সুস্থির ধৈর্যময় সমাজ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি

প্রকাশ | ০৬ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০১৭, ০১:২২

অজয় দাশগুপ্ত

আজকাল সুযোগ পেলেই গুজব ছড়ানো হয়। এই গুজবের কারণে কত কী যে ঘটে। কতজনের সর্বনাশ হয়ে যায়। এমনকি জীবনহানিও বিচিত্র নয়। তার পরও গুজব বন্ধ হয় না। একটা সময় ছিল যখন গুজব রটালে সেটা সত্য না মিথ্যা তা বের করার আগেই ঘটনা অন্যরূপ ধারণ করতে পারত। এখন আমাদের সঙ্গে মিডিয়ার যোগ নিবিড়। চাইলেই আপনি মিনিটে মিনিটে নিজেকে আপডেটেড করতে পারেন। অনলাইন পোর্টালগুলোর পাশাপাশি মুদ্রিত কাগজেরও সেসব সুযোগ আছে। তারাও আপডেট করেন দিনরাত। তার পরও আমাদের সমাজে গুজবের কমতি নেই। সামাজিক মিডিয়া নামের যেসব অনলাইন মাধ্যম সেগুলো একদিকে যেমন জাতি ও জনগণের উপকার করছে, আরেকদিকে আছে তার ভয়াবহ রূপ। বাংলাদেশে এখন খোলা মিডিয়ার স্বর্ণযুগ। যেভাবে পারছে মত দিচ্ছে। এতেও আপত্তি নেই। আপত্তি তখনই যখন সবাই সবকিছু নিয়ে কথা বলে।

আমরা এর কত রকম আপদ দেখলাম। ফেসবুকে অপপ্রচারের কারণে শ্যামল কান্তি ইস্যুতে দেশ কেঁপে উঠেছিল। বেচারা শ্যামল কান্তির কানে ধরা ছবি এ জাতিকে এখনো কলঙ্কে ডুবিয়ে রেখেছে। একটি শিশুকে কীভাবে তার বন্ধুরা মেরেছিল সে ভিডিও দেখে কিছুদিন ঘুমাতে পারিনি। এমন অজস্র ঘটনা আছে চারপাশে। আমাদের সমস্যা এমনিতেই অন্তহীন। এখন চলছে রোহিঙ্গা সমস্যা। এরা কখন বিদায় হবে, আদৌ হবে কিনা কেউ জানে না। প্রধানমন্ত্রী একা লড়ছেন বিদেশে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, যতদিন জাতি খাবে ততদিন তারাও অভুক্ত থাকবে না। কথাটা আবেগের। সঙ্গে পরিকল্পনাও আছে নিশ্চয়। কিন্তু দেশে সমস্যার মুখ আরেকদিকে। প্রধান বিচারপতি ছুটিতে গেছেন, কেন গেছেন সেটা আমরা জানব কীভাবে? আমাদের জানা উচিত সত্য। সে সত্য জানা যে কী কঠিন সেটা আমাদের চেয়ে ভালো কেউই জানে না। একটা কথা তো ঠিক রাষ্ট্রীয় কাজে যারা নিয়োজিত তাদের ওপর বিশ্বাস রাখতেই হবে। সে বিশ্বাসে চিড় ধরলে আমি, আপনি প্রশ্ন করতেই পারি। কিন্তু গুজব ছড়াতে পারি না।

বলা বাহুল্য সব গুজবের পেছনেই থাকে কিছু স্বার্থ। এখানে আছে রাজনীতি। তা থাক। এমন গুজব নিশ্চয় কাম্য নয়, যাতে সরকার, দেশ বা মানুষ বিভ্রান্ত হয় কিংবা বিপদে পড়তে পারে। আমার ধারণা, এখানে ইন্ধনদাতাদেরও ভূমিকা আছে। তারা যত কম বলবেন তত মঙ্গল। বলে লাভ নেই জেনেও আমাদের নেতারা বলতেই থাকেন। এই বলার ভেতরে যে ফাঁক তাকে পুঁজি করেই গড়ে ওঠে গুজব বলয়। গুজব খবরের চেয়ে শক্তিশালী। এটা জেনেই গোয়েবলস তার থিওরি অপপ্রচারের মেশিন চালু করেছিলেন। এখন দিন পাল্টেছে। আপনি চাইলে কিছু মানুষকে অল্প সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে বা অন্ধকারে রেখে মজা নিতে পারেন আখেরে সত্য বেরিয়ে আসবেই। কেন জানি সেই ধৈর্য আর আমাদের ভেতর কাজ করে না। চটজলদির এই যুগে সবাই যার যার মতো করে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে বাজারে নাম করতে ব্যস্ত। আমি বলি মিডিয়ার ভূমিকাও স্বচ্ছ আর সরল হতে হবে। পাশের দেশ ভারতে দেখুন, খোদ পশ্চিমবঙ্গেও তারা নেগেটিভ খবরকে খুব একটা পাত্তা দেয় না। ছোটখাটো ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে যায় অথবা খুব স্বাভাবিকভাবে প্রচার করে। তাদের মতে, এতে জনগণের মনোবলে ভাটা পড়ে না। জনগণ এসব কারণে মুষড়ে পড়ে না। আর আমরা? একটা ভবন ধসে পড়লে বা ধসার আগেই তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। কখন কেউ মরবেন বা কখন কোন বিপজ্জনক জায়গায় থাকা মানুষকে দেখিয়ে মিডিয়ার হিট বাড়াব। এর নাম আর যাই হোক মানবতা বা মানবিক আচরণ হতে পারে না। আমরা ভুলে যাই আমাদের সাধ্য ও শক্তি অনুযায়ী সমাধান হবে। আমি, আপনি হাজার লেকচার দিলেও আসল সমাধান পাব না।

উন্নয়ন ও অগ্রগতির একটা বড় বিষয় সচলতা। বড় ধারণা নিজেদের নিরাপদ ভাবা। এটা যদি ভঙ্গ করা হয় তো কোনো জাতি তার পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে শিখবে না। কথায় কথায় মতপ্রকাশ আর নিজেদের জাহির করা এমন এক জায়গায় যা কিছুকেই ছাড় দিচ্ছে না। দেশে এত বিপদের মুখে একটা সুন্দরী প্রতিযোগিতা হয়েছিল। ব্যস শুরু হয়ে গেল মারামারি আর মত দেওয়ার নামে উগ্রতা।

প্রথমত, বিশ্বসুন্দরী নাম দিয়ে মেয়েদের প্রতিযোগিতায় নামানোর উদ্দেশ্যই ধোঁয়াশা। সে কথায় পরে আসছি। এবারের মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ হওয়া মেয়েটি মানে জান্নাতুল নাঈম বিষয়ে এখন চলছে নানা ধরনের প্রচার-অপপ্রচার।

অবশেষে তর্ক-বির্তকের পর গত বুধবার জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলের কাছ থেকে মুকুট চলে যায় জেসিয়া ইসলামের মাথায়।

বলা হচ্ছে আরেকজনের সঙ্গে নাম গুলিয়ে ফেলায় ভুল মুকুট উঠেছিল জান্নাতুল নাঈম মাথায়। তথ্যসহ বলা হচ্ছে সে ছিল মিসেস। গোলমালটা সেখানে। পুরুষ দশবার বিয়ে করলে, বিয়ে না করলে করে ছেড়ে দিলেও সারাজীবন মিস্টার। আর মেয়েরা? মিস মিসেস এমএস, কেন বাপু?

তো সে এসেছে চন্দনাইশ থেকে, যে এলাকায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় জামায়াত আর মৌলবাদ পয়দা হয়। তাদের এলাকার এমপি কর্নেল অলি সাহেব ফুলে বসা অলি নন। রাইফেলের বাঁটে বসা তিনি জানলে নাভিমূল উন্মুক্ত মেয়েটিকে আস্ত রাখবেন না। এসব বাদ দিয়ে কেন তার বাল্যবিবাহ নিয়ে হৈচৈ? তা ছাড়া ছাড়াছাড়ির পর সাবেক মিসেস তো মিসই, নাকি?

তবে এসব সুন্দরী সুন্দরী খেলা আসলে বাণিজ্য। যখন এগুলোর নামও শুনিনি তখন উপমহাদেশে মীনা কুমারী, নার্গিস, বৈজয়ন্তী মালা, সুচিত্রা সেন, হেমা মালিনী, কবরী, ববিতারা ছিলেন। যখন বাজার ও বিপণনের দরকার পড়ল ফটাফট ভারতের রমণীরা মিস অমুক মিস তমুক বনে গেলেন। তার পর বহুজাতিকের পণ্য গালে-মুখে মেখে তাদের ভাষায় আরও সুন্দরী হওয়া এদের ফেলে কর্তারা ছুটলেন লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায়। ওখানকার বাজার হাতছাড়া হলে চলে?

এসব দিকে খেয়াল নেই কারো। অবশেষে জান্নাতুল নাঈম এভ্রিলের খেতাব বাতিল হলো। এ নিয়ে কত কিছু হবে। কোনো বিষয়ে আমরা চুপ থেকে বিষয়টাকে উপভোগ করা বা তাকে তার মতো করে চলতে দিতে রাজি নই। এর নাম কি সুস্থতা? আমরা যদি সুস্থ জাতি হতে চাই তবে এর অবসান ঘটাতে হবে। আগে যেমনটা ছিলÑ কেউ বলতেন, কেউ শুনতেন। কেউ তর্ক করতেন, কেউ যুক্তি দিতেন। কেউ গাইতেন, কেউ বাজাতেন। কেউ ভাষণ দিতেন, কেউ লিখতেন। এখনকার মতো সবাই সবকিছু করতেন না বলেই আমরা স্থির ও প্রজ্ঞাবান জাতি হিসেবে উঠে আসছিলাম। সে পথ রুদ্ধ হলে কারো মঙ্গল হবে না। গুজব অতিকথন আর প্রগলভতামুক্ত সমাজের জন্য চুপচাপ ধৈর্যময় সহনীয় সমাজের নেতারা আজ কোথায়? কোথায় শিল্প-সংস্কৃতি? যা মানুষকে পরিমিতি শেখায়? আমরা নিশ্চিত জানি আমাদের ভেতরেই আছেন তারা। তাদের সামনে আনলেই মুক্তি। অন্যথায় আমরা কোথায় ভেসে যাব ভাবতেও ভয় হয়।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক