রোহিঙ্গা তো বললেন পোপ, এবার

  ড. কাজল রশীদ শাহীন

০৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:৩৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

অবশেষে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ উচ্চারণ করেছেন পোপ ফ্রান্সিস। এশিয়া সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যময় ঘটনা এটি। বিশ্ব মিডিয়ার সতর্ক দৃষ্টি ও কৌতূহল ছিল এ ব্যাপারে। মিয়ানমার সফরে পোপ রোহিঙ্গা শব্দটা উচ্চারণ না করায় কৌতূহল যায় আরও বেড়ে। এই সতর্ক দৃষ্টি ও কৌতূহলেও স্পষ্ট যে, পোপের রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণের রয়েছে সবিশেষ গুরুত্ব। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পোপ যখন রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ করলেন, রয়টার্সের কল্যাণে তাবৎ মিডিয়ার ব্রেকিং নিউজে যখন জানাজানি হলো বিষয়টা, তখন এটাকে কেউ কেউ ততটা গুরুত্বপূর্ণ ঠাহর না করার চেষ্টা করলেন। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের উল্লম্ফন, ত্যাছড়া ও তির্যক মন্তব্য দেখেছি। পোপের রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ কেন গুরুত্বপূর্ণ ‘কয়েন ওয়ার্ড’ ‘কি স্বরূপ’ এবং এর পর করণীয় কী আমাদের, তাই নিয়েই এই লেখা।

১. পোপের এশিয়া সফরের সর্বশেষ গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ। তিনি মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। বিষয়টা যদি উল্টো হতো, তা হলে কেমন হতো। উল্লেখ্য, সফরের আগেই পোপ ফ্রান্সিস রোহিঙ্গাদের নিয়ে বলেছেন। বিষয়টা সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন এবং সেটা যে সর্বান্তকরণে তা তার দেওয়া বক্তব্যেই খোলাসা হয়েছে। এখন পোপের করণীয় ছিল, আগে বাংলাদেশ সফর করা। সরেজমিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় যাওয়া। নিদেনপক্ষে একটা ক্যাম্প পরিদর্শন ও শরণার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করা। বাস্তব এই অভিজ্ঞতার পর তিনি যদি মিয়ানমারে যেতেন তা হলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জোর অভিমত, পরামর্শ ও নির্দেশনা দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তেমনটা করেননি। এমনকি মিয়ানমার সফরকালে একটিবারের জন্যও উচ্চারণ করেননি রোহিঙ্গা শব্দ। তিনি যে নিজে থেকে এমনটা করেননি, তা না বললেও বুঝতে বেগ পেতে হয় না। কারণ তিনি দেশটির খ্রিস্টান নেতাদের পরামর্শেই শব্দটা উচ্চারণ থেকে বিরত থেকেছেন। তারা মনে করেন, পোপ সেটা আওড়ালে সু চি নাখোশ হবেন, গোস্বা করবে মিয়ানমার সরকার। রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ করা না করায় যে আকাশ-পাতাল ফারাক রয়েছে, এই নাখোশ-গোস্বাতে তো সেটাই প্রতীয়মান হয়, নাকি?

২. মিয়ানমারে রোহিঙ্গা উচ্চারণ না করায়, বাংলাদেশে কী হবে, সে নিয়ে ছিল অপরিসীম ঔৎসুক্য। কারণ এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিকীকরণের একটা ব্যাপার রয়েই গেছে। অবশেষে ঢাকা সফরের দ্বিতীয় দিন পোপ রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ শুধু করেননি, অর্থবোধক ও বিশ্বকে নাড়া দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মাঝে ঈশ্বরের উপস্থিতি রয়েছে।’ এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমারকে তো বটেই তিনি তাবৎ বিশ্বকেই জানিয়ে দিলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি এই অত্যাচার-নির্যাতন-ধর্ষণ খুনে ঈশ্বরকেই কালিমালিপ্ত করা হচ্ছে। প্রকৃতার্থেই যারা ঈশ্বর বিশ্বাসী তারা কোনোভাবেই এ কাজ করতে পারে না। যারা এ কাজ করে তারা ঈশ্বরদ্রোহী। আর বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়ে প্রকৃতার্থে ত্রাতার ভূমিকা পালন করছে মানবতার ঝা-া উঁচিয়ে।

৩. রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ করে পোপ রোহিঙ্গা সংকটের আন্তর্জাতিকীকরণকে আরও এগিয়ে নিলেন। আন্তর্জাতিক বিশ্বকে জানালেন, উদ্ভূত সমস্যায় বাংলাদেশ জেরবার হলেও এ সমস্যা সমাধানে অন্যদেরও এগিয়ে আসা জরুরি। মিয়ানমার জাতিগত গণহত্যা চালাচ্ছে। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নৃতাত্ত্বিক হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হচ্ছে এ মুহূর্তে। গুরুত্ববহ এ বিষয়টা পোপের রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ এবং উপযুক্ত বাক্যের মধ্য দিয়ে ভিন্নমাত্রায় হাজির হয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের করণীয়ও বেড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো।

ক. রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আমরা বড়দাগে কী চাই, কী করার মধ্য দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে তা চিহ্নিত করার পাশাপাশি বাস্তবায়নের জন্য ত্বরিত উদ্যোগ গ্রহণ করা। তার আগে প্রয়োজন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা সবার সামনে উপস্থাপন করা। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে কী সম্ভব, এই সমস্যার সমাধান করা? সমাধান যে সম্ভব নয় তা তো প্রতীয়মান হয় মাত্র দুটি ঘটনায়ই। এক. একদিকে চুক্তি স্বাক্ষর হচ্ছে, অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রকল্প পাস হচ্ছে। দুই. চুক্তির পরও রোহিঙ্গাদের আগমন বন্ধ হয়নি।

খ. সরকার কি মনে করে, দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান সম্ভব? যদি হ্যাঁ হয়, তা হলে এতদিন হয়নি কেন? অনেক আগেকার কথা যদি নাও বলা হয়, ’৯২ সালে যারা এসেছিল তাদের ক্ষেত্রে কেন সেটা প্রয়োগ করা যায়নি?

গ. রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ইস্যু হলেও তাবৎ বিশ্ব এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। সরকার বিষয়টাতে আন্তর্জাতিক বিশ্বের অংশগ্রহণও চায়। বাস্তবতা হলো, এই চাওয়া নিয়ে কোনো প্রকার সন্দেহ থাকলেও তাদের অংশগ্রহণ কেমন হবে, কীভাবে হবে, তা সরকারের কাছে স্পষ্ট নয়। সরকার এ ব্যাপারে সবার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে কোনো পথ অনুসন্ধানের চেষ্টা করছে বলেও মনে হয় না। অথচ এটা হওয়া জরুরি ছিল।

৪. রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সবার অংশগ্রহণ কেমন হতে পারে, তা সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। প্রশ্ন হতে পারে সবার সঙ্গে আলোচনাটা কেমনে হবে? এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উপায় হলো, এক বা একাধিক আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করা। দেশ-বিদেশের স্কলারদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে এবং তাদের সুপারিশগুলোর নানামাত্রিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ করে একটা সমাধান সূত্র হদিস করা। যার ভিত্তিতেই নিশ্চিত করতে হবে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান। শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও এই ইস্যুতে হতে পারে একাধিক সেমিনার। যেখানে উপস্থাপন করা হবে প্রকৃত ঘটনা এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ব্যক্তি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে যে বা যারাই অংশগ্রহণ করুক না কেন, তাদের নিশ্চিত করতে হবে প্রকৃত ঘটনা উপস্থাপন করার বিষয়টা। কেননা প্রকৃত ঘটনা এবং ঘটনার পূর্বাপর যদি জানা না থাকে তা হলে প্রকৃত সমাধান মেলে না।

৫. আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণে এবং সমাধানের পথ অন্বেষণে সবার আগে জানা প্রয়োজন রোহিঙ্গাদের অতীত ইতিহাস। তাদের জাতিগত যে ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি রয়েছে সেগুলো আমলে নিতে হবে সবার আগে। পাশাপাশি জানা প্রয়োজন, মিয়ানমারের ইতিহাস। দেশটির ভৌগোলিক ইতিবৃত্ত এবং তাদের ধর্মাচার-রাষ্ট্রাচার ও জীবনাচার সম্পর্কে। মিয়ানমার নামক রাষ্ট্রটির গতিবিধি এবং জনভাবনাও উপলব্ধি করা প্রয়োজন। এগুলো যদি আমরা যথাযথভাবে অ্যাড্রেস করতে পারি, তা হলেই খুঁজে পাওয়া যাবে রোহিঙ্গা সংকটের নেপথ্য ও প্রকৃত কারণগুলো। আর সেটা সম্ভব হলেই সমাধানের পথও খুঁজে পাওয়া যাবে। আর যদি তা না করা যায়, তা হলে সবই হবে অন্ধকারে ঢিল মারার শামিল। যার মধ্য দিয়ে উদ্ভূত এই সমস্যা বাড়বে এবং স্থায়ী রূপ নেবে বৈ বিন্দুমাত্র হ্রাস পাবে না।

৬. রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আমরা এখনো সেভাবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নক করতে পারিনি। এমনকি প্রবাসে আমাদের যে বাঙালিরা রয়েছে তাদের প্রতি এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বা আনুষ্ঠানিক কোনো সহায়তা চাওয়া হয়নি। আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয় আমাদের প্রবাসী আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা যদি জনমত গঠনে বিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে, তা হলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান সূত্রে খুঁজতে কেন নয়?

পোপ ফ্রান্সিসের এবারের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে তৃতীয়বারের মতো ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মীয় আধ্যাত্মিক নেতার আগমন ঘটল বাংলাদেশে। এর আগে ১৯৭০-র প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর এবং এরশাদ জমানায় ১৯৮৮ সালে পোপের আগমন ঘটেছিল। এবারের পোপের আগমন বাস্তবিকই এমন এক সময়ে যখন রোহিঙ্গা সংকটের মতো ভয়াবহ এক সমস্যা আঁতকায় চেপে বসেছে বাংলাদেশের ওপর। এ সমস্যার আশু সমাধান জরুরি, তা না হলে তা নিতে পারে ভয়াবহ এক রূপ। পোপ ফ্রান্সিস তার সফরে রোহিঙ্গাদের অ্যাড্রেস করে বিশ্বকে যেমন জানান দিয়েছে এই সমস্যার দুর্বিষহ ও ভয়ঙ্কর স্বরূপ, তেমনি আমাদের দিয়েছেন সমাধানে কয়েন কিংবা কি ওয়ার্ড। এখন আমরা এই ‘কি’ বা ‘কয়েন’কে কীভাবে, কোন কৌশলে ব্যবহার করব, তা নির্ভর করছে আমাদের ওপর। এই ‘কি’ বা ‘কয়েনে’র যথার্থ ব্যবহার হলেই কেবল মিয়ানমারকে বাধ্য করা সম্ভব হবে নতুবা রোহিঙ্গা সমস্যা যে তিমিরে রয়েছে, সেখানেই রয়ে যাবে। পোপকে ধন্যবাদ। তার ঢাকা সফর আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এখন সেই খোলা চোখেই আমরা রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কতটা করতে পারব, কীভাবে, কোন উপায়ে করা সম্ভব হবে, তার সবটাই নির্ভর করছে আমাদের উদ্যোগ-উদ্যম-গতিবিধি ও সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের ওপর।

কাজল রশীদ শাহীন : সাহিত্যিক, গবেষক ও সাংবাদিক

kazal123rashid@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে