ছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে ঢাবিতে বিক্ষোভ, প্রক্টর অবরুদ্ধ

  বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ০১:০৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা ও নিপীড়নের প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে দিনভর বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের বহিষ্কারের দাবিতে প্রক্টরকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। পরে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এ সময় উপাচার্য আন্দোলনকারীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে তারা অবরোধ তুলে নেন।  
এর আগে গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের ব্যানারে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধনের আয়োজন করেন শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে প্রক্টর অফিসের সামনে যান। এ সময় কলাভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের গেট তালা মেরে দিলে সংক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা কলাপসিবল ভেঙে প্রক্টর অফিসে ঢুকে পড়েন। সেখানে আন্দোলনকারীরা প্রক্টরকে ঘেরাও করে নিপীড়নের ঘটনার জবাব চান এবং জড়িতদের বহিষ্কার দাবি করেন।
আন্দোলনকারীরা জানতে চান, যখন ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে, তখন কোথায় ছিলেন প্রক্টর, অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সমন্বয়কারী মশিউর রহমান সাদিককে কেন পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হল এবং কেন মামলা ছাড়া তাকে আটকে রেখে নিখোঁজ নাটক করা হলো?
এ ছাড়া প্রক্টরের কাছে দেওয়া লিখিত দাবিতে তারা তিনটি বিষয় তুলে ধরেনÑ এক. আন্দোলনকারী নারী শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নকারী ছাত্রলীগ নেতাদের সাময়িক বহিষ্কার করতে হবে। দুই.  হামলার বিচারের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। তিন. ৪৮ কর্মঘণ্টার মধ্যে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট দিতে হবে এবং হামলাকারীদের স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে।
এ সময় প্রক্টর দাবির ব্যাপারে কোনো উত্তর না দিলে তার পদত্যাগের দাবি ওঠে আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে। একপর্যায়ে প্রক্টর শিক্ষার্থীদের থেকে আধাঘণ্টা সময় চাইলে তাকে তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, এমন শর্তে প্রক্টরের কক্ষে যেতে দেওয়া হয়।  সেই সময় প্রক্টর অফিসের বারান্দায় বসে শিক্ষার্থীরা বঙ্গবন্ধু হলের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমীন রহমান, মুহসীন হলের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানী ও জহুরুল হক হলের সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান, যৌন নিপীড়নে ইন্ধন দেওয়ার রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সভাপতি লিপি আক্তার, ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের সভাপতি বেনজীর হোসেন নিশি, কুয়েত মৈত্রী হলের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণীর স্থায়ী বহিষ্কার চেয়ে স্লোগান দিতে থাকেন।
আধাঘণ্টা পর প্রক্টর বেরিয়ে এলেও আবার আগের মতো নিরুত্তর থাকেন তিনি। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তাকে তার মতামত চেয়ে পর পর প্রশ্ন করতে থাকলেও তিনি এড়িয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি জানান, তাকে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হোক। তিনি বসে সমস্যার সমাধান করবেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা জানান, তারাও যাবেন ভিসির কাছে এবং সংবাদকর্মীদেরও সঙ্গে নিতে হবে। তখন প্রক্টর এ পরিকল্পনা নিয়ে কথা না বলে আবার চুপ হয়ে যান।
একপর্যায়ে কিছু শিক্ষার্থী ক্ষিপ্ত হয়ে গেলে প্রক্টর তাদের দেখে নেওয়ার হুমকিও দিয়ে বসেন। সঙ্গে সঙ্গে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া শুরু হলে প্রক্টর ব্যাপারটিকে ধামাচাপা দিয়ে তাদের দাবি পূর্ণ করবেন বলে আশ্বাস দেন। তিনি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন বলেও জানান।
কিন্তু শিক্ষার্থীরা কিছুতেই মেনে নিচ্ছিল না এ আশ্বাস। তারা সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাসকে বাতিল করেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে উম্মে হাবিবা বেনজীর প্রক্টরকে জানান, আমাদের তদন্ত কমিটির দরকার নেই। কারণ আমাদের কাছে হামলাকারী কারা এ নিয়ে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। আপনি শুধু তাদের বহিষ্কার করবেন কিনা বলুন।
তবে এ ব্যাপারে আবার মৌন হয়ে যান প্রক্টর। এ মৌনতা দেখে শিক্ষার্থীরা তার পদত্যাগ চেয়ে স্লোগান দিতে থাকেন।
এর কিছুক্ষণ পর প্রক্টর আবার উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করার কথা বললে শিক্ষার্থীরাও তাকে নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে উপাচার্য অফিসে পৌঁছেন। সেখানে আধাঘণ্টা পর উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান এসে পৌঁছেন। তখন শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে মাসুদ আল মেহেদী তাদের দাবিগুলো পুনরায় লিখিতভাবে উপাচার্যকে হস্তান্তর করেন এবং পড়ে শোনান।
এর পর উপাচার্য তাদের আশ্বাস দেন দাবি পূরণের। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আবার হইচই শুরু করলে এবং সুনির্দিষ্ট বক্তব্য চাইলে শেষ পর্যন্ত উপাচার্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং সুনির্দিষ্ট উপায়ে তাদের দাবি পূরণের অঙ্গীকার করেন।
ছাত্রদলের নিন্দা
এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। ঢাবি ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক ইন্তেসাম ইজাজ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে এ নিন্দা জানানো হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত পৃথক এক বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশের মানুষ এ দেশের বিবেক মনে করেন। বাংলাদেশের বিবেক এখন সরকারি দলের সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের লাঠির আঘাতে আহত। দেশের বিবেক আজ ছাত্রলীগের পায়ের নিচে পিষ্ট। জাতির বিবেক আজ ছাত্রলীগ দ্বারা ছাত্রীদের শ্লীলতাহানির অপমানে অপমানিত। তারা চান এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণে রেখে তাদের অবৈধ কার্যক্রম জারি রাখতে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে চলমান আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল একাত্মতা ঘোষণা করছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে