খাঁচার পাখিতে প্রচুর সম্ভাবনা

  মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

০৭ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাখি প্রকৃতি পরিবেশের অলঙ্কার। প্রকৃতির প্রাণ। পাখির কিচিরমিচির ডাক। শুনতে ভালো লাগে। আগে গ্রামগঞ্জে কত পাখি ছিল। পাখির ডাকে ঘুম ভাঙত। দোয়েলের শিস, মাছরাঙার ছোঁ মেরে পানি থেকে মাছ তোলা, বউ কথা কও পাখির মিষ্টি ডাক, টুনটুনির নিপুণ শিল্পকর্ম তার বাসাÑ এসবই সবার খুব ভালো লাগত। পাখি প্রকৃতিতে নতুন রূপ দিত। মানুষ প্রাণভরে তা উপভোগ করত। দিন বদলে গেছে। এখন এসব ধূসর স্মৃতি। প্রকৃতিতে দেশি পাখির সংখ্যা খুব কম। অনেক পাখি হারিয়ে গেছে। আর যা আছে, তারও অনেকটাই হুমকির মুখে। তাহলে কি নতুন প্রজন্ম পাখি দেখবে না। এতক্ষণ যেসব পাখির কথা বললাম। সেগুলো হলো বন্য পাখি। মুক্তভাবে বনে থাকে। সেখানে বাসা করে। ডিম পাড়ে। বাচ্চাকেও মুক্ত পরিবেশে বড় করে। আরেক ধরনের পাখি আছে। যাকে বলা হয় কেইজ বার্ড বা খাঁচার পাখি। খাঁচার পাখি সারা বিশ্বেই খুব জনপ্রিয়। বাজেরিগার, লাভবার্ড, ডোভ, ফিঞ্চ, ককাটিয়েল, ম্যাকাও, সান কৌনর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য খাঁচার পাখি। ধরা যায়। পোষ মানানো যায়। খুব কাছ থেকে দেখা যায়। জীবনযাত্রা খুব বৈচিত্র্যময়। দেখতে খুব সুন্দর। পালন করা সহজ। ব্যবসায়িকভাবে পালন ও লাভজনক। খাবার-দাবার সহজলভ্য। অল্প জায়গায় পালন করা যায়। এসব হলো খাঁচার পাখিগুলোর জনপ্রিয়তার কারণ। খাঁচার মধ্যে এসব পাখি ডিম পাড়ে। বাচ্চাকে বড় করে তোলে। বক্স বা হাঁড়ি, ঝুড়ি, ফুল ঝাড়– দিলেই হয়। ওরা বাসা তৈরি করে। তার পর ডিম পাড়ে। বাংলাদেশে যারা খাঁচার পাখি পোষে। তাদের অধিকাংশ বয়সে তরুণ। অনেক তরুণের আয়ের উৎস এসব পাখি। অবসরপ্রাপ্ত চাকুরে কিংবা ঘরের গৃহিণী। তাদের সম্পৃক্ততাও আছে পাখি পালনে। বাংলাদেশে ব্র্রিডাররা দুর্লভ প্রজাতির পাখি উৎপাদনে সফল হয়েছেন। পাড়া-মহল্লা, শহরে অসংখ্য পাখির দোকান গড়ে উঠেছে। জেলা শহরগুলোয় পাখির হাট বসে। নীমতলী, কাঁটাবনে কোটি টাকার পাখি স্টক থাকে বলে জানা যায়। পাখির খাবার, পাখি, পাখির খাঁচা বিক্রি, ওষুধপত্র বিক্রি অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস। দেশি ওষুধ কোম্পানিগুলো পাখির ওষুধপত্র বাজারজাত করে। বিদেশ থেকে কিছু ওষুধপত্র আমদানি হয়। সরকার রাজস্ব পায়।

শুধু খাঁচার পাখি পালন করেন। সফল হয়েছেন। সংসার চালাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস খাঁচার পাখি। এমন কয়েকজন হলেনÑ নওগাঁর মশিউর রহমান, নারায়ণগঞ্জ-রূপগঞ্জের অপু, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের টুটুল সেন, ঠাকুরগাঁওয়ের আবুল কালাম আজাদ, দিনাজপুরের আলী আকবর ও ময়বুর আলম, যশোরের মতিয়ার রহমান, খাগড়াছড়ির দীঘিনালার থানাপাড়া গ্রামের জাহেদুল ইসলাম। জাহেদুল শুধু পাখি পালনেই সফল হননি। তিনি স্বল্প খরচে তৈরি করেছেন ইনকিউবেটর (পাখির ডিম ফোটানোর যন্ত্র)। মাত্র ৭ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত তার ইনকিউবেটরে ১০০ ডিম দিলে ৮৪টি বাচ্চা সফলভাবে ফুটেছে বলে তিনি জানান।

খাঁচার পাখি রপ্তানি বন্ধ আছে। ফলে খামারিরা ভালো পাখি রপ্তানি করতে পারছেন না। সঠিক দাম পাচ্ছেন না। আবার যারা প্রচুর পাখি উৎপাদনে সক্ষম। এমন ব্রিডার হাত গুটিয়ে বসে আছেন। উৎপাদন বাড়ালে বাড়তি পাখি বিক্রি করবেন কোথায়। শাকসবজি, ফলমূল রপ্তানিতে যত রকম চ্যালেঞ্জ ফেস করতে হয়। পাখির বেলায় ততটা নেই। বিদেশিরা বাংলাদেশি পাখি খামারিদের সঙ্গে চুক্তি করেও পাখি নিতে পারেন। এতে পাখির মান নিয়ে প্রশ্ন থাকবে না।

সরকার পশুসম্পদ খাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। এর থেকে সামান্য পরিমাণ অর্থ যদি এ খাতে ব্যয় করত। একটু সঠিক গাইডলাইন দিত। পাশাপাশি রপ্তানি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তাহলে খাঁচার বিদেশি নানারকম পাখি রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। খাঁচার পাখি বেকারত্ব দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে বর্ডার দিয়ে প্রচুর পাখি পাচার হচ্ছে। প্রায়ই বিজিপির হাতে আটক হয় বিভিন্ন রকম পাখি। পাচারের কারণে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। পাখি পালনের সামাজিক সুফল বহুমাত্রিক। যুবক, তরুণ যারা পাখি পালনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের সময় ভালো কাটে। বিপদগামী তারা কমই হয়। তাই খাঁচার পাখির প্রতি সরকারি সাহায্য-সহায়তা প্রদান সময়ের দাবি।

য় মুহাম্মদ শফিকুর রহমান : বন, পরিবেশ ও পাখিবিষয়ক লেখক

Safiq69@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে