জামিন নিয়ে উধাও ৬০ জঙ্গি

  শাহজাহান আকন্দ শুভ ও ইউসুফ সোহেল

১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছেন ৬০ জঙ্গি। তারা ফের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে যুক্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা গোয়েন্দাদের। জামিনে মুক্ত হওয়া অধিকাংশ জঙ্গিই গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে অন্তরিন ছিলেন। জামিনের শর্ত অনুযায়ী, তাদের নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেওয়ার কথা। কিন্তু তাদের সবাই আদালতে গরহাজির। এ ব্যাপারে একটি গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।

কাশিমপুর কারাগারে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ২৪৩ আটক ছিলেন। এর মধ্যে ৬০ জন জামিন নিয়ে লাপাত্তা। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে জামিন নেওয়া জঙ্গিরা ফের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়ন ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকা-ে সম্পৃক্ত হচ্ছেন কিনা, তা তদারকি করতে সমন্বয় সেল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।

জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের জামিন ঠেকাতে আইনি কৌশল নির্ধারণে কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২ জুন থেকে চলতি বছরের ২৪ মে পর্যন্ত কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে মোট ১৫০ জন জঙ্গি সদস্য জামিনে মুক্তি পায়। এদের বেশিরভাগই সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলার আসামি। জামিনে মুক্তিপ্রাপ্ত ১৫০ জঙ্গির মধ্যে ৯০ জনই জামিন প্রাপ্তির পর কারাফটকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক ফের গ্রেপ্তার হন। বাকি ৬০ জন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে যান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামিনের পর আসামিদের জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা ও উগ্রবাদী মনোভাব পরিবর্তন না হওয়ায় নতুন নতুন কৌশলে ফের জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে নাশকতামূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েন তারা। এদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত গুপ্তহত্যা ও নাশকতাকারীদের গোপন যোগাযোগ বা নেটওয়ার্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জামিন লাভের পর জঙ্গি-আসামিদের বর্তমান অবস্থান, কর্মকা- ও তৎপরতার ওপর নজরদারি কম থাকায় তারা ফের জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

এ ছাড়া দীর্ঘ সময় কারাগারে অবস্থানকালে জঙ্গি আসামিদের সঙ্গে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীমউদ্দিন রাহমানী, জেএমবির প্রধান মাওলানা সাইদুর রহমান, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামি এনায়েতুল্লাহ জুয়েলসহ কারাগারে আটক নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ায় বিভিন্নভাবে মতবাদ-পরিকল্পনা বিনিময়, শলাপরামর্শ ও বোঝাপড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জঙ্গি সংগঠনের নেটওয়ার্ক বিস্তার, পরিকল্পনা প্রণয়ন, অর্থ সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, রিক্রুটিং, আটককৃতদের জামিনের ব্যবস্থা ইত্যাদি কর্মকা-ে বর্তমানে জামিনে থাকা জঙ্গিরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে কিনা, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কারাগার থেকে জামিন পাওয়া সব জঙ্গি আসামি নিয়মিত কোর্টে হাজিরা দিচ্ছে কিনা এবং জামিন পেয়ে ফের জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়ন ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকা-ে সম্পৃক্ত হচ্ছে কিনা তা তদারকি করতে সমন্বয় সেল গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি জামিনপ্রাপ্ত জঙ্গিদের ওপর নজরদারি বাড়াতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিতে সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত জঙ্গিরা ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার এবং মামলাগুলো ঢাকায় হলেও তাদের স্থায়ী ঠিকানা প্রত্যন্ত অঞ্চলে। যে কারণে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক গোপন তল্লাশির মাধ্যমে তাদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে অবহিত হতে নির্দেশনা দেওয়া, জঙ্গি সদস্যদের জামিন প্রবণতারোধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার পাশাপাশি জামিনপ্রাপ্তদের জামিন বাতিলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ, জঙ্গি আসামি ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা জামিন পেলে জামিন আদেশ পাওয়ার পর তা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাসহ স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করে আসামিকে মুক্তি দিতে কারাগার কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ফের গ্রেপ্তারের পর তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তা নজরদারি করতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ দিতেও সুপারিশ করা হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আব্দুর রশিদ আমাদের সময়কে বলেন, জামিন পাওয়ার বিষয়টি একটি আইনি প্রক্রিয়া। এটা আদালতের বিষয়। তবে রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ কেউ জামিন পেলে নিঃসন্দেহে বিষয়টি তদন্তকারী কর্মকর্তা ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাকে জানাবেন কারাগার সংশ্লিষ্টরা। এটারও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কেউ এটি না করলে যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, তা হলে তথ্য গোপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জঙ্গি নেতাদের জামিনের বিষয়ে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। জামিনপ্রাপ্ত সব জঙ্গি আসামির ওপর নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার বলেও মন্তব্য করেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের ডিআইজি মনিরুল ইসলাম বলেন, যেসব জঙ্গি জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন, তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তারা যেন ফের সন্ত্রাসমূলক কর্মকা-ে যুক্ত হতে না পারে সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।

জামিন পাওয়া জঙ্গিরা হলেন মো. শিহাব হোসেন, পারভেজ শেখ, আজহারুল হান্নান (অরেঞ্জ), নূর মোহাম্মদ ওরফে ল্যাংড়া মাস্টার, জামিল হোসেন, আব্দুর রশিদ, শাহাদাত হোসেন, রেদোয়ান, আব্দুল আজিজ, ইশরাত আলী শেখ, আব্দুল হাকিম ম-ল, জাহিদুল ইসলাম, ওয়াহিদুল ইসলাম, আবু সোয়াইব, জাবেদ আল রাফিয়ান, ইকবাল মাহমুদ রিপন, সোহেল আহমেদ সোহেল, মহিউদ্দিন, গোলাম কিবরিয়া খান, ওমর শরীফ, রোমান, মুফতি জাফর আমিন, আনোয়ার হোসেন, উসমান গনি, আমিনুল ইসলাম, গিয়াস উদ্দিন, আলম মাহবুব, তানভীর আহমেদ তনয়, মারজিয়া আক্তার সুমি, এসএম সানায়েত বিন মোস্তাফিজ (সুজন), আফজাল হোসেন, আব্দুল কাউয়ুম, আমির হামজা, রাজু মিয়া, ওমর ফারুক, সোলাইমান, সুলতানা বেগম ওরফে সুলতানা রহমান কচি, আকলিমা মনি, ইসরাত জাহানা মৌসুমী ওরফে মৌ, খাদিজা বেগম মেঘলা, তৌহিদ মিয়া, মহিবুল্লাহ, আব্দুল আল নোমান, মহিউদ্দিন, আকরাম হোসেন, আসরাব আলী, ইসতিমনা আক্তার ঐশী, আবিদ হাসান কাদির, সাইমুন সোহেল, মিনহাজ আবেদীন, আজিজুর রহমান, গাজী মোহাম্মদ বাবুল, ইউসুফ নুরানী, জাফর ইকবাল, চায়নুর রহমান (বাবুল), আশরাফুল আলম, রাসেল ওরফে কবির হোসেন, মেজবাউর রহমান, হিজবুর রহমান ও মো. সিকান্দার আলী নকি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে