রোহিঙ্গা সমস্যা : সংকটকালে ঐক্য চাই

  আবুল মোমেন

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:৩৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সবচেয়ে পরীক্ষিত বিশ্বস্ত বন্ধু দেশ ভারতের ভূমিকায় বাংলাদেশের রীতিমতো বিপন্নবোধ করার কথা। জনগণ ও সরকার উভয়ের জন্য এটাই বাস্তবতা। আর বাংলাদেশের উন্নয়নযজ্ঞের এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশীদার চীনের ভূমিকা আরও হতাশাজনক। রাশিয়া ঐতিহাসিকভাবেই জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র, কিন্তু তারাও এ ইস্যুতে চীনের পাশেই থাকছে। চীন ও ভারতের নিজস্ব স্বার্থ বা এজেন্ডা আমাদের অজানা নয়, কিন্তু তাই বলে মোদি তার ইয়াঙ্গুন সফরে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা ও বাংলাদেশের ভোগান্তির কথা একেবারেই ভুলে যাবেন? তিনিই তো দাবি করেন তার সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সর্বকালের সর্বোত্তম অবস্থায় রয়েছে। আর চীনের রাষ্ট্রপ্রধান মাস কয়েক আগে বাংলাদেশ সফরে এসে কেবল বিরল মানের সংবর্ধনাই পাননি, তিনি নিজেও সহযোগিতার অনেক বড় অঙ্কের প্রতিশ্রুতিও দিয়ে গেছেন।

মোদির নেতৃত্বাধীন ভারত শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ইস্যুতে উদ্বেগ জানালেও তা যে মিয়ানমারের সু চির সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারের ওপর কোনোই প্রভাব ফেলবে না তা সবাই জানেন। মিয়ানমারও জানবে এটা ভারতের মুখরক্ষার কূটনীতি। চীন তো নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দিয়ে মিয়ানমারের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা সম্ভবত মুখরক্ষার কূটনীতিরও তোয়াক্কা করে না। চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বা আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনকে কিছুটা অনুকূলে আনার জন্য কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। বিএনপির অভিযোগের সঙ্গে সুর না মিলিয়েও বলতে হবে এ ইস্যুতে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা আশানুরূপ দক্ষতা ও সামর্থ্য দেখাতে পারেনি। আমরা মানবিক সাহায্যের বিষয়টি ভালোভাবে তুলে ধরতে পেরেছি। শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক ও সাহায্য সংস্থার প্রতিনিধিদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেছেন এবং সবার সহযোগিতাও চেয়েছেন। তাতে কিছু সুফল তো অবশ্যই এসেছে। তবে এ সমস্যা আরও নতুন আবর্তে ঘুরপাক খাবে।

মিয়ানমারের ‘বাঙালি খেদাও’ নীতি অনেক পুরনো। স্বাধীনতার আগেই (মিয়ানমার বা তৎকালীন বর্মা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিল ১৯৪৮ সালে) ১৯৪২-৪৩ সালে তৎকালীন বর্মি সরকার ও একশ্রেণির উগ্র জাতীয়তাবাদী বর্মি তখন ব্যাপকহারে বাঙালি নিধন শুরু করেছিল। তখন এক দফা খুন-জখম চলেছে এবং ব্যাপকহারে দেশত্যাগ করেছিল হিন্দু-মুসলমান বাঙালিমাত্রই। তবে আকিয়ার মংডু অঞ্চলে প্রধানত মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসতি যেমন পুরনো তেমনি ধারাবাহিক। এদের অধিকাংশই ধর্মে মুসলমান, ভাষাগত দিক থেকে তারা দক্ষিণ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক উপভাষায় কথা বলে এবং সে অর্থে বাঙালি। একইভাবে কক্সবাজার, বরিশাল, পটুয়াখালীতে বসবাসরত রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ আদতে বর্মি, তাদের উৎসভূমি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য, আজ যে অঞ্চলটির মুসলমান অধিবাসীরা আক্রান্ত এবং বিতাড়িত হচ্ছে। এও আমরা জানি, আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত বেশ কয়েকটি জাতিগোষ্ঠীর আগমন ঘটেছে মিয়ানমার থেকেই। কিন্তু কয়েক শতাব্দী ধরে বসবাসের ফলে তারা আজ এদেশের নাগরিক, ভূমিপুত্রের মর্যাদাও পাচ্ছে।

যেহেতু প্রাচীন ও মধ্যযুগে বিশ্বের সর্বত্র ব্যাপক অভিবাসনের ঘটনা ঘটেছে এবং আধুনিককালেও নানা কারণে বিশ্বের নানা দেশে অভিবাসন চলছেই তাই আধুনিক কোনো রাষ্ট্র আর একক জাতির সমন্বয়ে গঠিত নয়। মিয়ানমার নিজেও এক জাতির দ্বারা গঠিত নয়, সেখানে শতাধিক জাতির বসবাস, স্বীকৃতি পেলে হয়তো এর অন্যতম জাতি হতো রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। কিন্তু বর্তমানে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তাদের অবস্থান সম্পূর্ণ নেতিবাচক। মিয়ানমার সেনাবাহিনী দেশটির দশ লক্ষাধিক রোহিুঙ্গা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে দেশছাড়া করতে বদ্ধপরিকর বলে মনে হচ্ছে। এর জন্য তারা খুন, জখম, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, সম্পত্তির ধ্বংস সাধন, ভীতি প্রদর্শনÑ সব রকম অপরাধই অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে। আর শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি ও তার সরকার চোখ বুজে এসব অস্বীকার করে সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী জঘন্য সব অপরাধের স্বীকৃতি দিয়ে চলেছে। এটাই অবশেষে বিশ্ববাসী এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশকে বিচলিত করেছে ও ধীরে ধীরে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে।

তবে এই সমস্যা বাংলাদেশকে অন্য একটা জটিলতার দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা ধর্মে প্রধানত মুসলিম, দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, অশিক্ষা, বঞ্চনা ও নির্যাতন তাদের তরুণদের একাংশের মধ্যে চরমপন্থি জঙ্গি মনোভাবের জন্ম দিয়েছে। এটাই এ ধরনের পরিস্থিতির ভয়ের দিক, যা খোদ সু চি তার নোবেল বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কোনো জনগোষ্ঠী যদি দীর্ঘদিন বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার হয় তবে তাদের মধ্যে যে হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম হয় তা চরমপন্থার জন্ম দিতে পারে। আজ তার দেশে যখন এমন ঘটনাই ঘটছে তখন সেই সু চিই কিনা নিপীড়নকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তবে এ পরিস্থিতির নতুন জট হতে পারে প্রথমত মুসলিম বিশ্বের নতুন নেতার ভূমিকা গ্রহণে আগ্রহী তুরস্কের নির্যাতিত রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর কারণে। কারণ তুরস্কের এরদোগান সরকার নিজেই স্বদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত। এ ছাড়াও অতীতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি নানা ইসলামি সংগঠন মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠীকে অর্থায়ন করে থাকে। আবার পুঁজিবাদী পশ্চিমের বাজার অর্থনীতির কারণেও সেসব দেশের সরকারের বাইরে স্বাধীনভাবে অনেক সংস্থাই পৃথিবীর দেশে দেশে যুদ্ধাবস্থা বজায় রাখার জন্য কাজ করে থাকে। কারণ তাদের অর্থনীতির মেরুদ- হলো অস্ত্র ব্যবসা, বিশেষত যেসব নাশকতা অস্ত্র ও ছোটখাটো যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশকে এদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। কারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা সশস্ত্র বিপ্লব বা জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকছে তারা মুখিয়ে থাকবে এ ধরনের সহযোগিতার জন্য।

আগামী দিনগুলোয় সরকারকে এ ইস্যুটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কূটনৈতিক তৎপরতা, মানবিক ত্রাণ কার্যক্রম এবং মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক ভূমিকার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। আমাদের লক্ষ্য থাকবে শরণার্থীদের প্রাথমিক ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত তাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা। সে পথে সরকার কাজ করছে বলেই মনে হয়।

ভালো হয়, যদি এ ইস্যুতে দেশের সব রাজনৈতিক দল নিজ নিজ দলীয় অবস্থান ভুলে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একযোগে কাজ করতে পারত। বাংলাদেশে এমন বাস্তবতা আমরা এখনো কল্পনা করতে পারি না এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের মূল দায়িত্ব অবশ্য সরকারের। তবে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী এদেশের অপর বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতৃত্বকেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। দেশের সংকটকালে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের মনোভাব অর্জন যে কোনো দেশপ্রেমিক দল ও নাগরিকের কর্তব্য।

আবুল মোমেন : কবি ও প্রাবন্ধিক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে