়েছে সহস্রাধিক পলায়নরত রোহিঙ্গা, যার অধিকাংশ নারী ও শিশু। শরণার্থীদের মধ্যে রয়েছে ৭০-৮০ হাজার সন্তানসম্ভবা নারী। আর কয়েক হাজার পিতৃ-মাতৃহীন অনাথ শিশু। তারা ভুগছে প্রায় ১৬ রকমের রোগে, যার মধ্যে কিছু রয়েছে ছোঁয়াচে রোগ, কিছু দুরারোগ্য ব্যাধি। আর মিয়ানমার বাহিনী ও চরমপন্থি বৌদ্ধদের হামলায় আহত হয়েছেন অনেকেই। এসবের জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীই দায়ী।

মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এই ঘটনার পর এবং বিশ্বব্যাপী নিন্দা-সমালোচনার মুখেও স্পষ্টভাবে রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করার জন্য তাদের নাগরিকদের উস্কানি দিয়ে চলেছেন। দীর্ঘদিনের জাতিবিরোধী এমন প্রচারণার ফলে আজ সে দেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে একশ্রেণির উগ্র জাতীয়তাবাদীর জন্ম হয়েছে, যারা রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণা ও অভিযানে অংশ নিচ্ছে। এর ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য সে দেশে বসবাস ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ যে আশা করছে সব শরণার্থীকে সে দেশে ফেরত পাঠানোর তা বাস্তবায়ন যে কতটা কঠিন হবে তা এই বাস্তবতার আলোকে সহজেই বোঝা যায়। অবশ্য বাংলাদেশ সরকার প্রথম থেকেই বলে আসছে, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। কেবল তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা হবে।

এদিক থেকে বলা যায়, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুতে সঠিক পথেই রয়েছে। অনেকের উস্কানি সত্ত্বেও সংঘাতের সব উস্কানি পরিহার করে সরকার সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের দিকেই অগ্রসর হয়েছে। আজকে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা ও অন্যান্য সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউভুক্ত সব দেশ বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। এমনকি মিয়ানমারের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারণে নমনীয় অবস্থান নেওয়া ভারত, চীন ও রাশিয়াও সমস্যা সমাধানের জন্য মিয়ানমার সরকারকে দৃঢ় বারতা দিয়েছে। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতিসমূহের আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা আসিয়ানে মালয়েশিয়ার জোরালো ভূমিকার ফলে এই আঞ্চলিক সংস্থা থেকেও মিয়ানমার সরকার যথাযথ বারতা পেয়েছে।

তবে প্রায় অর্ধশতাব্দী বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এখনো তাদের নিজস্ব চিন্তার বিচ্ছিন্নতায় চলতে চাইছে। তা বোঝা যায় আন্তর্জাতিক এত চাপের মুখে তারা আলোচনার পথে এলেও রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান কিন্তু বন্ধ করেনি। ফলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। ইইউ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে দূত পাঠাতে হবে। একইভাবে উচ্চক্ষমতা ও দক্ষতাসম্পন্ন কূটনীতিক-রাজনীতিকদের চীন, ভারত ও রাশিয়া পাঠিয়ে এ বিষয়ে সেসব দেশকে সক্রিয় ভূমিকায় নামাতে হবে। এ কাজটা দ্রুতই করতে হবে। কারণ রোহিঙ্গাদের ওপর সব নির্যাতন এখনই বন্ধ করতে হবে, তাদের দেশত্যাগ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে অবিলম্বে। তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত নাগরিকত্ব রহিতকরণসহ সব নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে এবং সব রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

শরণার্থীদের অবস্থান প্রলম্বিত হলে বাংলাদেশ নিজেও সংকটে পড়বে। দেশে খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়বে। প্রধানমন্ত্রীর মহীয়সী নারীর ভূমিকাকে স্বাগত জানিয়ে এবং এর প্রশংসা করেও এই ঝুঁকির বিষয়গুলো সবাইকে মাথায় রাখার কথা বলব। এ বিষয়ে আমাদের মানবিক বিবেচনা যেমন কাজ করবে, তেমনি বাস্তবসম্মত আশু সমাধানের বিষয়ে সচেতনতাও সক্রিয় থাকবে।

য় আবুল মোমেন : কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে