সম্পর্ক ছিন্ন করছে বিদেশি ব্যাংক

  হারুন-অর-রশিদ

১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৭, ১৫:২৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, সুশাসনের অভাব ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত দেশের ব্যাংকিং খাত। এর মধ্যে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাস-জঙ্গি কার্যক্রমে অর্থায়ন বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান সমস্যার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। উন্নত দেশে বড় বড় ব্যাংক সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখছে না। গত দেড় বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের শতাধিক নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংকগুলো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত।

সূত্র জানায়, আমদানি-রপ্তানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা, রেমিট্যান্স আনা ও অন্য আর্থিক লেনদেন সম্পাদনে অন্য দেশের ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের চুক্তিকে ‘করেসপন্ডিং ব্যাংকিং’ বলা হয়। সাধারণত উন্নত দেশের বড় বড় ব্যাংক উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে এ চুক্তি করে। করেসপন্ডিং ব্যাংকিং থাকায় নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব হয়। এর ফলে স্বল্প খরচে আমদানি-রপ্তানির বিল পরিশোধ ও রেমিট্যান্স আনা যায়। করেসপন্ডিং ব্যাংক না থাকলে বিদেশের অন্য কোনো কমপ্লায়েন্ট ব্যাংকের গ্যারান্টির মাধ্যমে এসব লেনদেন করতে হয়। এতে অতিরিক্ত মাসুল দিতে হয় গ্যারান্টিদাতা ব্যাংককে।

আন্তর্জাতিক আইন ব্যাসেল-৩ অনুসারে মূলধনের ঘাটতি, খেলাপি ঋণ বেশি থাকায় বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর কমপ্লায়েন্স নিয়ে উদ্বিগ্ন উন্নত দেশের ব্যাংকগুলো। এ ছাড়া প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে বাংলাদেশের ব্যাংকের মাধ্যমে। পাচার করা অর্থের শতকরা ৭০ ভাগই যায় ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে। এ ছাড়া ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ বিদেশি পাঠিয়ে পণ্য আনছে অনেক রপ্তানিকারক। কিন্তু ব্যাংকগুলো পাচারকারীদের ধরতে পারছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধরা পড়লেও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে আসা অর্থ জঙ্গি ও সন্ত্রাসের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। কাঠামোগত এসব দুর্বলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখছে উন্নত দেশের ব্যাংকগুলো। ঝুঁকি এড়াতে তারা বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করছে। সম্পর্ক ছিন্ন করার এ প্রক্রিয়াকে ডি-রিস্কিং বলা হয়।

ব্যাংকের এমডি ও প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির ভাইস চেয়ারম্যান ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের আড়ালে ব্যাংকের মাধ্যমেই অর্থ পাচার হচ্ছে। পাচার ও মানিলন্ডারিং নিয়ে উন্নত দেশের ব্যাংকগুলো চরম উদ্বিগ্ন। এ কারণে আমাদের দেশের ব্যাংকের সঙ্গে করেসপন্ডিং ব্যাংকিং ছিন্ন করছে এবং নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিচ্ছে। এতে ব্যবসা সঙ্কুুচিত হয়ে পড়ছে। এটি অব্যাহত থাকলেও আন্তর্জাতিক ট্রেড হুমকির মুখে পড়বে।

তিনি বলেন, পাচার ও জঙ্গি অর্থায়ন প্রতিরোধ ইত্যাদি ইস্যুতে কমপ্লায়েন্ট না থাকায় ইতোমধ্যে এইচএসবিসি ব্যাংক ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও সিটি ব্যাংক এনএ হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকিং করছে। এটি ব্যাংকগুলোর জন্য ভীতিকর।

ব্যাংকগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, লেনদেনের জন্য উন্নত দেশের বড় বড় ব্যাংকের নস্ট্রো অ্যাকাউন্টেন্টের সংখ্যা দিন দিন কমছে। ২০১৫ সালে নস্ট্রো অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ১২০০। অর্থ পাচার প্রতিরোধে অক্ষমতায় দেড় বছরে শতাধিক নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। তবে প্রতিবেশী ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কিছু ব্যাংকে নতুন করে নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। বর্তমানে অবশ্য এই অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৬০-তে।

কমপ্লায়েন্স যে ইস্যুগুলোয় ডি-রিস্কিং হচ্ছে তা আরও খারাপ পর্যায়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশিত হয়। মালয়েশিয়া সরকারের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচিতে তৃতীয় শীর্ষ বিনিয়োগকারী বাংলাদেশিরা। ওই অর্থের পুরোটাই অবৈধ পথে গেছে। এ ছাড়া সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, এক বছরে ওই দেশের ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের অর্থ জমার পরিমাণ ১৯ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা হয়েছে। গ্লোবাল ফাইন্যাশিয়াল ইন্টেলিজেন্সির (জিএফআই) প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই অর্থের ৭০ শতাংশই গেছে আমদানি-রপ্তানির নামে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে।

দেশে খেলাপি ঋণ তিন মাসে ১১ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ৭৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা হয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের হার ২০ থেকে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতিও অনেক বেশি। ঋণের নামে টাকা নিয়ে বিদেশে পাচার করার প্রমাণ রয়েছে।

ঋণের নামে ৪ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের কারণে বেসিক ব্যাংকের সঙ্গে উন্নত অনেক দেশের ব্যাংক করেসপন্ডিং ব্যাংকিং ছিন্ন করেছে। এ ছাড়া সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সরাসরি করেসপন্ডিং করছে না উন্নত দেশগুলোর বড় বড় ব্যাংক। জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে উন্নত বেশ কিছু ব্যাংকের করেসপন্ডিং ব্যাংকিং নেই। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আসা নতুন প্রজন্মের ৯টি ব্যাংক করেসপন্ডিং ব্যাংকিং নিয়ে চরম বিপাকে আছে। প্রতিবেশী ও মধ্যপ্রাচ্যের দু-একটি ব্যাংক করেসপন্ডিং ব্যাংকিং সুযোগ দিলেও উন্নত দেশগুলোয় তারা এ সুযোগ পাচ্ছে না।

করেসপন্ডিং ব্যাংকিং অব্যাহত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক একাধিক সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছে বাংলাদেশে ব্যাংক। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সভা-সেমিনারে সম্পর্ক ছিন্ন না করতে অনুরোধও জানাচ্ছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকর গভর্নরদের সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ইতোমধ্যে উন্নত দেশের বেশ কয়েকটি বড় ব্যাংক বাংলাদেশের কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে করেসপন্ডিং ব্যাংকিং প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানিকারকরা ছাড়াও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রেমিটাররা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বৈধ পথে তাদের রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ বেড়ে গেছে; বাধ্য হয়ে হুন্ডির মতো অবৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন তারা। এতে কমছে রেমিট্যান্সপ্রবাহ।

ওই সভায় আরও জানানো হয়, উন্নয়নশীল দেশের ব্যাংকগুলোকে মানিলন্ডারিংয়ের অজুহাতে করেসপন্ডিং ব্যাংকিং করতে দেওয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশ মানিলন্ডারিং ঝুঁকি কমাতে কঠোর পরিশ্রম করছে এবং ইতোমধ্যে এফএটিএফের কালো তালিকা থেকে মুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ মূলধন পর্যাপ্ততা নিরূপণের ব্যাসেল-৩ নীতিমালা বাস্তবায়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুসরণের জন্য লিকুইডিটি কাভারেজ রেশিও (এলসিআর) এবং নেট স্ট্যাবল ফান্ডিং রেশিওর (এনএসএফআর) গাইডলাইন জারি করেছে।

এদিকে দাতা সংস্থা ও উন্নয়নসহযোগী বিশ্বব্যাংক ডি-রিস্কিংয়ের বিষয়ে সমর্থন দিয়েও উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে কিছুটা সহযোগী হয়ে কাজ করছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, সামগ্রিকভাবে কমপ্লায়েন্স না থাকায় জি২০ সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলো ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করছে। ডি-রিস্কিংয়ের কারণে ব্যবসার করার যোগ্যতা হারাচ্ছে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর ব্যাংক। বর্তমান প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলোর মানুষ ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, যে অবস্থার কারণে ডি-রিস্কিং হচ্ছে, ডি-রিস্কিংয়ের কারণে সে অবস্থা আরও খারাপ হবে। আন্তর্জাতিকভাবে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ সম্ভব হবে না। কার্যকরভাবে জঙ্গি ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধ করা যাবে না। এতে অপরাধীরা ভিন্ন চ্যানেলে অর্থ লেনদেন করবে। কিন্তু ডি-রিস্কিং না থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ এলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ ছিল। ডি-রিস্কিংয়ের সমর্থন দিয়ে আবার বিশ্বব্যাংক বলছে, উন্নত দেশগুলোর চাহিদা হচ্ছে বিশ্বের সব দেশের ব্যাংক উচ্চ মানসম্পন্ন হক। ডি-রিস্কিং করলে তারা বাধ্য হবে মান নিশ্চিত করতে। ব্যাংকগুলোকে কমপ্লায়েন্ট ও অপরাধী কার্যকলাপমুক্ত রাখতে ডি-রিস্কিং জরুরি।

এদিকে ডি-রিস্কিংয়ের কারণে বিশ্বের পিছিয়ে পড়া দেশগুলো কী ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাপী তারা একটি জরিপভিত্তিক গবেষণা শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংকের লিড ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর স্পেশালিস্ট পিয়েরে লরেন্ট চ্যাটেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে জরিপ চালাচ্ছে। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সি ইউনিটের (বিএফআইইউ) সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে এ জরিপ শুরু করেছে। পর্যায় ক্রমে বাণিজ্যিক ব্যাংক, ব্যবসায়ী, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করছে ওই প্রতিনিধি দল।

সোনালী ব্যাংকের এমডি ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, অভ্যন্তরীণ কিছু সংকট রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক অনেক নিয়ম মেনে চলছে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো। ব্যাসেল-৩ অনুসরণ, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে