সন্তান লালনে বাবা-মায়ের যত শাসন

  ডা. ছায়েদুল হক

১৭ জুলাই ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৭, ০১:০১ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাবা-মায়ের কাছে একটি শিশু মানে একটি সুন্দর অনাগত দিনের স্বপ্ন। শিশুটি বড় হবে; লেখাপড়া শিখে মানুষ হবে; চাকরি করবে; ঘর-সংসার করবে। কতকিছু! অথচ চারপাশে তাকালে আমরা দেখি এই সন্তানই মাদকাসক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাজারো সন্তান অসামাজিক কাজে লিপ্ত। অনেকেই ভালো ঘরের সন্তান; শিক্ষিত বাবা-মার সন্তান। এর জন্য অনেক কারণকেই দায়ী করা চলে। তবে সবচেয়ে বড় যে কারণটিকে কোনোমতেই এড়িয়ে যাওয় চলে না তা হলো সন্তান লালন-পালনে বাবা-মার ভূমিকা।

বাবা-মার রঙিন স্বপ্নস্নাত সন্তান আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে; এক সময় স্কুলমুখী হয়। পরিবারের গ-ি পেরিয়ে নিজস্ব পথচলা শুরু হয় তার। নিত্যনতুন মানুষ আর নতুন নতুন বিষয় ও ঘটনা সন্তানের সামনে এনে দেয় এক নতুন পৃথিবী। সন্তান নিজের মতো করে চিনতে এবং বুঝতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয় সন্তানের নিজস্ব ভুবন। দৃশ্যমান হতে থাকে সন্তানের ভালো লাগা, মন্দ লাগা। সন্তানের আচরণে এর প্রতিফলন দেখা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক। অনেক বাবা-মা চান সন্তান তাদের মতো করে ভাবতে শিখুক বা তাদের প্রত্যাশিত আচার-ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠুক। এ ব্যাপারে সন্তানকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। অনেক সময় সন্তানের ওপর বিভিন্ন রকম বিধিনিষেধ আরোপ করে থাকেন। অনেক সময় সন্তানের ওপর কড়া শাসন চাপিয়ে দেন, এমনকি মারধরের আশ্রয় নিতেও কুণ্ঠিত হন না। সন্তানের ভালো লাগা, মন্দ লাগা বাবা-মার ভালো লাগা বা মন্দ লাগার সঙ্গে সব সময় মিলমিশ করে চলে না। ফলে এখানে একটি দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। এই দ্বন্দ্বের বিষয়টিকে অনেক বাবা-মা সুন্দর করে বোঝার চেষ্টা করেন এবং সন্তানকে আস্থায় রেখে ও সন্তানের সঙ্গে মধুর সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে উতরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আবার অনেক বাবা-মা আছেন যারা সন্তানের ভালো লাগাকে প্রশ্রয় দিতে চান না। তারা মনে করেন সন্তানের ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা এখনো হয়নি তাই এই দায়িত্বটা বাবা-মাকেই পালন করতে হবে। বাবা-মা যা বলবে সন্তানকে তাই মেনে চলতে হবে। কারণ এর মধ্যেই তাদের মতে সন্তানের ভবিষ্যৎ কল্যাণ নিহিত আছে। সন্তান লালন পালনের এই জায়গাটি খুবই স্পর্শকাতর। এখানে সন্তান লালনে বাবা-মায়ের ভুল সিদ্ধান্ত বা বৈরী ও নিষ্ঠুর আচরণের শিকার অনেক সন্তানই বড় হয়ে বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। পরবর্তীকালে মাদকাসক্ত, উচ্ছৃঙ্খল জীবনের হাতছানিতে বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা অনেক সন্তানের মনে এর বীজ রোপিত হয় এই সময়টায়। তাই সন্তান লালন-পালনের বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্বসহকারে অনুধাবন করতে হবে।

সন্তান লালন-পালন বা পেরেন্টিং মানে কী?

সন্তানের শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে ওঠায় যতœ নেওয়া; প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুুযোগ করে দিয়ে তাকে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা; সন্তানকে আচার-আচরণ ও সামাজিকতায় অভ্যস্ত করা, সর্বোপরি সন্তানের মনে উন্নত চিন্তা-চেতনা বিকাশে ভূমিকা রাখা ইত্যাদির সমন্বয়ে যে সার্বিক তত্ত্বাবধান বাবা-মা সন্তানের জন্য করে থাকেন তাই পেরেন্টিং বা সন্তান লালন-পালন।

পেরেন্টিং বা সন্তান লালন-পালনের বিভিন্ন রূপ-

সব বাবা-মা একইভাবে সন্তানের দেখভাল করেন না বা করতে পারেন না। এটি নির্ভর করে বাবা-মার মনোজগৎ বা চিন্তা-চেতনার স্তর, পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট, সন্তানের মানসিক ও শারীরিক গড়ন এমনকি অনেক সময় সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার ওপর।

মোটা দাগে সন্তান লালনের রূপটিকে চার ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

১. অথোরিটেটিভ বা কর্তৃত্বব্যঞ্জক পেরেন্টিংÑ এ ক্ষেত্রে বাবা-মা একটু নমনীয় হয়ে থাকেন। বাবা-মা সন্তানের প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল থাকেন। সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন এবং যথাযথ উপদেশ দিয়ে থাকেন। সন্তানকে ঘিরে তারা যেমন উচ্চাশা পোষণ করেন, তেমনি সন্তানের সব রকম চাহিদা মেটাতেও সচেষ্ট থাকেন। সন্তানের আবেগকে যথেষ্ট মূল্যায়ন করে থাকেন। সন্তানের শাসনের ক্ষেত্রে অনেকটা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে থাকেন। অর্থাৎ সন্তানের ব্যক্তিস্বাধীনতায় যেমন যখন তখন হস্তক্ষেপ করেন না, আবার সন্তানকে একদম বল্গাহীন স্বাধীনতাও ভোগ করতে দেন না। সন্তানের সঙ্গে এদের বোঝাপড়াটা এক কথায় চমৎকার। সন্তান তাদের সঙ্গে অনেক কিছুই সহজে শেয়ার করে থাকে। এসব সন্তান বড় হয়ে খুব সহজেই আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী হয়; আচার-আচরণে ভালো হয়; প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অধিকতর সাফল্যম-িত হয়। এরা কদাচিৎ বিষণœতায় ভোগে। বড় হয়ে এরা মাদকাসক্তি ও অন্যান্য অসামাজিক কর্মকা-ে কম জড়ায়। সামাজিকভাবেও এদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি থাকে।

২. অথোরিটারিয়ান বা কর্তৃত্বপরায়ণ পেরেন্টিংÑ বাবা-মা সন্তানের প্রতি কিছুটা রুক্ষ আচরণের হয়ে থাকেন। সন্তানের আবেগ-অনুভূতির ব্যাপরটা খুব কমই আমলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। সন্তানের চাহিদা ও কথাবার্তার প্রতি একটু কম মনোযোগ দিয়ে থাকেন। প্রায় সময় আলোচনায় সন্তানের কোনো যুক্তিকে উৎসাহিত না করে বরং নিরুৎসাহিত করে থাকেন। বাবা-মার ধারণা, সন্তানের ভালো-মন্দ বোঝার ভার সম্পূর্ণ বাবা-মায়ের। সন্তানের এ ব্যাপারে নাক গলানোর দরকার নেই। সন্তানের কাজ হলো বাবা-মা যা বলবে বিনা বাক্যব্যয়ে তাই করে যাওয়া। এ ব্যাপারে সন্তানের ভিন্নমতকে কোনোভাবেই গ্রাহ্য করা হয় না। ভাবটা এমনÑ ‘আমি এটা তোমাকে করতে বলেছি তাই তুমি করবে। কেন? কী? জিজ্ঞেস করবে না।’ অনেক সময় ভিন্নমতের কারণে অথবা অবাধ্যতার কারণে বাবা-মা সন্তানকে বাগে আনার জন্য মারধরের আশ্রয় নেন। এই মারধর প্রক্রিয়া এক সময় নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। এতে সন্তান খুব অসহায়বোধ করে। তারা কাজকর্মে স্পৃহা হারিয়ে অনেক সময় হতোদ্যম হয়ে পড়ে। এই সন্তান সংশোধিত হওয়ার চেয়ে শাস্তি এড়ানোর জন্য বেশি সচেষ্ট হয়। ফলে সন্তানের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবই বেশি পড়ে। এসব সন্তান পরবর্তীকালে অনুরূপ আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং অন্যদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে থাকে। বাবা-মার সঙ্গে এসব সন্তানের বোঝাপড়াটা দুর্বল হয়। এরা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নিয়ে বড় হয়। ফলে এসব সন্তান অধিকতর বিষণœতায় ভোগে এবং বড় হলে এদের মধ্যে মাদকাসক্ত হওয়া ও অসামাজিক কাজে জড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি পরিলক্ষিত হয়।

৩. পারমিসিভ বা অনুমতিদায়ক পেরেন্টিংÑ বাবা-মা সন্তানের সবকিছুতেই সায় দিয়ে থাকেন। না কোনো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখেন, না কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সন্তানের জন্য স্থির করে থাকেন। নিজের খেয়ালখুশিমতো চলতে গিয়ে এই সন্তান সামাজিক বিধিনিষেধের ব্যাপারে একদম উদাসীন থাকেন। পরে সামাজিক বিধিনিষেধগুলো মানিয়ে নিতে অসুবিধার সম্মুখীন হন এবং প্রায়ই ব্যর্থ হয়ে হতোদ্যম হয়ে পড়েন। নৈতিকতাবিবর্জিত বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে এসব সন্তান অনেক সময় বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

৪. অযতœ বা অবহেলাÑ বাবা-মা একদম সন্তানের কোনো খোঁজখবর করেন না। অনেক সময় সন্তান বাবা-মার কাছে না থাকার কারণেও এমনটি হয়ে থাকে। এদের মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এদের মধ্যে অস্থিরতা বেশি কাজ করে এবং এরা সহজেই ক্ষেপে যায়। সামাজিকভাবে অনেকটা অবহেলিত থাকে। স্কুল-কলেজে এদের সফলতা কম পরিলক্ষিত হয়। এরা আচরণগত ত্রুটি নিয়ে বড় হয়।

সন্তান লালনে কিছু করণীয়Ñ

১. সন্তানের সঙ্গে নিয়ম করে একান্তে সময় কাটাতে হবে। সন্তানের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং প্রয়োজনীয় উপদেশ দিতে হবে।

২. সন্তানর ওপর কখনো এমন আদেশ-নিষেধ, বিশেষ করে রাগের মাথায় আরোপ করা উচিত নয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। এতে সন্তানের জন্য অবাধ্য হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

৩. কোন আচরণগুলো গ্রহণযোগ্য, কোন আচরণগুলো পরিহার করে চলতে হবে এ ব্যাপারে সন্তানকে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। সঠিক আচরণের জন্য উৎসাহ প্রদান ও খারাপ আচরণকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। সন্তানের কাছে বাবা-মা হলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আইডল। সন্তান সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় বাবা-মাকে দেখে। তাই সন্তানের আচরণকে প্রভাবিত করতে বাবা-মায়ের জীবনকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যেন সন্তান সহজেই এইগুলো আয়ত্ত করতে পারে। অর্থাৎ যে গুণাবলি বাবা-মা সন্তানের মাঝে দেখতে চান তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখাতে হবে।

৪. কম্পিউটার ইত্যাদি ফ্যামিলি রুমে রাখতে হবে যাতে সন্তানের অনলাইনের সব কার্যকলাপ নজরে থাকে। অনলাইনের ভালো দিক, খারাপ দিকগুলোর ব্যাপারে অবশ্যই সন্তানকে সচেতন করতে হবে। স্মর্টফোন, ট্যাব ইত্যাদির বেলায় অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে।

৫. সন্তানকে অবশ্যই বুঝতে দিতে হবে বাবা-মার সামর্থ্য কতটুকু অথবা সামর্থ্যবান হলেও তার প্রত্যাশার সীমারেখা কতটুকু।

৬. আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে অবশ্যই সন্তানের মেলামেশার সুযোগ করে দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, যাতে সন্তানের দৈনিক কাজের তালিকা ও সামাজিকতা সন্তানের ওপর বোঝাস্বরূপ হয়ে না পড়ে। খারাপ আচরণের বা খারাপ স্বভাবের সে বন্ধু-বান্ধব হোক বা আত্মীয়স্বজন হোক, তাদের কাছ থেকে সন্তানকে অবশ্যই দূরে রাখার চেষ্টা করতে হবে।

৭. সন্তানকে কখনো অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে হেয় করার চেষ্টা করা ঠিক নয়। এতে সন্তানের মধ্যে হিংসা ও জেদ বেশি কাজ করে।

৮. সন্তানের ব্যাপারে তিনটি বিষয় বাবা-মাকে সার্বক্ষণিক অবহিত থাকতে হবেÑ সন্তান এখন কোথায়? সন্তান এখন কার সঙ্গে? সন্তান এখন কী করছে?

পরিবার থেকে সন্তানের মনে একটি শক্ত নৈতিক ভিত গড়ে দিতে পারলে তা সারাজীবন সন্তানকে সুরক্ষা দেবে। তাই ব্যস্ততার দোহাই না দিয়ে সব বাবা-মার উচিত সন্তান লালন-পালনের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

ডা. ছায়েদুল হক : চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক

sayedul.hq@gmail.com

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে