ভুল চিকিৎসায় শিক্ষার্থীর মৃত্যু

পরিচালকের জামিন, ছেড়ে দেওয়া হয়েছে চিকিৎসককে

  ইউসুফ সোহেল

২০ মে ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২০ মে ২০১৭, ০০:৫৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী আফিয়া জাহান চৈতীর মৃত্যুর অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার হাসপাতালের পরিচালক ডা. এম এ কাশেমের জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত। এ ঘটনায় আটক অন্য চিকিৎসক ডা. সাজিদ হোসেনকে বৃহস্পতিবার রাতেই ছেড়ে দেয় পুলিশ।
সূত্র জানায়, এই ঘটনায় করা মামলার ৯ নম্বর আসামি হাসপাতালের পরিচালক ডা. এম এ কাশেমকে গতকাল ঢাকা সিএম এম আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় তার বিরুদ্ধে কোনো আবেদন করেননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। অপরদিকে ডা. কাশেমের আইনজীবী জামিনের আবেদন করলে ঢাকা মহানগর হাকিম আবদুল্লাহ আল মাসুদ শুনানি শেষে তার জামিন মঞ্জুর করেন।
ধানম-ি থানার ওসি আব্দুল লতিফ আমাদের সময়কে বলেন, ঢাবি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের পরিচালক ডা. এম এ কাশেম ও ডা. সাজিদ হোসেনকে আটক করা হয়। গতকাল জামিন পেয়েছেন পরিচালক ডা. এম এ কাশেম। রোগীর মৃত্যু ও হাসপাতাল ভাঙচুরের ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার নেই বলেও ওসি জানান।
চৈতীর সহপাঠী ইফতেখারুল ইসলাম সজীব আমাদের সময়কে বলেন, ভর্তি করার পর হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান চৈতীর লিউকেমিয়া (ব্লাড ক্যানসার) হয়েছে। সে অনুযায়ীই চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তারা বলে চৈতীর ডেঙ্গুজ্বর হয়েছে। চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসায় চৈতীর মৃত্যু হয়েছে দাবি করে ঢাবির বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, এই দায় এড়াতে পারে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হলে তারা আন্দোলন করবেন।
চৈতী অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহর অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বলেন, চৈতীকে যখন হাসপাতালে আনা হয় তখন তার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। প্রচ- গরম ছিল শরীর। শিক্ষার্থীরা ধারণা করে, তার জ্বর হয়েছে। পরে পরীক্ষা করে চৈতীর লিউকোমিয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন। বিষয়টি জানানো হয় তার স্বজনদের। পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে পুরোপুরি চিকিৎসার আগেই রক্তক্ষরণ হয়ে মারা যায় মেয়েটি। এখানে ভুল চিকিৎসা হলো কীভাবেÑ প্রশ্ন রাখেন অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ।
সেন্ট্রাল হাসপাতালের বিরুদ্ধে এর আগেও চিকিৎসায় অবহেলা ও আইসিইউ বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে। ভালুকার ডাকাতিয়া ইউনিয়নের কাতলামারী গ্রামের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, ভালুকায় ১০ এপ্রিল একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয় তার ভাই জহিরুল ইসলাম খান। তাকে সে রাতেই নেওয়া হয় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। কিছু পরীক্ষার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা বলেন, রোগীর অবস্থা এখন ভালো। হাসপাতালে থাকা এক দালালের উন্নত চিকিৎসার প্ররোচনায় জহিরুলকে পরদিন আনা হয় ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতালে। সেখানে কর্তব্যরত ডা. আরিফ জানান, রোগীর অবস্থা ভালো নয়। আইসিইউতে নিতে হবে। টাকার দিকে না তাকিয়ে ভাইকে আইসিউইতে ভর্তি করান জাহিদুল। এভাবে তিন দিন কাটানোর পর আইসিইউর ইনচার্জ ডা. বদরুল বলেন, রোগীর অবস্থা খারাপের দিকে। এ সময় জাহিদুল ভাইয়ের চিকিৎসায় তার মনোনীত এক চিকিৎসকের নাম প্রস্তাব করেন আইসিইউর ইনচার্জের কাছে। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই চিকিৎসকই জহিরুল ইসলামের চিকিৎসা করছেন। পরে খোঁজ নিয়ে জাহিদুল জানতে পারেন, তার মনোনীত চিকিৎসক এই রোগীর বিষয়ে অবগতই নন। এভাবে ১০ দিন পার হওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান, জহিরুল মারা গেছেন। পরে জাহিদুলকে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকার বিল দেওয়া হয়। অনেক অনুনয়-বিনয় করে ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করে ভাইয়ের লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরেন জাহিদুল।
এদিকে, অভিযোগ পাওয়া মাত্রই সিনিয়র চিকিৎসকদের গ্রেপ্তার করা ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বলেন, ‘যদি হাসপাতালের ভুল রিপোর্টের কারণে ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয় তাহলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।’ চিকিৎসক গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোনও করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এসব তথ্য জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র।
সেন্ট্রাল হাসপাতালে ঢাবি ছাত্রী আফিয়া জাহান চৈতীর মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনাকে অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক বলে অভিহিত করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। গতকাল এক বিবৃতির মাধ্যমে তিনি চৈতীর অকালমৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের অকালমৃত্যু মেনে নেওয়া খুবই দুরূহ। তবে রোগীর মৃত্যুর জন্য ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ডাক্তার লাঞ্ছনা বা হাসপাতাল ভাঙচুরের মতো পরিস্থিতি মোটেও কাম্য নয়।
সেন্ট্রাল হাসপাতালের ঘটনায় সংক্ষুব্ধ স্বজনদের বিএমডিসি বরাবর অভিযোগ করার অনুরোধ করে তিনি বলেন, বিএমডিসি স্বাধীন অবস্থান থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করে অভিযোগের প্রমাণ পেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তাই ভুল চিকিৎসার অভিযোগকে কেন্দ্র করে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য মন্ত্রী সবার প্রতি আহ্বান জানান।
প্রসঙ্গত, সেন্ট্রাল হাসপাতালে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী আফিয়া জাহান চৈতীর মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঢাবি শিক্ষার্থী আফিয়া জাহান চৈতীকে গতকাল গ্রামের বাড়ি শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের লছমনপুরে দাফন করা হয়। চৈতীর লাশ এলাকায় নেওয়া হলে শোকের ছায়া নেমে আসে। মেয়ের লাশ দেখে বাবা অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা সেফাউর রহমান জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। বেলা ১১টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। জানাজায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক মাহাবুবুর রহমান, তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা অংশগ্রহণ করেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে