প্রান্তসীমায় দাঁড়ানো প্রাকৃতজনরা

  আজাদুর রহমান

১৭ জুন ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ জুন ২০১৭, ০০:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

পিচ ছেড়ে আমরা মেঠোপথে নেমে যাই। ঘন তুতগাছে ছাওয়া সুড়ঙ্গপথ। ছায়াবনে এঁকেবেঁকে চলার পর ঘাসের পথ। দুপাশে মনমাতানো ইরি ধানের পাথার উথালিপাথালি করতে করতে অন্য গ্রামে গিয়ে ঠেকেছে। সবুজ মাঠের অলি বেয়ে ছুটে যাই। দু-একটা করে সাইকেলসহ বালিকার দেখা মিলছে। এ রকম হদ্দগ্রামে এসে আশ্চর্য না হয়ে উপায় নেই! বালিকারা অবলীলায় সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছে। পাউডারমাখা এক রমণীকে দেখলাম আঁচল টেনে পেডেল মেরে উল্টোদিকে চলে যাচ্ছেন। খোদ শহরে এ রকম দৃশ্য একদাগে সহ্য করা না গেলেও এখানে দৃশ্যটা মানানসই এবং সাদামাঠা। ভেতরের খবর জানি না, তবে দৃশ্যত মেয়েদের সাইকেল চালনায় গ্রাম্যমানুষদের চোখেও কোনো আপত্তি নেই। গর্ত বাঁচিয়ে তালমাতালে এগিয়ে গেলে সাইকেলবালিকাদের ছবিগুলো মাথার ভেতর এলোমেলো হয়ে এক সময় ঢেউয়ে ঢেউয়ে মিলিয়ে যায়। আমি ফের দ্বিতীয় তুতবনের সবুজনলে ঢুকে যাই। এ রকম একটানা তুতনলে চোখে ঘোর লাগে। চারদিকের কিছুই দেখা যায় না। কিলোদুয়েক পর ঝুপড়ি গ্রামের দেখা মেলে। গোলগাল নয়, থ্যাবড়া গ্রাম। ঝিনাইকুড়ির গোড়াতেই সাত-আটটা পিঁড়ালিগাঁথা মাটির ঘর নিয়ে কড়াপাড়া। আলাদা উঠোন আঙিনা খুঁজে না পেয়ে গরুবাঁধা গাছতলায় মোটরসাইকেল রাখতে হলো। কোনটা কার বাড়ি বোঝার উপায় নেই। দাঁড়াতেই এক এক করে ১০-১২ জন মহিলা বেরিয়ে এলেন। রুপালি কড়া চিকন সাইজের কাঠের বেঞ্চ পেতে দিলে আমরা বসে পড়ি। ১২-১৫ জন ন্যাংটো, আধা ন্যাংটো পোলাপান নিয়ে মেয়েলি পরিবেশ। তবে পোলাপানগুলো অত উচ্ছৃঙ্খল নয়। অন্যপাড়ার পোলাপান দু-চারজন জড়ো হলে যেমন গোল বাধায় এরা সে রকম নয়। এরা কোমরে হাত রেখে কোনাকুনি দাঁড়িয়ে থাকে, কথা শোনে। শুরুতে মহিলারা খোলাসা না হলেও সহজ হতে সময় লাগল না। হাসিমুখে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করতেই গল্পগুলো মুখ থেকে মুখে লাফাতে শুরু করল। খানিক পরে লাপল কড়া লাঠির মাথায় ইঁদুর ঝুলিয়ে আমাদের মজমার পাশ দিয়ে পাড়ায় ঢুকে যায়। সুনিয়া সেখান থেকে চোখ ফিরিয়ে হেসে ওঠেÑ আজ মুসা (ইঁদুর) রান্না হবে।

সারা বিরল যখন পূজানন্দে দুর্গা সাজাতে ব্যস্ত, সে সময় কড়ারা মেতে ওঠে কারমাপূজার ডালা নিয়ে। পূজার শুরুতে কলাইয়ের বীজ পুঁতে উপোস করতে হয়। নিজেদের নাম নিয়ে পোঁতা বীজ গজালে তবে উপোসীরা অন্ন নেয়। যার বীজ অঙ্কুরিত হয় না তার ধর্মবিশ্বাস নেই বলে সে অনুমান করে নেয়। এর পর জঙ্গল থেকে খিলকদমের ডাল কেটে এনে মাটিতে পুঁততে হয়। এবার খিলকদমকে ঘিরে ঢোলমাদল বাজিয়ে শুরু হয় ঝুমনাচ। নাচ চলে সারারাত ধরে। তখন পুরো পাড়া দুলতে থাকে হাড়িয়ার নেশায়।

উৎসবের এতসব আগাম রসদ জোগাড় করতে কড়ারা প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে পালা করে গান গায়। ঢোল, করতল, খঞ্জনি, মাদল, বাঁশি, হারমনিসহযোগে নেচে নেচে হাত পাতে। নাচেগানে মুগ্ধ গৃহস্থরা ধান-চাল কিংবা সামান্য টাকা-পয়সা দিলে তারা ফের অন্য বাড়িমুখো হয়। শ্রাবণ মাসের শেষতক কড়াপাড়ার যুবক-যুবতীরা তাই রিহার্সেল শুরু করে। রতনকড়া স্মৃতি হাতড়ায়Ñ ‘নাচগানের জন্যি ট্রেডিং (ট্রেনিং) লাগে, দিনকয়েক রেসিল (রিহার্সেল) করা লাগে।’ কেমন গান হয় জানতে চাইলে কেদুকড়া গা টিপে কৃষ্ণকে ঠ্যালা দেয়। কৃষ্ণ লাজুকমুখে নারাজ হলে বাবলি কড়া ঝামটা মারেÑ ‘কোসনা ক্যানে ক, ভালো করি ক।’ অগত্যা সে নিচুমুখে গান ধরে। প্রথমে গুনগুন করলেও পরে খোলা মনে গাইতে থাকেÑ

কুলি জাগো, আখড়া জাগো

জাগো রাজবংশী রাজ হো

চিরিবিটি চিরিবিটি পার্বতী লো

কুলি জাগো আখড়া জাগো হো।

গান শেষ করে সে আরেক গানে নেমে যায়। আমরা গানের মানের জন্য তর্জমা খুঁজি। কৃষ্ণ তর্জমা করে মানে বুঝিয়ে দেয়। মহত জগেন কড়া বাড়িতে ছিলেন না। মাঠ থেকে তিনিও এতক্ষণে বাড়ি ফেরেন। তার পর মাটিঘরের গলিপথ বেয়ে হেঁটে এলে আসরটা হঠাৎ করে মজে ওঠে। সঙ্গে সুনিয়া, বাবলি এবং সলিনা কড়াও আসে। রতনকড়া বিড়ি ধরালে ছেলেছোকরা বলে আর কোনো কথা থাকে না। সবাই দেদার বিড়ি টানতে শুরু করে। খানিক পরে জগেন রতনের টানা বিড়িটা চেয়ে নেয়। খোলা মনে থেকেও যে মহতকে মান্য করা যায় এখানে না এলে বোঝা যেত না। আধখাওয়া বিড়ি মুখে জগেন পুনরায় গল্প জোড়েন। জীবনের গল্পের সঙ্গে যোগ হয় বিয়ের গল্প। মেয়ে পছন্দ করে কথা পাকাপাকি হলেই দুপক্ষ আনন্দে হাড়িয়া খাওয়া শুরু করে। পনেরো টাকার সঙ্গে সাত শাড়ি, তিন সের ভোজ্যতেল, তিন পুরিয়া সিঁদুর এবং কোমর সাজানোর জন্য ‘ডারিয়া ঝোপা’ কনের হাতে তুলে দিতে হয়। বিয়ের দিন উঠানে পাতার মারোয়া বানাতে হয়। মারোয়া মানে চারখানা কলাগাছ পুঁতে চারটি তীর লাগিয়ে পাতাখড় সুতোয় বেঁধে চৌকোনা টাইপের বর বসার ঘর। মারোয়ার কোনায় খড় দিয়ে মানুষের অবয়ব গড়ে তাতে তীর-ধনুক ধরিয়ে দিয়ে প্রতিমাবিশেষ ‘বাঁদর’ বানানো হয়। প্রতীকী এই বাঁদর টানানো হলে বিয়ের নোটিশ পড়ে যায়।

এবার গাঁয়ের নাপিত এসে বরের ডানহাতের কনিষ্ঠ আঙুলের চামড়া কেটে রক্ত নিয়ে আতপ চালে মিশিয়ে দেয়। তার পর রক্তমাখা আতপ মহুয়াপাতায় পেঁচিয়ে ছেলের হাতে বেঁধে দিলে তবে বরপক্ষ কন্যাবাড়ির পথ ধরে। অন্যদিকে নাপিত কন্যার আঙুলের রক্ত নিয়েও একই কায়দায় পাতা পেঁচিয়ে কন্যার হাতে বেঁধে দেয়। বরপক্ষ কন্যার বাড়িতে সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না। কাছাকাছি আস্তানা ফেলে। এবার বরবরণের পালা। বর এবং কন্যার ভাই পরস্পর নিজেদের দুলাভাইয়ের কাঁধে উঠে পড়ে। বর এবার ভাবী শ্যালকের গলায় গামছা পরিয়ে দেয়। শ্যালক বরকে খিলিপান খাইয়ে গামছা ফেরত নিয়ে নেয়। বর ঘাড় থেকে নেমে জোয়ালের ওপর চলে যায়। কন্যাও উল্টোদিক থেকে জোয়ালে উঠে আসে। তার পর জোয়ালে দাঁড়ানো বর-কনেকে শাড়ি দিয়ে ঘেরা হয়। ঘেরের মধ্যেই বর সিঁদুর পরিয়ে কনের সঙ্গে ক্ষীর খায়।

আদিকালে বসতির শুরুতে কড়াপাড়াটা জলগ্রাম ছিল। বিলেখালে ঝিনুক কুড়িয়ে তাতে কলিচুন আর মুক্তো খুঁজে কড়াদের পূর্বপুরুষদের জীবিকা মিলত বলে লোকে এ তল্লাটের নাম দিয়েছে ঝিনাইকুড়ি। কড়ারা কোথা থেকে এসেছিল, কী তাদের ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করলে এরা অলসতা দেখায়। মলামি কড়া মুখ খুলে যা বললেনÑ ‘হামারা তো বাপ-দাদা থেকে এখানটাতেই আছি।’

লোকবল কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কড়াদের সমাজজীবনেও জোটবদ্ধ উৎসব কমে এসেছে। যে কয়জন আছে তারাও মিশ্রিত হতে শুরু করেছে। কেউ আবার নিজ গোত্রে পাত্রী না পেয়ে ওড়াওদের কোনো মেয়েকে বিয়ে করে সংসারী হয়েছে। ছেলেমেয়েদের সবাই এখন পোলাপান। শিশু থেকে বড়জোর কিশোর-কিশোরী। আগামী দশ বছরে এদের পারস্পরিক বিয়েশাদির কথাও ভাবা যাচ্ছে না। শেষ গোত্রপ্রধান জগেন কড়া পুরনো দিনের কথা ভেবে আফসোস মুখে বসে থাকেন। দেখতে-শুনতে কড়াদের অন্য আদিবাসিদের মতো মনে হলেও কড়াদের নিজস্ব জাতিসত্তা আছে। আঠারো ঘর কড়ার মধ্যে আবার সান্ধোয়ার, মেরম, তামগেড়িয়া, হারদী, কাচ এবং চিড়– ইত্যাদি উপবংশ আছে।

জগেন কড়া কী পারবে তার গোত্রকে জাগিয়ে রাখতে নাকি সময়ে বিলীন হয়ে যাবে মাটি আর প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা প্রাকৃতজনরা।

য় আজাদুর রহমান : গবেষক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে