সাত কোটি টাকার চাল লুটের শাস্তি সাসপেন্ড, বদলি

  মো. মাহফুজুর রহমান

১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৭, ১৫:২৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাত কোটি টাকা মূল্যের চাল আত্মসাতের শাস্তি সাময়িক বহিষ্কার। এর সঙ্গে জড়িত অনেককে বদলি করা হয়েছে আরও লোভনীয় পদে। মাঠ পর্যায়েরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও বড় কর্তারা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জানা গেছে, টানা ৩ বছর ধরে ধাপে ধাপে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার দৌলতগঞ্জ খাদ্য গুদামের ৭ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ১৮শ টন সরকারি চাল আত্মসাৎ করা হয়। খাদ্য বিভাগের অভ্যন্তরীণ অডিট টিমের কাছে এ বছর এই দুর্নীতি ধরা পড়ে। অডিট টিম বলছে, দীর্ঘসময় ধরে মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে বিভাগীয় খাদ্য প্রশাসনের যারা এ গুদাম সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তাদের অসততা অথবা দায়িত্বহীনতা ছাড়া এত বড় দুর্নীতি সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়। দুর্নীতির মূল হোতা হিসেবে গুদাম কর্মকর্তাকে প্রায় এককভাবে দায়ী করা হয়েছে।

দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার সময় চট্টগ্রাম বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন আব্দুল আজিজ মোল্লা। বিভাগীয় কর্মকর্তা হিসেবে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানে তিনি খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালকের মতো লোভনীয় পদে কর্মরত। তৎকালীন কুমিল্লা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনূর রশীদকে পরে বদলি করা হয় কিশোরগঞ্জে। লাকসাম থানা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সালমা বেগমকে আরও লোভনীয় চাঁদপুর সিএসডিতে বদলি করা হয়। একাধিক সূত্র বলছে, বিভাগীয় কার্যালয়ের আরও ৫ কর্মকর্তা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অন্তত ডজনখানেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এ দুর্নীতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকলেও তারা অধরা থাকছেন।

আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, দৌলতগঞ্জ গুদামে চালের প্রয়োজন না হলেও অজ্ঞাত কারণে সেখানে টন টন চাল পাঠানো হয়। ২০১৫ সালের ১২ জুলাই থেকে ২০১৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত ১৭টি চালানের বিপরীতে ২ লাখ ৫০ হাজার ৪৩৭ টন গম ও ৩৬টি চালানের বিপরীতে ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৩১৩ টন চাল ওই গুদামে মজুদের জন্য পাঠানো হয়। বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলাÑ এ তিন স্তরে কর্মরত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ছিল, চালানের সঙ্গে মজুদের মজুদ মিলিয়ে দেখা। এ ব্যাপারে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা সে দায়িত্ব পালন করেননি। কুমিল্লা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে পৃথক চালানের মাধ্যমে ৮ লাখ ২৪ হাজার ৭৫০ টন খাদ্যশস্য এ গুদামে পাঠানো হয়। কিন্তু ওই খাদ্যশস্যের বড় অংশই মজুদ না করে বিক্রি করে দেওয়া হয়। নিয়ম রয়েছে, জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রতিমাসে অন্তত দুবার গুদামের মজুদ পরিস্থিতি তদারক করে রিপোর্ট দেবেন। কিন্ত ৩ বছরে সেসব করা হয়নি।

শুরুতে গুদামের দায়িত্বে থাকা সর্বশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) একেএম মহিউদ্দিনকে একমাত্র অপরাধী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। কিন্ত মহাপরিচালক বিষয়টি জানতে পেরে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। এরপর জেলা ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে অভিযুক্ত করা হয়েছে গত সপ্তাহে। কিন্তু বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলার অন্তত ১২ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে রেহাই দেওয়া হয়েছে দুর্নীতি থেকে। ঘটনা ধামাচাপা দিতে খাদ্য বিভাগেরই কিছু সুবিধাভোগী কর্মকর্তা নানাভাবে সমাঝোতার চেষ্টা করছেন। এ ঘটনায় ওই সময়ে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয় একটি বিশেষ মহলের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও তারা রেহাই পাচ্ছেন।

অভিযুক্ত কর্মকর্তা মহিউদ্দিন ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি লাকসাম খাদ্য গুদামে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর পদোন্নতি পেয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে বদলি হলেও রহস্যজনক কারণে নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করে দৌলতগঞ্জ খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবেই থেকে যান। পরে ওই গুদামে ওসিএলএসডি হিসেবে এনামুল হক যোগদান করেন। এ সময় অডিট টিমের কাছে দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসে। এ ঘটনায় লাকসাম থানায় মামলাসহ বিভাগীয় নিরীক্ষা ও তদন্ত চলছে। তদন্তে বেরিয়ে আসে ২৫শ খালি বস্তা বিক্রির সমুদয় অর্থ এবং চালানপত্র, খামাল কার্ড ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শন বইসহ নানা দুর্নীতি চিত্র। ঘটনা ধামাচাপা ও লোপাট করা খাদ্যশস্য কিনে দেওয়ার শর্তে সাবেক ওসিএলএসডি মহিউদ্দিন খাদ্যশস্যের মূল্য বাবদ আড়াই কোটি টাকার কয়েকটি চেক দেন। এসব চেক বর্তমানে কুমিল্লা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে রয়েছে।

ওই দুর্নীতির বিষয়ে আজিজ মোল্লার কাছে প্রশ্ন ছিলÑ বিভাগীয় কর্মকর্তা হিসেবে প্রথা অনুযায়ী ৩ বছরে একবারের জন্য গুদাম পরিদর্শনে গিয়েছিলেন কিনা। উত্তরে তিনি বলেন, আসলে সবখানে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এটি দায়িত্বহীনতা কিনা এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি।

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, অভিযুক্ত মহিউদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়েছে। মামলাটি দুদক তদন্ত করবে। এ ধরনের অপরাধী যেন কোনোভাবেই পার পেতে না পারে সে বিষয়ে নজর রাখা হবে।

তদন্তে দেখা গেছে, প্রত্যক্ষভাবে জড়িতরাই আসল অপরাধী। দায়িত্বহীনতাকে এ ক্ষেত্রে আমলে আনা হয়নি। খাদ্য বিভাগের ইতিহাসের এ ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করা হলেও সার্বিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, বড় কর্তারা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

খাদ্য বিভাগের মহাপরিচালক বদরুল হাসান জানান, অপরাধীরা কেউ পার পাবেন না। এ অপকর্মে কেউ সরাসরি জড়িত, অনেকে অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেননি। এ দুপক্ষই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অপরাধ করেছেন। আমরা সবকিছু খতিয়ে দেখছি।

তদন্ত দলের প্রধান খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সালাউদ্দিন আহমদ গতকাল আমাদের সময়কে জানান, নিরপেক্ষভাবেই তদন্ত করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের ৭-৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। কয়েকজনকে ইতোমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এখন অন্য ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

এ বিষয়ে খাদ্য নিয়ন্ত্রক এনামুল হক ভূঁঁইয়া সেলিম বাদী হয়ে চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল লাকসাম থানায় একটি মামলা করেন। দুদকও বিষয়টি তদন্ত করছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে