মাননীয় আইজিপিকে ধন্যবাদ

  ড. বদিউল আলম মজুমদার

১১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:১১ | প্রিন্ট সংস্করণ

ড. বদিউল আলম মজুমদার

১১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:১১ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাননীয় পুলিশপ্রধান মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক পুলিশ সপ্তাহ-২০১৮ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ২০১৩ সাল থেকে আমাদের দেশের অপরাধ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তার দায়িত্ব পালনকালে অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে, যদিও এ নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ মহাপরিদর্শক হিসেবে কিছু ব্যর্থতার কথাও তিনি তুলে ধরেন। মাদক নিধন ও জঙ্গি দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপারগতার কথা তিনি অকপটে স্বীকার করেন। আমাদের দেশে সরকারের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের ব্যর্থতা স্বীকার করার সংস্কৃতি অনুপস্থিত। তাই এ সংস্কৃতি ভেঙে নিজের এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপারগতা তুলে ধরার জন্য তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এই বাহিনীর কাজ হলো জনগণকে নিরাপত্তা সেবা প্রদান করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অপরাধ দমন করা, যাতে নাগরিকরা নিরাপদে জীবনযাপন ও কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এবং কোনো রকমের হয়রানির শিকার না হয়।

রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো নাগরিকদের কতকগুলো অধিকার নিশ্চিত করা। আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে, অনুচ্ছেদ ২৬ থেকে ৪৭-এ, নাগরিকদের কতকগুলো মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এসব অধিকারের মধ্যে জীবনের তথা বেঁচে থাকার অধিকার, চলাফেরার অধিকার, সমাবেশ করার অধিকার, গোপনীয়তার অধিকার, চিন্তা-বিবেক ও বাকস্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত। এসব অধিকার বলবৎ ও কার্যকর করার অন্যতম দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তাই মাননীয় আইজিপির নিজের এবং পুলিশের সফলতা ও ব্যর্থতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন নাগরিকদের এসব অধিকার নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখার দায়িত্ব পালনে তাদের সফলতা বা ব্যর্থতার আলোকে।

অনেকের ধারণা, বাংলাদেশে দিন দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এবং নাগরিক অধিকার হরণের প্রবণতাও ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। জঙ্গিবাদের মতো ভয়াবহ অবস্থা আমাদের ঘাড়ে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলছে। গুম ও খুনের মতো অপরাধের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। মাননীয় আইজিপি এসব বিষয়ে কিছু না বললেও, আমরা আনন্দিত যে জঙ্গিবাদ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতার কথা তিনি স্বীকার করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতার অনেক কারণ রয়েছে। এসব কারণের অন্যতম দুটি হলো শর্ষের মধ্যে ভূতের উপস্থিতি তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যদের মধ্যেই অপরাধপ্রবণতা। আর অন্যটি হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ।

আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে অনেক সৎ ও মেধাবী ব্যক্তি রয়েছেন। অনেকেই নির্মোহভাবে জনগণকে সেবা প্রদানে নিবেদিত। এর পাশাপাশি অনেকেই আছেন যারা বিভিন্নরকম অপরাধ কর্মকা-ে লিপ্ত এবং নানা অপরাধমূলক কাজের আশ্রয়দাতা। আবার অনেকে সুযোগ পেলেই নাগরিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি ও জিম্মি করছেন।

উন্নত বিশ্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সব বিপদ-আপদে নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে মনে করা হয়। আমাদের যাদের বিদেশে বসবাস করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেখানে পরিবারের সদস্যরা কোনোরূপ সমস্যায় পড়লে আমরা তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হতে বলতাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে অনেক নাগরিক এমনকি চরম বিপদেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে দূরে থাকতে নিরাপদ বোধ করেন। এর কারণ হলো অনেকেই মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হলে নিরাপদ থাকার পরিবর্তে তারা হয়রানির শিকার হতে পারেন। বাংলাদেশে খুব কম লোকই আছেন যারা নিজেরা কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কেউ না কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হননি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী মানেই হয়রানিÑ এমন ধারণা আজ অনেক নাগরিকের মধ্যেই বদ্ধমূল হয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক হারে ঘুষ-দুর্নীতি ও অপরাধ প্রবণতার বিস্তার। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা দূর করতে হলে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে জনগণের মধ্যে বিরাজমান এই বদ্ধমূল ধারণার পরিবর্তন করতে হবে। তা হলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জনগণের বন্ধুতে পরিণত হবেন এবং তারা নাগরিকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাবেন। এর জন্য অবশ্য প্রয়োজন হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা এবং এই গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীকে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করা।

আর এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে দুর্নীতি দূর করা। এসব বাহিনীতে নিয়োগ ও বদলিতে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের কথা আমরা প্রতিনিয়ত শুনি। আমরা আরও শুনি এসব লেনদেনের ভাগ নাকি নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত অনেকেই পেয়ে থাকেন। আমাদের কিছু রাজনৈতিক নেতাও এর সঙ্গে জড়িত বলে অনেকের ধারণা। এমতাবস্থায় পুলিশ বাহিনীকে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন থেকে মুক্ত করা এবং এই বাহিনীতে নিয়োগ ও বদলির প্রক্রিয়াকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে জরুরি ভিত্তিতে মাননীয় আইজিপির নজর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশনেরও এদিকে দৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক। যেসব ব্যক্তিকে লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে নিয়োগ পেতে ও বদলি হতে হয় তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ও যথার্থ নিরাপত্তা সেবা আশা করা দুরাশা বৈ কিছুই নয়।

একই সঙ্গে সরকারকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। আমরা এসব বাহিনীর সদস্যদের নিম্নমানের আবাসন, অবসরের অপ্রতুলতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাবের কথা প্রতিনিয়ত শুনি। এসব সমস্যারও জরুরি ভিত্তিতে বিহিত হওয়া দরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সুযোগ সৃষ্টি না হলে আমরা তাদের কাছ থেকে দুর্নীতিমুক্ত ও যথাযথ সেবা আশা করতে পারি না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরেকটি বড় সমস্যা হলো এর দলীয়করণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, দলীয় নয়। এর কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থে, কোনো দল বা ব্যক্তির স্বার্থে নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দলীয়করণের সমস্যা আমাদের দেশে দিন দিন প্রকট হচ্ছে। একের পর এক সরকার গর্হিত এই কাজটি করে যাচ্ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বর্তমানে অনেকটাই দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সরকার তাদের বিভিন্ন রকমের অন্যায় ও অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত করে। যেহেতু অপরাধমূলক কর্মকা- করে পার পেয়ে যাওয়া যায়, তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অনেকেও ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে অনেক অন্যায় কর্মকা- করে থাকে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো জরুরি। আর এ জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে দলীয়করণের অবসান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক দুর্নীতির ফলে আমরা নাগরিকরা শুধু প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সেবা থেকে বঞ্চিত ও হয়রানির শিকারই হচ্ছি না, আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও আজ চরমভাবে হুমকির মুখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে ক্ষমতাসীনরা বিভিন্নভাবে নির্বাচনী ফলাফলকে নিজেদের স্বার্র্থে প্রভাবিত করে আসছে। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। আর এ জন্য প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আমূল সংস্কার এবং তাদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অবসান।

আশা করি, মাননীয় আইজিপি এবং সরকার এদিকে মনোনিবেশ করবেন। কতকগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরিচ্ছন্ন, যুগোপযোগী ও সত্যিকার অর্থেই দলীয়করণমুক্ত একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবেন। এর মাধ্যমে তাদের নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের নিরসন করাও সম্ভব হবে।

একটি কথা সত্য যে, মাদকের সমস্যা ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনগণের আস্থা অর্র্জন করতে হবে। তা হলেই জনগণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে দূরে না থেকে তাদের সহায়তা করতে এগিয়ে আসবে। আর এ ধরনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও জনপ্রতিরোধ ছাড়া এসব ভয়াবহ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া জঙ্গিবাদ দমনের জন্য আমাদের বিদ্যমান কৌশলেরও পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমানে বলপ্রয়োগই জঙ্গিবাদ নির্মূলের একমাত্র কৌশল বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়। এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রোগের চিকিৎসা না করে বহুলাংশে রোগের উপসর্গ নিয়েই ব্যস্ত থাকছে বলে অনেকের ধারণা। তাই জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে হলে এর মূল কারণ উদঘাটন করতে হবে এবং একটি সুচিন্তিত কৌশল অবলম্বন করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকে আস্থায় নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন হবে একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য সৃষ্টি করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বিরত রাখা।

য় ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে