জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনে সরকারের সাফল্য

মিল্টন বিশ্বাস

১২ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:৩১ | প্রিন্ট সংস্করণ

১২ জানুয়ারি ২০১৭ বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের তিন বছর পূর্ণ হলো। সাফল্যের অনেক সূচকের মধ্যে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমনে তাদের অনুসৃত পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে জামায়াত-বিএনপির সন্ত্রাস দমন করে আওয়ামী লীগ সরকার দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এনেছে। তার পর ২০১৬ সালের ১ জুলাই জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যদের দ্বারা হলি আর্টিজানের নির্মম হত্যাকা- বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিলেও সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশের মধ্য থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের শেকড় উৎপাটন করা সম্ভব হয়েছে। একই বছর দেশের কয়েকটি স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলার অবসানকল্পে দোষী ব্যক্তিদের বিচারের সম্মুখীন করা হয়। সরকারের সদিচ্ছা দেশের মানুষকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ওপর আস্থাশীল করে তুলেছে। তৈরি হয়েছে মধ্যম আয়ের দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি।

গত মহাজোট সরকারের আমলে ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধধর্মীয় পুরোহিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, ভিন্নমতের ইসলামি ভাবধারার অনুসারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও বিদেশিদের ওপর একের পর এক চাপাতি, গুলি ও ধারালো অস্ত্রের হামলা বর্তমান সরকার তথা শেখ হাসিনার জঙ্গিবাদ দমনের অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিল। গত বছর ২০ মে পুনরায় চাপাতির আঘাতে খুন হন কুষ্টিয়ার হোমিও চিকিৎসক মীর সানাউর রহমান। আহত হন তার বন্ধু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুজ্জামান। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হত্যার এই ‘চক্র’ ভাঙার আহ্বান জানিয়ে সরকারের উদ্দেশে ইউরোপীয় মিশনগুলোর প্রধানরা ওই বছর ২২ মে বলেন, এই ধরনের হামলা চলতে থাকলে তা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে পারে। এসব হামলা মানবাধিকার, বাক-স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতি ‘নজিরবিহীন হুমকি’ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন তারা। আর এ ধরনের ঘটনা মুক্ত, সহনশীল এবং স্থিতিশীল ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের পরিচয় মুছে দিতে পারে।

এসব হামলার অনেকগুলোয় দায় স্বীকার করে আইএস ও আল কায়েদার নামে বার্তা এলেও সরকার বলছে, অভ্যন্তরীণ জঙ্গিরাই এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের মতে, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ‘ক্ষুণœ’ এবং সরকারকে সমস্যায় ফেলতে জামায়াতে ইসলামী ও এর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এসব হত্যাকা- ঘটাচ্ছে। ২০১৩ সালে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার খুনের পর থেকে টাঙ্গাইলে হিন্দু দর্জি নিখিল জোয়ারদার হত্যাকা- পর্যন্ত ৩৭টি হামলার মধ্যে ২৫টি জেএমবি, আটটি আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও চারটি ঘটনা অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠী ঘটিয়েছে। অর্থাৎ জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠী যেমন জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি), আনসার আল-ইসলাম, আনসারল্লাহ বাংলা টিম, হরকাতুল-জিহাদ-আল-ইসলাম (হুজি-বি), হিজবুত তাহরির বাংলাদেশ এবং নতুন আবির্ভূত আল মুজাহিদ প্রভৃতি এসব হত্যাকা-ে জড়িত। হামলা ও হত্যাকা-ের মধ্যে ৩৪টিরই মূল রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে বলে দাবি করেন পুলিশপ্রধান। এর মধ্যে মাত্র ছয়টিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

১ জুলাই (২০১৬) হলি আর্টিজানের হত্যাকা-ের আগে সংঘটিত কুষ্টিয়ার হত্যাকা-ের ধরনের সঙ্গে ২০১৩ সাল থেকে ঘটে যাওয়া হত্যাকা-গুলোর মিল রয়েছে। যারা এসবের শিকারে পরিণত হচ্ছেন, তাদের মধ্যেও বৃহত্তর পরিসরে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। তারা হয় ভিন্ন ধর্মের, ভিন্ন মতাদর্শের বা ভাবধারার অথবা জীবনযাপনের ক্ষেত্রে রয়েছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অথবা সাংস্কৃতিকভাবে সক্রিয়। ফলে এটা ধরে নেওয়া খুবই সঙ্গত যে, পরিকল্পিতভাবেই এসব ঘটনা ঘটছে এবং এসবের পেছনে সংগঠিত শক্তি রয়েছে। আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত তরুণ প্রজন্মের অনেকেই আজ জঙ্গিবাদী নাগিনীর দংশনে ক্ষতবিক্ষত। খুন করা হয়েছে ৩৭ জনকে, খুনের হুমকি রয়েছে শতাধিক মানুষের মাথার ওপর। ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৫ জন ব্লগারকে তাদের লেখালেখির কারণে হত্যা করা হলেও ওই মামলাগুলোর খুব বেশি অগ্রগতি নেই। আহমেদ রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায় ও ওয়াসিকুর রহমান এবং অনন্ত বিজয় দাশ ও নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় এবং জুলহাজ তনয় অথবা নাজিমের জন্য আমরা এ পর্যন্ত কিছুই করতে পারিনি। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর নিষ্ঠুরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা। খুন করেছে আজিজ সুপারের জাগৃতি প্রকাশনীর তরুণ প্রকাশক দীপনকে। অন্যদিকে ব্লগারদের মতো একই কায়দায় একইদিন হামলার শিকার হয়েছেন অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শুদ্ধস্বরের কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল। টুটুলের সঙ্গে আহত হয়েছেন ব্লগার তারেক রহিম ও রণদীপম বসু। ফেব্রুয়ারিতে (২০১৫) অভিজিৎ নিহত হওয়ার পর ফেসবুকে হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়ে টুটুল মোহাম্মদপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। উল্লেখ্য, বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়ের ‘অবিশ্বাসের দর্শন’সহ কয়েকটি বই বের করেছে শুদ্ধস্বর। অভিজিৎ খুনে যেমন ৪-৫ জনের দল পরিকল্পিতভাবে কাজ করেছিল, ঠিক একইভাবে এই হামলাকারীরা ছিল পাঁচজন। তারা ঢুকেই বলেছিল, ‘আমরা টুটুলকে মারতে এসেছি।’ অফিসে ঢুকে কুপিয়ে তালা মেরে চলে গেছে তারা। এসব ক্ষেত্রে নিহতদের দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা হয়েছে। প্রত্যেককেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। প্রত্যেকটি ঘটনার পরই ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনের নামে দায় স্বীকার করা হয়েছে।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদের ওপর জঙ্গিদের চাপাতি হামলার পর রাজীব হায়দারকে চাপাতির আঘাতে খুন করা হয় ২০১৩ সালে। ব্লগে লেখালেখির কারণে বাংলাদেশে প্রথম কোনো হত্যাকা- এটি। মুক্তমনা নামে ব্লগ সাইটের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কেও গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি সস্ত্রীক বাংলা একাডেমির বইমেলা দেখে ফেরার পথে চাপাতির আঘাতে প্রাণ হারান। তার স্ত্রী রাফিদা বন্যা আহমেদও মারাত্মক আহত হন। অভিজিৎ রায়কে হত্যার এক মাসেরও কম সময়ের মাথায় ৩০ মার্চ ব্লগার ওয়াসিকুর রহমানকে ঢাকার তেজগাঁও এলাকার একটি সড়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে হত্যা করা হয় গত ১২ মে, সিলেটে। ঢাকার বাইরে এটাই একমাত্র ব্লগার হত্যাকা-ের ঘটনা। অনন্ত বাসা থেকে বের হয়ে একটি ব্যাংকে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হন। তিনি মুক্তমনা ব্লগে লিখতেন এবং সিলেট থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞানবিষয়ক একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। গত ৭ অগাস্ট দুপুরে রাজধানীতে বাড়িতে ঢুকে হত্যা করা হয় ব্লগার নীলকে। ২৫ এপ্রিল (২০১৬) সমকামী মানবাধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান এবং তার বন্ধু মাহবুব রাব্বি তনয়কে ঢাকার কলাবাগানের এক বাসায় কুপিয়ে হত্যা করে অজ্ঞাতনামা একদল লোক। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সিলেটের গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদকে কুপিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। অন্যদিকে ২৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তারও আগে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা এবং ‘ঝুঁকি’তে থাকা সব নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার সরকারের আছে।

যে কোনো জনসভা এবং বৈঠকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি নির্মম সত্য কথা উচ্চারণ করে জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘জঙ্গিবাদের উত্থান বিএনপি-জামায়াতের কারণে।’ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ একই কথা একটু অন্যভাবে বলেন। যেমন, ২০১৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতি থাকলে, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হলে, বাংলাদেশ জঙ্গিবাদমুক্ত থাকলেÑ আমরা স্বস্তি পাই। কারণ সে পরিবেশে জঙ্গি বা সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশে অবস্থান নিয়ে ভারতে কিংবা আশপাশের দেশে নাশকতা চালানোর সুযোগ পায় না।’ বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে জঙ্গি এবং সন্ত্রাসবাদ নির্মূল হয়েছে এবং বাংলাদেশের আপামর মানুষ এখন জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার বলে মত দিয়েছিলেন মনমোহন সিং। কেবল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নন, বিশ্বের অনেক শীর্ষ নেতা একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করেন জঙ্গিমুক্ত বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। কারণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় আবহমান বাংলা সব সময়ই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর ছিল। এই সেদিন পর্যন্ত অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকা-ের আগেও এ দেশে জঙ্গিবাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর শাসনকালোত্তর টানা ২১ বছর সামরিক শাসকদের মদদে দেশের মধ্যে ধর্মীয় উগ্রবাদের জন্ম হয়। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ক্ষমতায় এলে পটভূমি পাল্টে যায়। মৌলবাদী গোষ্ঠী মাথা তুলে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়। তবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে জঙ্গিরা তৎকালীন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসীন হলে জঙ্গিরা গা ঢাকা দেয়। আত্মগোপনে থাকা এসব জঙ্গি ও জঙ্গি সংগঠন বর্তমান সরকারের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে আবারও মাথা তোলার চেষ্টা করছে। আর সংগঠনগুলোর সবই একই নেটওয়ার্কে অর্থাৎ হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি) কার্যক্রম অনুসরণ করে নাশকতার বিস্তৃত কর্মকা-ে লিপ্ত হয়েছে।

১৯৯২ সালে আফগান ফেরত মুজাহিদদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম শুরু হয়। তাদের অনুসৃত পথে এখন শতাধিক জঙ্গি সংগঠন রয়েছে দেশে। নেতৃত্বে আছে আফগান ফেরত মুজাহিদদের কেউ না কেউ। বরগুনা থেকে ২০১৩ সালের ১২ আগস্ট গ্রেপ্তারকৃত ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’-এর সদস্যরা সংগঠিত হচ্ছিল হুজির সাবেক নেতা ও ফাঁসিতে মৃত্যুবরণকারী শায়খ আবদুর রহমানের আদর্শে। মূলত হুজির পূর্বসূরিদের ‘সশস্ত্র বিপ্লব’-এর মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের ‘অসম্পন্ন’ কাজ সম্পন্ন করতে নেমেছে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায় জঙ্গিদের কার্যক্রম প্রায় কঠিন হয়ে পড়েছে। এ জন্য বিভিন্ন সময়ে নাশকতার সৃষ্টি করে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করছে তারা। তারা হেফাজতের সঙ্গে মিশেও সরকার উৎখাতের চেষ্টা করেছিল; ব্যর্থ হয়ে নিজেরা নাশকতার ছক তৈরি করছে দেশজুড়ে। উল্লেখ্য, আফগান ফেরত কয়েক হাজার মুজাহিদ আলাদা সংগঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে তালেবানি রাষ্ট্র বানানোর কার্যক্রমে জড়িত রয়েছে। হুজি, জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ ও আনসারুল্লাহর নীতি ও আদর্শ একই।

শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসীন হয়ে গত আট বছরে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়েছে। এ সময় সরকার ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং বামপন্থি সর্বহারাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছে। কিন্তু ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ শুরু হলে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির দেশে অরাজকতা ও নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করে। এ পরিস্থিতিতে ১৪ নভেম্বর ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করা হবে। যত বাধা ও হামলা আসবে তত দ্রুত নিষ্পন্ন হতে থাকবে মামলা এবং একে একে রায় ঘোষিত হবে। সে বছরই ২৫ নভেম্বর রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানানো হয়। ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় আসীন হলে এসব অপরাধীকে যে মুক্তি দেওয়া হতে পারে সে সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়। কারণ অপরাধীদের ফাঁসির রায় ঘোষিত হলেও তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখা যায়নি। উল্লেখ্য, বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুকেন্দ্রিক আন্দোলনের সুযোগে জঙ্গিদের তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১২ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল হলে বিএনপি দেশব্যাপী হরতাল-অবরোধের ডাক দেয়। ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলের আন্দোলনের নামে সহিংসতায় মারা যায় ২০ জন, ৪০ জন পুলিশসহ আহত হন ২৯০ জন। ৭০টির মতো বোমা হামলা চালায় বিরোধী সমর্থকরা। পুলিশের ৫টিসহ গাড়ি পোড়ানো হয় ৫০টি। ভাঙচুর করা হয় আরও ১৫০টি। সরকার বিএনপির দাবিকে অযৌক্তিক হিসেবে চিহ্নিত করে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বারবারই বলে আসছিল। কারণ পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ ৬ হাজার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বর্তমান নির্বাচন কমিশন ৫ জানুয়ারি (২০১৪) জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে সক্ষম বলে তারা মনে করতেন। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে জঙ্গি দমনের বিষয়ে অভিন্ন মতামত প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সন্ত্রাস নির্মূলে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ‘বন্দিবিনিময় চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছে। উপরন্তু সীমান্তে সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারী ছাড়া কাউকে গুলি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ও উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ঢাকা থেকে ভারতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের প্রশংসা করা হয়েছে।

‘এ দেশের মাটিতে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালানো কঠিন’Ñ এ শিরোনামে সন্ত্রাস দমনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশের মাটিতে কাজ চালানো সন্ত্রাসীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক সন্ত্রাস নিয়ে ২০১৩ সালের ৩০ মে ওয়াশিংটনে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়। ২০১২ সালের পরিস্থিতি নিয়ে ‘কান্ট্রি রিপোর্টস অন টেররিজম ২০১২’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘সন্ত্রাস দমন আইন, ২০০৯’ পাস করে। সে আইনকে যুগোপযোগী করার প্রয়োজন দেখা দেয় বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী কর্মকা-ের ধরন দ্রুত পাল্টানোর ফলে। এ জন্য সন্ত্রাসী কর্মকা-ে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ (এপিজি) এবং ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) মানদ- অনুসরণ করতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এর পর ২০১২-এ এক দফা আইনটি সংশোধন করা হয়। কিন্তু তার পরও আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক মহল থেকে অনুরোধ আসে। এসব বিষয় যুক্ত করতেই সরকার আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ১১ জুন জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল-২০১৩ পাস হয়েছে। এ বিলের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইন্টারনেটভিত্তিক সন্ত্রাসী কর্মকা- প্রতিরোধে বাস্তবসম্মত ধারাগুলোর অন্তর্ভুক্তি। কোনো সন্ত্রাসী ব্যক্তি বা সংগঠন ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকা- করলে সাক্ষ্য আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, এ সংক্রান্ত তথ্যগুলো প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা যাবে। অন্যদিকে এ বিলে জঙ্গি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ধারা যুক্ত হয়েছে। আল কায়েদার সম্পদ বাজেয়াপ্ত, অস্ত্র বিক্রি ও ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা এবং জঙ্গিবাদে অর্থায়নে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নেওয়া দুটি প্রস্তাবও আইনে পরিণত করা হয়েছে।

আইন, বিচার ও নিবিড় নজরদারির জন্য বাংলাদেশে জঙ্গিরা সুবিধা করতে পারছে না। র‌্যাবের মিডিয়া উইং থেকে জানা গেছে, বোমা হামলা ও অন্যান্য ধর্মীয় উগ্রপনার কারণে মামলার বিচারে ২০১২-১৩ সালে ৫৮ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ জনের যাবজ্জীবন এবং ১০ জনের ফাঁসির দ-াদেশ হয়েছে। মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়ার দ্রুততা জঙ্গিবাদ নির্মূলে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ২০১২ সালের ১৩ মার্চ দ্রুত বিচার আদালত-৪ জেএমবি নেতা মামুনুর রশীদকে মৃত্যুদ- দেয় ২০০৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপারের অফিসে বোমা হামলার অভিযোগে। সে ঘটনায় ১৬ জন আহত হয়েছিল। এ ছাড়া ২১ আগস্ট (২০০৪) গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত থাকায় ২০১২ সালের ১৮ মার্চ ঢাকা কোর্ট বেগম জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছেন।

মূলত শেখ হাসিনা সরকারের আন্তরিকতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মিত জঙ্গিদের কার্যক্রম নজরদারি করা হচ্ছে। তারা যাতে সংগঠিত হতে না পারে সে জন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জঙ্গি দমনে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। একই সঙ্গে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের বিপক্ষে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এ দেশের। নাশকতা ও সহিংসতা গণতন্ত্রকামী মানুষকে আকৃষ্ট করে না। বরং যারা নাশকতা ও সহিংসতা করবে বা এর পৃষ্ঠপোষকতা দেবে, তাদের প্রতি ক্রমাগত ঘৃণাই প্রকাশ করবে জনগণ। আর জঙ্গিমুক্ত স্বস্তিকর বাংলাদেশই জনগণের প্রত্যাশিত সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। এটা সত্য যে, শেখ হাসিনার সরকার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বেশি সচেষ্ট। আইনের শাসন কার্যকর করার জন্য নিবেদিতপ্রাণ শাসক আমাদের দরকার। ইতোমধ্যে এ দেশের সব নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সন্ত্রাস সম্পর্কে জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী হিসেবে অভিনন্দিত হয়েছেন শেখ হাসিনা।

 

য় মিল্টন বিশ্বাস, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected])

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে