আমরা তোমাদের ভুলব না

  শান্তা মারিয়া

১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ০১:৪৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

বধ্যভূমি। এখানে পড়ে আছে অসংখ্য শবদেহ। হাত বাঁধা, চোখ বাঁধা, হৃৎপি- উপড়ে নেওয়া, চোখ তুলে নেওয়া, সীমাহীন নির্যাতনের চিহ্ন দেহ নিয়ে জল-কাদাময় বাংলার মাটির ওপর ঘুমিয়ে আছেন এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা। তারা ছিলেন জাতির পথপ্রদর্শক। শিক্ষক, চিকিৎসক, দার্শনিক, কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সুরকার, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবকÑ তারাই প্রতিনিধিত্ব করতেন জাতির মননশীলতার। বাঙালি জাতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য, মেধাশূন্য করে দেওয়ার জন্য হিংস্র আক্রোশে তাদের হত্যা করে পাকিস্তানি সেনা এবং এদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও জামায়াতে ইসলামীর খুনি-জল্লাদরা। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ। ১৯৭১ সালে জাতি হারায় তার শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের। এই বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে জনগণকে অনুপ্রাণিত করার প্রধান কারিগর।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে বাংলার বেসামরিক নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা। ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা শুরু হয়। এ সময় পাকিস্তানি সেনাদের একটি প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। মধুর ক্যান্টিন, ছাত্রাবাস, কর্মচারী ও শিক্ষকদের বাসভবনে চলে ব্যাপক হত্যাকা-। মূলত সেই সময় থেকেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকা- শুরু হয়। পাকিস্তানি সেনারা রীতিমতো টার্গেট করেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। প্রথম পর্যায়ে এই হত্যাকা-ের শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা প্রমুখ। অপারেশন সার্চলাইটের সঙ্গে একসঙ্গেই বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। তার পর মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ধরে বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হতে থাকে। রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, সুরকার আলতাফ মাহমুদ, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা, সমাজসেবক নতুনচন্দ্র সিংহসহ অনেক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। তবে ডিসেম্বরে যখন নিশ্চিত পরাজয় টের পায় পাকিস্তানিরা, তখনই ব্যাপক হারে শুরু হয় বুদ্ধিজীবী হত্যা। ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত হত্যাকা- চলে। ১৪ ডিসেম্বরকে প্রতীকীভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে স্মরণ করা হয়। এই সময়ের মধ্যে দুশর বেশি বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। এ সময় শহীদ হন মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সেলিনা পারভীন, সিরাজুদ্দীন হোসেন, নিজামুদ্দীন আহমেদ, আলীম চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, শহীদুল্লাহ কায়সার, আব্দুল আলীম চৌধুরী, মোহাম্মদ মোর্তজা, এম মর্তুজা, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য প্রমুখ। সারা দেশে এক থেকে দুই হাজার বুদ্ধিজীবী যুদ্ধের সময় শহীদ হন। বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনা ছিল মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর। বিজয়ের পর বঙ্গভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে তার নিজের হাতে লেখা একটি ডায়েরি খুঁজে পাওয়া যায়। সেই ডায়েরিতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকা পাওয়া যায়। ডায়েরি থেকে আরও জানা যায় যে, ঘাতক আলবদরদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থাও এই কুচক্রীই করেছিল।
১২ ডিসেম্বর রাতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলীর সভাপতিত্বে আলবদর, আলশামসের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে বুদ্ধিজীবীদের চূড়ান্ত তালিকা আলবদর, আলশামসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ঘাতকরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যায়। বিভিন্ন নির্যাতন কেন্দ্রে তাদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালানোর পর রায়েরবাজার, কাঁটাসুর, বসিলা, মিরপুরসহ বিভিন্ন বধ্যভূমিতে তাদের মৃতদেহ ফেলে দেওয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বরের পর অনেকের মৃতদেহ পাওয়া যায়। অনেকের দেহ আর কোনো দিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই জঘন্য হত্যাকা-ের প্রধান ঘাতক ছিল বদর বাহিনীর চৌধুরী মঈনুদ্দীন (অপারেশন ইনচার্জ) ও আশরাফুজ্জামান খান (প্রধান জল্লাদ)। বিজয়ের পর আশরাফুজ্জামানের নাখালপাড়ার বাড়ি থেকে তার ব্যক্তিগত ডায়েরি উদ্ধার করা হয়। যেখানে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকা ও তাদের বাড়ির ঠিকানা লিপিবদ্ধ ছিল। তার গাড়িচালকের সাক্ষ্যেও ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। আবদুল কাদের মোল্লা, ফজলুল কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরীসহ আরও অনেক কুখ্যাত ঘাতক দালালের নাম পাওয়া যায়। চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান শহীদ হন দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে। সেই সময় মিরপুরে বিহারি ও পাকিস্তানপন্থিদের একটি ঘাঁটি ছিল। সেখানে মুখোমুখি সংঘর্ষ ও অভিযানে শহীদ হন জহির রায়হান।
ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকা- হলো বুদ্ধিজীবী হত্যা। আমাদের লাল-সবুজ পতাকায় মিশে আছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পবিত্র রক্ত।   

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে