এলাকা ছাড়ছে হাওরের মানুষ

  মো. মাহফুজুর রহমান

২০ মে ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২০ মে ২০১৭, ১৩:০২ | প্রিন্ট সংস্করণ

হাওরাঞ্চলের বানভাসি মানুষ কাজের সন্ধানে এলাকা ছাড়ছে। ঘরে খাবার নেই। এলাকায় নেই কাজ। এ অবস্থায় কাজের সন্ধানে আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও রাজধানীতে ছুটছেন বেশিরভাগ মানুষ। স্থানীয় খোলাবাজারে বিক্রি হওয়া ওএমএসের চাল নিতে দেখা গেছে অভাবী মানুষের দীর্ঘ সারি। অনেকেই তিন বেলার পরিবর্তে দুবেলা খাচ্ছেন। কারো কারো ঘরে আবার চাল না থাকায় ভাতের পরিবর্তে শুধু রুটি খাচ্ছেন। এমন চিত্রই উঠে এসেছে হাওরকেন্দ্রিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর জোট হাওর অ্যাডভোকেসি প্লাটফর্মের (হ্যাপ) সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদনে।

হ্যাপের প্রতিবেদনে বলা হয়, উপদ্রুত এলাকার শিশুরা পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না। কিশোরী ও গর্ভবতী নারীদের ভাগ্যেও জুটছে না কোনো পুষ্টিকর খাবার। শুধু তা-ই নয়, খাদ্যাভাবে ওইসব এলাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় কমে গেছে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় উপস্থিতির হার কমেছে ছেলেদের। তাই বিদ্যালয়গুলোয় দুপুরের খাবার সরবরাহের দাবি ওই এলাকার মানুষের। কারণ তারা চান না তাদের ছেলেমেয়েরা পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়–ক।

খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এ বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, ওই প্রতিবেদন না দেখা পর্যন্ত কিছু বলতে পারব না। তবে এমন কিছু (খাদ্যাভাবে না খেয়ে থাকা) হতে পারে, এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। কারণ সরকার সেখানে পর্যাপ্ত ত্রাণ দিচ্ছে। নতুন ধান না ওঠা পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে।

হাওরাঞ্চল ঘুরে আসা গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ফসলহারা মানুষ বাঁচার তাগিদে এলাকা ছাড়ছেন। তাদের ঘরে খাবার নেই, কাজও নেই। তাই হাওর এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সবার জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

বিদ্যমান বাস্তবতা বলছে, হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন। পরিবারে নেমেছে বিষাদের ছায়া। ধান বিক্রির টাকায় চাষাবাদের ঋণ, সারা বছর পরিবারের ব্যয়ভার বহন এখন তাদের পক্ষে দুষ্কর। বন্ধ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা। নিজ এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় কাজের সন্ধানে আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও রাজধানীতে ছুটছেন এলাকার বেশিরভাগ মানুষ। স্থানীয় খোলাবাজারে বিক্রি হওয়া ওএমএসের চাল নিতে অভাবী মানুষের দীর্ঘ সারি।

হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের সদস্য সচিব আনিসুল ইসলাম আমাদের সময়কে জানান, ওইসব এলাকার ৩ শতাংশ সপরিবারে স্থানান্তরিত হয়েছে। ৭ শতাংশ পরিবারের এক বা একাধিক পুরুষ সদস্য এলাকা ছেড়েছেন এবং ১২ ভাগ পরিবারের সদস্যরা কাজের খোঁজে অন্যত্র যাওয়ার জন্য পরিকল্পনা করছেন।

তিনি আরও বলেন, ১৫টি গ্রামে আনুমানিক ৯ হাজার ৭৫০টি হাঁস মারা গেছে বলে জানিয়েছেন গ্রামবাসী, যার মূল্য প্রায় ২ কোটি ৯২ লাখ টাকা। গ্রামবাসীর মতে, মৃত মাছ খাওয়া ও দূষিত পানির কারণে হাঁসগুলো মারা যায়। প্রতিবছর কিছু হাঁস রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও পানি দূষিত হয়ে এত ব্যাপক হারে মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো হয়নি। অথচ সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, মাত্র ৫ হাজার ৬৯২টি হাঁস মারা গেছে হাওরাঞ্চলে।

এদিকে সরকারি তথ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে উল্লেখ করে হ্যাপ জানায়, হেক্টরপ্রতি চাল উৎপাদনের ক্ষতি দেখাতে গিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ৩ টন, ৩ দশমিক ৪৫ টন, ৩ দশমিক ৫৩ টন ব্যবহার করেছে। যদিও পূর্ববর্তী বছরে পরিসংখ্যান ব্যুরো এ হার উল্লেখ করেছিল, ৩ দশমিক ৭৬ টন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি এলাকা বা মাছের মড়ক-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় পরবর্তীতে কম দেখানোর প্রবণতাও লক্ষ করা গেছে। সাতটি জেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮৫ লাখ হেক্টর, অথচ ছয়টি জেলার সমন্বিত তথ্যের ক্ষেত্রে সরকারের আরেকটি বিভাগ জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত জমি ২ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর। ওখানে অবশ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। এবারের বন্যায় ওই অঞ্চলে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার হেক্টর।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে