টেকসই খাদ্যনিরাপত্তার বিকল্প নেই

  মোহাম্মদ নজাবত আলী

২০ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৭, ০০:২০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খাদ্যনিরাপত্তা যে কোনো দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বাংলাদেশ অতীত বছরগুলোয় খাদ্য নিয়ে নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে পড়েনি। এমনকি ২০০৭-০৮ সালে সারা বিশ্বে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টির কারণে কয়েকটি দেশ খাদ্যঝুঁকিতে পড়লেও বাংলাদেশ সে সময় খাদ্যঝুঁকিতে পড়েনি। কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তা যে কোনো রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশের অবস্থান ভৌগোলিক দিক থেকে কখনো নদী ভাঙনের দিকে, কখনো প্রচ- বন্যা, কখনো অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টিÑ এক কথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে। ফলে প্রকৃতির এই বৈরী রূপ, হিংস্রতা, ফসলহানি, ক্রমাগতভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, উৎপাদন হ্রাস, প্রকৃতির এই দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। আর বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতি মোটেই শুভকর নয়। কারণ আমাদের দেশটি প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে প্রতিবছর ফসলসহ জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশের হাওর এলাকায় কৃষকের সর্বনাশ হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পানি ও সে এলাকায় প্রচ- বৃষ্টির কারণে কৃষকের চলতি ফসল পানিতে সম্পূর্ণ ডুবে যায়। তাদের মধ্যে হাহাকার সৃষ্টি হয়। ভবিষ্যৎ খাদ্য নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তাই কৃষকের এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সে এলাকায় সরকারের অবশ্যই টেকসই উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। তবে আশার কথা এই যে, বর্তমান সরকার কথায় নয়, কাজে এবং উন্নয়নে বিশ্বাসী। কৃষি খাতকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে, ফলে পর্যাপ্ত কৃষি উপকরণ সরবরাহে কৃষিফলনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনগণের কর্ম ও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। যার কারণে উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা শব্দটি হিমালয়ের গর্তে ঢুকেছে। তবুও ভৌগোলিকগত দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থানের কথা মাথায় রেখে সরকার জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত সচেতন, সতর্ক তবে উদ্বিগ্ন নয়।

জনসংখ্যা বা জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা জড়িত। কোনো দেশের জনসংখ্যা যদি দেশের উৎপাদিত খাদ্যশস্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য না হয়, বিদেশ থেকে চাল, ডাল আমদানি করার সক্ষমতা না থাকে তাহলে এক বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে পড়বে। সে রকম আমাদের কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ খাদ্যশস্য উৎপাদনের পাশাপাশি ব্যবসা, বাণিজ্য এবং প্রয়োজনবোধে বিদেশ থেকে চাল আমদানিতে সক্ষম বাংলাদেশ। সুদূর অতীতে দেখা গেছে, কৃষি অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলেও কৃষির পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে এ দেশের মানুষ জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেছে। দেশের উন্নয়ন হয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। জীবনযাত্রার মান ক্রমান্বয়ে উন্নত হচ্ছে। কিন্তু এসবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জনসংখ্যা। গত ষাট বছরে এ দেশের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অধিক জনসংখ্যায় বসতবাড়ি নির্মাণ, ইটভাটা প্রভৃতি কারণে প্রায় প্রতিবছর আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরদিকে আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় উৎপাদনের দিকে তাকিয়ে আছে এ দেশের ষোলো কোটি মানুষ। বর্তমানে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে তা যদি অব্যাহত তাকে তা হলে আগামীতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়বে। কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। তবুও বর্তমান সরকার কৃষি খাতকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে, ফলে উৎপাদনে কোনো অসুবিধা নেই। তবুও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খড়া ইত্যাদি কারণে কৃষি খাত কিছুটা ঝুঁকিতে থাকলেও এ দেশের কষ্টসহিষ্ণু মানুষ টিকে আছে।

এ কথা আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষিপণ্য সামগ্রী আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান দিক। কিন্তু কৃষি খাতের ঝুঁকি হচ্ছে বৈরী আবহাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলোচ্ছ্বাস, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, অধিক জনসংখ্যা, প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে উপরোক্ত কারণে খাদ্য সংকটের সৃষ্টি হয়। সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশ হওয়ায় প্রায় প্রতিবছর ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে আমাদের উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়। আবার অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফলে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। বাংলার কৃষকরা রোদে পোড়া মানুষ। প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদন আশানুরূপ হয় না। আবার পৃথিবীর সব দেশে খাদ্য উৎপাদন এক ধরনের নয়। ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য হলো ভাত। কিন্তু যে হারে আমাদের দেশে প্রতিবছর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে অধিক ফলনশীল ধান চাষ অত্যন্ত জরুরি। আবহমানকাল থেকে কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিত হলেও খাদ্য সমস্যা আমাদের প্রধান সমস্যা। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অধিক জনসংখ্যাসহ নানা প্রতিকূলের মধ্যেও দেশ ইতোমধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের মতো জনসংখ্যাধিক্য ও ঘনবসতি দেশ হিসেবে খাদ্যশস্য আমদানির পাশাপাশি অবশ্যই কৃষির ওপর জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে বহুমুখী কৃষিপণ্য উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কৃষি উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। তা ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাটির গুণাগুণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় অর্থাৎ যে এলাকায় যে ফসল অধিক উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, সে ফসল উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। ধান, গম, আলু, সরিষা, ভুট্টা, শাকসবজি বা যে কোনো ফসলই হোক না কেন। তবে এ ব্যাপারে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়াতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নজর ও মনোযোগ দেওয়া দরকার। তা হলো যেসব খাদ্যের মান ও নিরাপদ সংরক্ষণ পদ্ধতি এ ধরনের খাদ্য উৎপাদনের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করতে হবে।

যে কোনো রাষ্ট্রে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। কোনো সরকারই জনগণের খাদ্য নিরাপত্তার দায় এড়াতে পারে না। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের জনগোষ্ঠীকে যেন খাদ্যের জন্য হাহাকার করতে না হয়, জনগণ যেন অতি সহজে খাদ্যসামগ্রী পেতে পারে। খাদ্যের জন্য জনগণকে চিন্তা করতে না হয়। সার্বিক দিক থেকে বলা যায়, জনগণের টেকসই খাদ্যনিরাপত্তার ব্যবস্থা সরকারকেই গ্রহণ করতে হয়। কারণ জনগণকে নিয়েই তো সরকার। আর আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাই হচ্ছে জনকল্যাণমূলক। তাই জনগণের সার্বিক কল্যাণই যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম এবং প্রধান কাজ। সাধারণত খাদ্যনিরাপত্তা বলতে আমরা বুঝি, অবাধ খাদ্য সরবরাহ এবং সারা বছর খাদ্যের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতাকে বলা হয় খাদ্যনিরাপত্তা। উল্লেখ করা হয়েছে, ভৌগোলিক দিক থেকে বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রায় প্রতিবছর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। উপরন্তু অধিক জনসংখ্যা আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাই আমাদের জাতীয় জীবনে খাদ্যনিরাপত্তা একটি বড় সমস্যা। তবে বর্তমান সরকার জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ দেশের কৃষকসমাজই খাদ্য নিরাপত্তার বড় সহায়ক শক্তি। অধিক খাদ্য উৎপাদনে প্রয়োজনে গরিব, প্রান্তিক কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে কৃষিঋণ বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, যাতে কৃষকসমাজ আগ্রহ সহকারে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ। কেননা কোনো খাদ্যশস্য উৎপাদনে যেন কৃষকসমাজকে লোকসান গুনতে না হয়। তবে কৃষকের স্বার্থরক্ষায় সরকার ইতোমধ্যে কৃষিকার্ড বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং এতে কৃষকসমাজ কিছুটা হলেও উপকৃত হচ্ছে। কিন্তু জনসংখ্যা আমাদের বড় বাধা। কারণ বাংলাদেশে যে পরিমাণ আবাদি জমি রয়েছে তার চেয়ে দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে জনসংখ্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ খাদ্য সংকটে পতিত হবে না। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, যত্রতত্র বহুতল ভবন নির্মাণ, ইটভাটাসহ অন্যান্য কারণে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে। এ জন্য একটি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন, উৎপাদনশীল খাত ছাড়া নিজের বা ক্রয়কৃত কোনো আবাদি জমিতে ভবন নির্মাণ করা যাবে না। এ রকম বিধান যদি চালু করে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে বাংলাদেশ খাদ্যঝুঁকি থেকে অনেকাংশে মুক্তি পাবে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

অর্থাৎ খাদ্যের জন্য বিশ্ববাজারে বাংলাদেশে এ ধরনের নির্ভরতা থাকলেও বর্তমান সরকারের সময়োচিত নানা ধরনের পদক্ষেপ কৃষি খাতকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া, কৃষি উপকরণে সহজলভ্যতা ও পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা অধিক খাদ্য উৎপাদনে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এ কথাও সত্য যে, কৃষি পরিকল্পনা বা কৃষিনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকরণ একেবারে সহজ নয়। বিষয়টি বেশ জটিল। তবে এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন দরকার যা বর্তমান সরকারের রয়েছে।

মোহাম্মদ নজাবত আলী : শিক্ষক ও

কলাম লেখক

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে