ঢাবি শিক্ষক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ

  সানাউল হক সানী

১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৩:৫০ | প্রিন্ট সংস্করণ

২০০৯ সাল থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি অনেকটা একক নিয়ন্ত্রণে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যবিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের। কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, অন্য অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও আরেফিনপন্থি শিক্ষকরাই ছিলেন উপাচার্য। আওয়ামী ঘরানার প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজন শিক্ষক ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু দায়িত্বে থাকলেও কালক্রমে সবাইকেই ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নিতে হয়। কোণঠাসা হয়ে পড়ে অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদপন্থিদের বলয়। তবে অনেক দিন পর অতিসম্প্রতি নতুন মেরুকরণ ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজনীতিতে। গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। পাশাপাশি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যরাও এ বলয়ের। আর এসব নিয়োগের পেছনে কলকাঠি নাড়েন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদসহ দীর্ঘদিন ঢাবি ক্যাম্পাসের কর্তৃত্বের বাইরে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা।

এদিকে অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের বিদায়টা সুখকর হয়নি। ঈদের দুদিন পর হঠাৎ করেই ঘোষণা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্যের নাম। যদিও আরেফিনপন্থিদের দাবি, উপাচার্যের বিষয়টি হাইকোর্টে বিচারাধীন। এ ছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩ অধ্যাদেশের।

অন্যদিকে নতুন উপাচার্য দায়িত্ব পাওয়ার পর আর কালক্ষেপণ করেননি। দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আরেফিন সিদ্দিকের অনুরোধ উপেক্ষা করে এবং তার অনুপস্থিতিতে। এ নিয়ে ক্ষোভ-আক্ষেপ রয়েছে আরেফিন সিদ্দিকের। আমাদের সময়ের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, নতুন উপাচার্যকে অনুরোধ করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস খোলার পর দায়িত্ব গ্রহণ করতে। কিন্তু তিনি এই অনুরোধটুকু রাখতে পারেননি। এমন কা- করেছিলেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী। নতুন উপাচার্যের প্রতি কোনো পরামর্শ রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আর কি পরামর্শ থাকবে! এর পর তিনি যোগ করেন, তবু তার প্রতি অনুরোধ, তিনি যেন সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে চলেন। সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালন করেন।

নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান ইচ্ছাকৃতভাবে দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করেননি দাবি করে বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণ একটি কঠিন কাজ। অনেক কিছুর সমন্বয় করতে হয়। সময়েরও স্বল্পতা রয়েছে। এর পরও দুদিন দেরি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বিদায়ী উপাচার্য হয়তো কোনোপ সৎ উদ্দেশ্যেই আমাকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সময়স্বল্পতা ও নিয়মের কারণে দেরি করতে পারিনি।

নীল দলের বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেওয়াজ অনুযায়ী, বিদায়ী উপাচার্য নতুন উপাচার্যকে দায়িত্বভার বুঝিয়ে দেন। অবশ্য ২০০১ সালে অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকাবস্থায় রাতের বেলা দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখেও পড়েন তিনি। ড. আখতারুজ্জামানের দায়িত্ব গ্রহণ নিয়েও ইতোমধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগের একদিন পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১ সিনেট সদস্য বর্তমান উপাচার্য নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩-এর অধ্যাদেশ লঙ্ঘন হয়েছে বলে দাবি করেন। তারা বলেন, এভাবে উপাচার্য নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্ত্বশাসনের ওপর আঘাত। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি হলের প্রাধ্যক্ষ ও প্রক্টর বডি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এতে আবাসিক হল এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে ভঙুর অবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে বর্তমান উপাচার্যের সঙ্গে কাজ করতে নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর নতুন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হলের প্রাধ্যক্ষদের নিয়ে জরুরি মিটিং করেন। এর পর সবাই বর্তমান উপাচার্যের সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হন। অবশ্য বেশ কয়েকজন প্রাধ্যক্ষ এর আগে নতুন উপাচার্যকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে শুভেচ্ছাবিনিময় করেন। বলতে গেলে দীর্ঘদিন ধরে আরেফিন সিদ্দিকের দখলে থাকা সা¤্রাজ্য পদ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই ধসে পড়েছে।

আট বছরেরও বেশি সময় উপাচার্যের দায়িত্ব পালনকালে কয়েকশ শিক্ষক নিয়োগ দেন আরেফিন সিদ্দিক। এসব ক্ষেত্রে দলগত পরিচয়ের বাইরে ব্যক্তিগত পছন্দকেই গুরুত্ব দেওয়া হতো বলে অভিযোগ ছিল তার বলয়বিরোধী শিক্ষকদের। তবে নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষকের তেমন কাউকেই আরেফিন সিদ্দিকের দুর্দিনে তার পাশে দেখা যায়নি। শুধু বর্তমান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্লাহসহ নীল দলের গুটিকয়েক শিক্ষক তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত তরুণ শিক্ষকরা প্রায় সবাই আখতারুজ্জামানের পক্ষ নিয়েছেন। আর দীর্ঘদিন ধরে আরেফিনবলয়ের বাইরের শিক্ষকরা উৎসবমুখরতায় বরণ করে নিয়েছেন আখতারুজ্জামানকে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অকারণে যারা আরেফিনের পাশে বসে থাকতেন বলে কথিত আছে, তারাও তার পক্ষ ত্যাগ করেছেন। সবাইকে নতুন উপাচার্যের অফিস কক্ষ ও বাসভবনে দেখা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক আমাদের সময়কে বলেন, যোগ্যতার মাপকাঠিতে শিক্ষক নিয়োগ দিলে আরেফিন সিদ্দিকের এমন অবস্থা হতো না। এখন তার পাশে কেউ নেই। অযোগ্যদের তিনি শিক্ষক বানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় পদ দিয়েছেন। তবে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কলা অনুষদের এক শিক্ষক আমাদের সময়ের সঙ্গে আলাপকালে জানান, উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক। তাই তাকে স্বাগত জানিয়েছি। সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয় জুনিয়র শিক্ষকদের। শিক্ষকরা গ্রুপিংয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ আরও ভালো হতো।

নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান সবাইকে নিয়ে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। আমাকে অনেকে অপছন্দ করতে পারেন, এটিই স্বাভাবিক। এর পরও সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের হারানো গৌরব ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে আমার প্রচেষ্টায় কোনো ত্রুটি থাকবে না। এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা কামনা করছি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে