বাঙালির ভাষা ও আত্মপরিচয়

রফিকুল ইসলাম

১২ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৭, ০০:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর প্রায় সব ভাষারই আঞ্চলিক অর্থাৎ ঘরোয়া ও অনানুষ্ঠানিক রূপ এবং একটি প্রমিত বা আনুষ্ঠানিক রূপ থাকে। বাংলা ভাষারও বিভিন্ন আঞ্চলিক এবং একটি প্রমিত রূপ রয়েছে। ভাষার প্রমিত রূপকে বলা যায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাভাষীর যোগাযোগের ভাষা। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশে বিরাজমান ভাষার পরিস্থিতি বিবেচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বিভিন্ন ভৌগোলিক বা আঞ্চলিক রূপ রয়েছে, যা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা। আবার বাংলাদেশে বাংলা ভাষার একটি প্রমিত রূপও আছে, যা আনুষ্ঠানিক ভাষা।

ভাষার যে রূপটি আনুষ্ঠানিক পরিবেশে ব্যবহার করা হয় সেটাকে প্রমিত ভাষা বলা হয়। প্রমিত ভাষা আনুষ্ঠানিক পরিবেশে অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষে, কর্মক্ষেত্রে, বেতারে, টেলিভিশনে, সংবাদপত্রে, মঞ্চে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অপরদিকে আঞ্চলিক বা ভৌগোলিক উপভাষা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ব্যবহৃত কথ্যভাষা। বাংলাদেশে কয়েকটি আঞ্চলিক ভাষার উদাহরণ হলÑ চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, বরিশাল, যশোর প্রভৃতি অঞ্চলের উপভাষা।

বাংলাদেশে বিভিন্ন আঞ্চলিক উপভাষাগুলো খুবই জীবন্ত এবং বহুলব্যবহৃত। ফলে বাংলা ভাষার প্রমিত রূপের ব্যবহারে তাদের প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। অন্যথায় একজন আঞ্চলিক ভাষাভাষী যখন প্রমিত বাংলা বা ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করেন তখন তার ভাষায় আঞ্চলিক প্রভাব ফুটে ওঠে।

আমাদের স্কুলগুলোয় আগে প্রমিত ভাষায় শিক্ষাদান করা হত। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবনেই ভাষার প্রমিত রূপটি শিখে ফেলত। কিন্তু ক্রমেই শিক্ষকদের ভাষা সচেতনতার অভাবে শ্রেণিকক্ষে আঞ্চলিক ও প্রমিত রূপের মিশ্রণ ঘটিয়ে পাঠ প্রদান করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রমিত ভাষা শেখার সুযোগ যথাযথভাবে পায় না। পরিণতিতে আমাদের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশে ভাষা জ্ঞানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আমরা স্বাভাবিকভাবে ঘরে, বাজারে এবং পরিচিত পরিবেশে ঘরোয়া বা অনানুষ্ঠানিক ভাষা ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সেই ভাষার ব্যবহার বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। সে জন্য শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের পাঠদানের ভাষা সম্পর্কে অত্যন্ত সজাগ ও সচেতন থাকা প্রয়োজন। যদি প্রাথমিক পর্যায় থেকে যথাযথভাবে ভাষা শিক্ষাদান না করা হয় তাহলে পরবর্তী পর্যায়গুলোয় শিক্ষার্থীরা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয় না। কিন্তু শিক্ষকদেরই যদি ভাষা সচেতনতার অভাব থাকে এবং তারা যদি শিক্ষার্থীদের প্রমিত ভাষায় পাঠ প্রদান করতে সক্ষম না হন তাহলে শিক্ষার্থীরা যথোপযুক্ত ভাষা ব্যবহারে সমর্থ হতে পারে না।

একটি জাতির সৃজনশীল ও মননশীল প্রতিভা বিকাশে ভাষার সচেতনতা ভাষা ব্যবহারে প্রারম্ভগতা খুবই জরুরি। এবং এটা শুধু জাতীয় সাহিত্যকেই বিপর্যস্ত করে তোলে না, সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার ক্ষেত্রেও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন মাধ্যমে টক শোগুলো শুনলে যার পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের প্রচারমাধ্যমে সংবাদ পাঠক এবং পাঠিকাদের প্রচারিত সংবাদ কোনও কোনও সময় বোঝা যায় না। কারণ সংবাদ পাঠক বা পাঠিকা ভাষা সচেতন নন। তারা গড়গড় করে সংবাদ বলে যান, যেখানে ভাষার স্বাভাবিক নিয়মাবলি অর্থাৎ বাক্য, বাক্যাংশ, শব্দ ও অর্থের যথাযথ প্রকাশ ঘটে না। আমাদের দেশে শুধু সংবাদ পাঠক-পাঠিকাদের নয়, সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ প্রতিবেদকদেরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। যাতে তারা সর্বজনবোধ্য স্পষ্ট প্রমিত ভাষায় সংবাদ পরিবেশন করতে পারেন। আর টক শোয় এমন কাউকে ডাকা উচিত নয়, যিনি আনুষ্ঠানিক বা প্রমিত ভাষা ব্যবহারে পারদর্শী নন। বেতার ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক বা উপস্থাপিকাদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য। প্রায়ই টক শোয় উপস্থাপক বা উপস্থাপিকা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীতে পরিণত হন। ফলে তিনি তার কাক্সিক্ষত নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলেন।

আজকাল প্রচারমাধ্যমে সংবাদ বা সংবাদ প্রতিবেদনে প্রায়ই বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য শোনা যায়। ওই সব ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ বক্তার বক্তব্য মাঝে মাঝে এত উচ্চগ্রামে উচ্চারিত হয় যে, তাদের বক্তব্যের মূলকথা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। চিৎকার এবং উত্তেজনা রাজনৈতিক নেতাকর্মীর ভাষার পূর্বশর্ত কি না জানি না। কিন্তু তারা যদি তাদের বক্তব্য ধীরস্থির এবং শান্তভাবে রুচিশীল ভাষায় পেশ করেন তাহলে তারা তাদের বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হবেন। মোট কথা জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাষা ব্যবহারের বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে আমাদের সচেতনতার প্রয়োজন খুব বেশি। আসল কথা হল, ভাষা সচেতনতা যথাযথভাবে ভাষার ব্যবহার কিন্তু সে জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। সে কারণে সর্বপ্রথম শিক্ষকদের নিয়মিত ভাষার প্রশিক্ষণ দেওয়া অপরিহার্য। শ্রেণিকক্ষে যদি একজন শিক্ষক ভাষার যথাযথ ব্যবহারে অক্ষম হন তাহলে তিনি যে বিষয়ের শিক্ষকই হন না কেন, শিক্ষক হিসেবে সফল হওয়া তার পক্ষে কঠিন। নিজে নিজেও ভাষা শেখা যায় কিন্তু তা শুনে শুনে। ভালো ভাষা শুনে ভালো কথা শেখা যায়। ভাষার মধ্যে যদি রুচি-মননযুক্তি এবং সভ্যতা না থাকে তাহলে সে ভাষাকে সভ্য ভাষা বলা যায় না। কথায় বলে সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। কথাটার অর্থ সুন্দর ভাষার জয় সর্বত্র। মানুষের ভাষা যেমন সুন্দর হতে পারে, তেমনি কদর্য হতে পারে। একজন মানুষের ভাষার ভেতরে যদি রুচি না থাকে তাহলে তার মধ্য দিয়ে সেই ব্যক্তির মন-মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। মানুষ ভাষা দিয়ে পৃথিবী জয় করতে পারে, যেমন করেছে ইংরেজি ভাষাভাষীরা। অথচ স্প্যানিশ বা চীনা ভাষাভাষীরা তা করতে সক্ষম হয়নি। কারণ ইংরেজ ভাষাভাষীদের বাহুবলের সঙ্গে তাদের মুখের ভাষার শক্তি-সামর্থ্য তাদের বিজয়ী করেছে। পৃথিবীর কোনও ভাষারই কোনও রূপ নেই। যেহেতু প্রতিটি ভাষারই উদ্ভব ও বিবর্তনের ইতিহাস রয়েছে সুতরাং স্থান-কাল-পাত্রভেদে একই ভাষা বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। অর্থাৎ ভাষা বহুরূপী। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময় যে-কোনও ভাষার কয়েকটি আঞ্চলিক ও একটি প্রমিত রূপ বিদ্যমান থাকে, বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও যা প্রযোজ্য।

রফিকুল ইসলাম : শিক্ষাবিদ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে