আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে জ্বালানি

  লুৎফর রহমান কাকন

১৩ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ১৭:২২ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে শিল্প বিকাশের সঙ্গে-সঙ্গে জ্বালানি চাহিদা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। কিন্তু যে হারে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে ঠিক উল্টোভাবে কমছে জোগান। জ্বালানি সংকটের কারণে শত শত শিল্পকারখানা রুগ্ন হয়ে পড়ছে। উৎপাদনে আসতে পারছে না নতুন নতুন শিল্পকারখানা। এ অবস্থায় জ্বালানির চাহিদা পূরণে আমদানির দিকে ঝুঁকছে সরকার। ফলে জ্বালানির সব কিছুই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে।

দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে তেল আমদানি করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। শুরু থেকে অল্প পরিমাণে জ্বালানি তেল আমদানি হলেও গত ছয়-সাত বছরে তা বেড়েছে কয়েকগুণ। প্রতিবছর বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। গত বছরও প্রায় ৫৩ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। চলতি মাসে সরকার নতুন করে আরও প্রায় ১০টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে। এগুলো পরিচালিত হবে আমদানি করা জ্বালানি তেল দিয়ে। ফলে দেশে তেল আমদানির পরিমাণও বাড়বে।

২০৩০ সাল নাগাদ সরকার প্রায় ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী এ বিদ্যুতের প্রায় অর্ধেকই হবে কয়লাভিত্তিক। কিন্তু এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য যে পরিমাণ কয়লা প্রয়োজন তার পুরোটাই আমদানিনির্ভর। সরকারের হিসাব অনুযায়ী এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে প্রতিবছর আমদানি করতে হবে কয়েক লাখ টন কয়লা। ফলে এর জন্য আলাদা বন্দর নির্মাণ করতে হবে। এ বন্দরে বছরজুড়েই জাহাজ থেকে কয়লা আনলোড করতে হবে।

বিদ্যুতের জ্বালানি হিসেবে শুধু তেল বা কয়লা আমদানিই নয়, সরাসরি বিদ্যুৎও ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশটি থেকে প্রায় ৬শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে। ত্রিপুরা থেকে একশ এবং বহরমপুর দিয়ে আরও পাঁচশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি প্রক্রিয়াধীন। সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে ভারত থেকে আরও দেড় থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান থেকেও বিদ্যুৎ আমদানির চেষ্টা চলছে।

শুধু কয়লা এবং জ্বালানি তেল আমদানি নয়, গ্যাসের সংকট মেটাতে সরকার গ্যাস আমদানির উদ্যোগও নিয়েছে। কাতার থেকে লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) আমদানির লক্ষ্যে দেশটির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। কাতার ছাড়াও বিভিন্ন দেশ থেকে এলএনজি আমদানির চেষ্টা করছে সরকার। আগামী বছর শেষ নাগাদ এলএনজি আমদানি শুরু হবে। সরকার বলছে, আগামী বছরের শুরু থেকে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে। বাড়তি দরের এলএনজি ব্যবহারে শুরুতেই দেশের শিল্প উদ্যোক্তারা অনীহা প্রকাশ করেছে। আমদানিনির্ভর এলএনজির দাম বর্তমান গ্যাসের দামের চেয়ে অনেক বেশি পড়বে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত এক বৈঠকে ব্যবসায়ীরা এলএনজির কারণে গ্যাসের দরের পরিবর্তনে শিল্পবাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানান।

বর্তমান আবিষ্কৃত মজুদ গ্যাস ২০৩০-এর মধ্যে শেষ হবে বলে ধারণা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তখন নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া না গেলে পুরোপুরিভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে হবে। সরকার বর্তমানে মহেশখালীতেই তিনটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করছে। এর বাইরে কুতুবদিয়ায় আরও দুটি স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা এলএনজি টার্মিনালের প্রতিদিনের ক্ষমতা হবে তিন হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বাইরে পায়রাতেও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে সরকারের। অর্থাৎ সরকার মনে করছে ভবিষ্যতে দেশের চাহিদার বড় অংশই আমদানি করতে হবে।

দেশে গ্যাসের মজুদ এবং ব্যবহারের হিসাব বিবেচনা করলে এলএনজি আমদানির কোনো বিকল্প নেই। পেট্রোবাংলাই বলছে, ২০২০-এর পর থেকে দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া না গেলে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের মজুদ গ্যাস শেষ হয়ে যাবে। সরকার বর্তমানে গ্যাসের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশের স্থলভাগে নতুন গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ সেক্ষেত্রে সাগরে অনুসন্ধান শুরু করা উচিত। তবে এক্ষেত্রে সরকার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দর পড়ে যাওয়ায় সাগরে বিশাল ব্যয়ে অনুসন্ধানে আগ্রহী হচ্ছে না বহুজাতিক কোম্পানিগুলো।

এলএনজি আমদানি ছাড়াও গ্যাস খাতের মহাপরিকল্পনায় আমদানিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সরকার চেষ্টা করছে ত্রিদেশীয় গ্যাস পাইপলাইন (টাপি) ইরান-পাকিস্তান এবং ভারতের পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ ছাড়া মিয়ানমার থেকেও গ্যাস আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, দেশে অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনে গুরুত্ব না দিয়ে সরকার আমদানির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। এটা ভালো লক্ষণ নয়। দেশের সমুদ্র ব্লকগুলোসহ অফশোর, অনশোর বা স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বেশি জোরদার হওয়া উচিত। পুরোপুরি আমদানিনির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে