প্রশ্নফাঁস, হাঁসফাঁস

নৃ বচন

  ড. জোবাইদা নাসরীন

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০১:২০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অনেক হাঁকডাক দেওয়ার পরও প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে পারছে না সরকার।

প্রশ্নফাঁস এখন সরকারের জন্য গলায় ফাঁসের মতো হয়ে গেছে। পাসের হারকে রেকর্ড পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া খোদ শিক্ষামন্ত্রীও এখন কিছুটা বিপদে আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল থেকে শুরু করে প্রাথমিক পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হচ্ছে। এই প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর চেষ্টা হিসেবে সরকার কোচিং সেন্টার বন্ধ করেছে, পরীক্ষার্থীদের আধা ঘণ্টা আগে হলে আসতে বাধ্য করেছে, ফেসবুক বন্ধ করার কথা বলেছে, কিন্তু কোনো ধরনের পরিবর্তন হয়নি। বরং

প্রশ্নফাঁস এখন রুটিনমাফিক বিষয় হয়ে পড়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে চলমান এসএসসি পরীক্ষার সাতটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে আরও বেশি কঠোর হয় সরকার। পরীক্ষাকেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে মোবাইল ফোনও নিষিদ্ধ করে। ওই এলাকার মধ্যে কারো হাতে মোবাইল পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু আসল কাজ হয় না?এর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিলে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়াসহ আরও বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতেও প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা যায়নি। বরং ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই পরীক্ষার সাতটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আরও বিপদে ফেলে। একদিকে শিক্ষায় সফলতার জন্য শিক্ষামন্ত্রী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রশ্নফাঁসের কারণে দেশে তার পদত্যাগের দাবি উঠছে, আর এর মধ্য দিয়েই হাঁটছে শিক্ষার্থীরা।

প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরুর পর থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুঞ্জন ওঠে। বলা হচ্ছে, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র দিয়েই পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। অবশ্য সত্যতাও পাওয়া যাচ্ছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। প্রশাসনিক দুর্বল নজরদারির কারণে প্রশ্ন ফাঁস করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সিন্ডিকেটচক্র। কালেভদ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের হাতে কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও সিন্ডিকেটের মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে বরাবরই অন্ধকারে। এই সিন্ডিকেটে অসাধু কিছু শিক্ষার্থী, বিজি প্রেসের কর্মচারী এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রশ্নফাঁসের ঘটনা বিভিন্ন সময়ে মৌসুমি আকারে থাকলেও ২০১২ সাল থেকে ব্যাপক আকারে প্রশ্নফাঁস শুরু হয়। তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই তা অস্বীকার করে আসছে। প্রশ্নফাঁস এক ধরনের অপপ্রচার, একটি গোষ্ঠী সরকারকে বিব্রত করতেই এটি প্রচার করছে, পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নের মিল তেমনভাবে পাওয়া যায়নি... এগুলোই ছিল তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বোর্ড কর্মকর্তাদের বক্তব্য। কিন্তু এই অস্বীকার করার প্রবণতায় প্রশ্নফাঁস আজ মহামারী আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছে সবাই। কারণ এই অস্বীকৃতি একভাবে প্রশ্নফাঁসকারীদেরই উসকে দিয়েছে অপরাধ চলমান রাখতে এবং অন্যদিকে শিক্ষার মতো একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আজ এই ভঙ্গুর অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে। এর বাইরে শিক্ষামন্ত্রীও বারকয়েক বলেছেন, এ দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসেরও নাকি দীর্ঘ ইতিহাস আছে, কোন কোন বছর এবং কার কার সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে তার একটি দীর্ঘ বর্ণনাও তিনি দিয়েছেন। এগুলো আসলে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের উৎসাহ আরও বহুগুণ বাড়িয়েছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় যেখান থেকে ছাপা হয় সেই বিজি প্রেস অথবা যারা এর বিতরণের দায়িত্বে থাকেন, সেই মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা বোর্ডের লোকজনের কাছ থেকে। তারা বলছেন, প্রশ্নফাঁস বন্ধে পুরনো পরীক্ষা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুনভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন। গতানুগতিক পদ্ধতি অবলম্বন করে পাবলিক পরীক্ষা চলতে থাকলে প্রশ্নফাঁস থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। এই শিক্ষা পদ্ধতি চলমান রেখে শুধু প্রশ্নফাঁস বন্ধের দিকে দৌড়ালেই হবে না, প্রশ্নফাঁসের উপলক্ষ আছে যে প্রক্রিয়ার মধ্যে তার দিকে নজর দেওয়া এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তবে অনেক দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছে সরকার, নিয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে পর্যায়ক্রমে এমসিকিউ (বহুনির্বাচনী প্রশ্ন) তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল আগ্রহ আসলে শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যেই নিহিত ছিল এবং এখনো আছে। এমসিকিউ পদ্ধতির কারণে শুধু প্রশ্নপত্রই নয়, এর সঙ্গে উত্তরপত্রও বিক্রি হয় চড়া দামে। প্রশ্ন হাতে পেলেই লোকজন সহজেই উত্তর রেডি করতে পারছে, তুলে দিচ্ছে ফেসবুক কিংবা অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যমে। কিন্তু যদি প্রশ্নটির ধরন অন্যরকম হতো, বিশ্লেষণাত্মক কিংবা ব্যাখ্যাভিত্তিক প্রশ্ন হতো তা হলে পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টা আগে প্রশ্ন ফাঁস হলেও ক্ষতি হয়তো এই পর্যায়ে হতো না। কারণ সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা কিংবা তৈরি করা এবং সেটি মুখস্থ করে লিখা কোনোভাবেই এক ঘণ্টায় সম্ভব হতো না। তবে পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯৯২ সাল। এই সালেই প্রথমবারের মতো এ দেশে অবজেকটিভ প্রশ্নের সূচনা ঘটে। ৫০ মার্কস থাকবে অবজেকটিভে এবং বাকি ৫০ থাকবে সাবজেকটিভে। এর আগ পর্যন্ত এসএসসিতে প্রথম বিভাগ পাওয়াই অনেক কঠিন ছিল এবং পড়াশোনার মানও যথেষ্ট ভালো ছিলÑ এ কথা দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়। তবে এর পর থেকেই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল হয়ে পড়েছিল শিক্ষার মানের চেয়ে পাসের গোলা ভরানো। এর পর থেকেই মূলত শিক্ষাব্যবস্থা নাজুক অবস্থায় যেত শুরু করে। এর পরও এমসিকিউর পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেয় সরকার। তার মধ্যে একটি ছিল অঙ্ক না হলেও আংশিক নম্বরের সিদ্ধান্ত। আমরা ছোটবেলা থেকেই পরীক্ষা দিয়ে এসেছিলাম যে, অঙ্ক হলে পুরো নম্বর না হলে শূন্য পায়, যে কারণে অঙ্কে ফেল করত অনেক বেশি। কিন্তু বছরপাঁচেক আগ থেকেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুলশিক্ষকদের নির্দেশ দিয়েছেন, অঙ্ক পরিপূর্ণ না হলেও যে কটি লাইন লিখবে সেটি গুনে নম্বর দিতে হবে, জানি না কীভাবে অঙ্কের মতো বিষয়ে লাইন গুনে নম্বর দেওয়া যায়? আর এ কারণেই অঙ্কে ফেলের সংখ্যা অনেক কমে গেল।

এই পাসের গোলা ভরানোর পলিসিতে কয়েক বছর ধরে পাসের হার বেড়ে গেল, দেশে আপাত শিক্ষিত জনসংখ্যার হার বেশ কিছুটা এগিয়ে গেল কিন্তু আমরা কী ধরনের শিক্ষার্থী তৈরি করছি সেটি নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। প্রতিবছর বিভিন্ন সময়ে হাজার হাজার গোল্ডেন ফাইভ পাওয়া ছেলেমেয়ের উচ্ছ্বসিত ছবি পত্রিকায় দেখি, তার সঙ্গে খবরও পাই এই গোল্ডেন জিপিএ পায়নি বলে আত্মহত্যা করছে এই ছাত্রছাত্রীদের কেউ কেউ। গোল্ডেন ক্রেজে ভোগা শুরু হয় দশ বছর আগে থেকে, কারণ এখন পঞ্চম শ্রেণিতেও যে আছে পিইসি পরীক্ষা। গোল্ডেন ফাইভ পাওয়া-না পাওয়া এখন অনেকটা ‘স্ট্যাটাস’ রক্ষার বিষয় হয়ে গেছে।

এই পিইসি, জেএসসি, এসএসসি আর এইচএইসসি পাস করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে তখন আমরা এদের পাই শিক্ষার্থী হিসেবে। অন্য অনুষদের কথা জানি না, তবে আমরা যেসব শিক্ষার্থী পাই তার মধ্যে বেশিরভাগ বাংলা ভাষায়ই ভালো করে লিখতে পারে না। এর কারণ খুব বেশি লেখার অভ্যাস তাদের নেই। অ্যাসাইনমেন্টের বেশিরভাগই আসে বিভিন্ন সোর্স থেকে কপি পেস্ট করা। কারণ খেটে পড়াশোনা করার অভ্যাস আমরা নষ্ট করে ফেলেছি বহু আগেই। এটা ওদের দোষ নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাদের এমন বানিয়েছে এবং এরা সেই গুটিকয়েক মেধাবী শিক্ষার্থীর অংশ যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে স্থান পেয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পদ্ধতিও এখন এমসিকিউর মাধ্যমেই হয় এবং ‘নিরপেক্ষ’তাকে গুরুত্ব দিতে কম্পিটারের মাধ্যমে নম্বর ঠিক করার ধরনটিও আমি মনে করি ত্রুটিপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনা কিংবা বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে যাচাই করা যায় না।

সরকার যদি বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি থেকে সরে এসে নতুন করে এমসিকিউর পরিবর্তে বিশ্লেষণধর্মী পদ্ধতিতে ফিরে আসে এবং পাসের হার দিয়ে গোলা ভরানোর কথা বাদ দিয়ে শুধু মানবিক এবং সৃজনশীল শিক্ষার্থী তৈরি করার চিন্তা গ্রহণ করে তবেই আমরা প্রশ্নফাঁস রোধ করতে পারব।

ড. জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

zobaidanasreen@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে