ব্যবস্থাপনায় অনভিজ্ঞ

ভিআইপিদের ‘ফান্ড ম্যানেজমেন্ট’ সমস্যা

ড. সা’দত হুসাইন

১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেলিব্রেটি হওয়া এবং ব্যবস্থাপনা ও হিসাব-নিকাশে সজাগ আর সপ্রতিভ হওয়া এক ব্যাপার নয়। বরং প্রায় ক্ষেত্রেই এর উল্টোচিত্র দেখা যায়। সেলিব্রেটিরা নিজেদের পেশা এবং কর্মযজ্ঞ নিয়ে এত বেশি মশগুল থাকেন যে, তাদের আয় ও সম্পদের হিসাব-নিকাশের দিকে নজর রাখতে পারেন না। এ ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ও উদ্যোগ থাকে না। হিসাব-নিকাশসংক্রান্ত বিষয়াদি তাদের প্রবৃত্তির সঙ্গে যায় না বলে এটি তাদের কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। মানবচরিত্রের স্বাভাবিক রীতির সঙ্গে তাদের এই প্রবণতা সঙ্গতিপূর্ণ। স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে, মানুষ যে কাজ ভালোভাবে করতে পারে না, সে কাজ সে করতে চায় না; নানা অজুহাতে কাজটি এড়িয়ে যায়। অজুহাতটি অনেক সময় মানসিক। কাউকে কিছু না বলে নিজের মনে সে অজুহাত সৃষ্টি করে, গতকাল কাজটি করা যায়নি কারণ শরীর ভালো ছিল না। আজ আবহাওয়া খারাপ, কাজ করার উপযোগী নয়, পরদিন তার বন্ধু বাসায় আসার কথা আছে। এভাবে কাজটি পিছিয়ে পড়তে থাকে। জঞ্জাল বেড়ে ওঠে, নতুন কোনো অজুহাত দিয়ে ফেলে রাখা হয় কাজটিকে।

ফলে দেখা যায়, ভিআইপিদের হিসাব-নিকাশের বেহাল অবস্থা। ভিআইপিদের মধ্যে একটি ছোট অংশ ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পস্থাপনা কিংবা আর্থিক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত থেকে সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছেন। যারা ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ এবং হিসাব-নিকাশে অভ্যস্ত। তাদের জন্য আয়-সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং হিসাব সংরক্ষণ কোনো ঝামেলার ব্যাপার নয়। কাজটি তারা স্বচ্ছন্দে করেন। অধিকন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হিসাবরক্ষণ কাজের জন্য তাদের ‘ফান্ড ম্যানেজার’ রয়েছে, যারা হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে সহায়তা করেন। বাকি ভিআইপিদের বেশিরভাগ ব্যস্ত থাকেন খেলাধুলা, সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিম-লে, রাজনৈতিক তৎপরতা এবং অন্যান্য সুকুমারবৃত্তি নিয়ে। এদের অবস্থান থেকে হিসাব-নিকাশ একটি জটিল ব্যাপার মনে হয়। ছোট বয়স থেকেই অনেকের মধ্যে হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে দারুণ অনীহা থাকে, সংখ্যা দেখলেই তারা ঘাবড়ে যান। ভিআইপি হিসেবে ওপরে উঠে সম্পদের হিসাব-নিকাশের ব্যাপারে তাদের মধ্যে বড় কোনো পরিবর্তন ঘটে না। হিসাব-নিকাশের জটিলতা আজও তাদের ঘাবড়ে দেয়। সবচেয়ে অসুবিধা হলো, এ সমস্যার সমাধান কীভাবে করা যায় সে সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। হিসাব-নিকাশে অনীহা যে কোনোকালে তাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, এ সম্পর্কে তাদের বোধোদয় নেই। বিরাট আয় তাদের জন্য আনন্দের ব্যাপার, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে এ আয়ের বদৌলতে ভোগ-উপভোগ করতে তারা পছন্দ করেন। কিন্তু আয় বাড়লে তা যে তাদের জন্য নানারকম প্রশাসনিক ও আইনি দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করে সে বিষয়টি তারা সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেন না। তারা নিজের পেশাগত কাজে ব্যস্ত থেকে এবং আনন্দ উল্লাসে আরাম-আয়েশের মধ্যে দিন কাটিয়ে সন্ধ্যা পার করেন। সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অবচেতন থেকে হেসেখেলে দিন কাটানোকে স্বাভাবিক কাজ মনে করেন। অথচ সারা বিশ্বে নাগরিকের মালিকানাধীন সম্পদের হিসাব-নিকাশ আদায় করা রাষ্ট্র বা সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ। সরকারের বিশেষায়িত সংস্থা তাদের পারদর্শিতা ও দক্ষতা প্রয়োগ করে এ কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করে। এক সময় তাদের জালে আবদ্ধ হয় অসতর্ক এবং হিসাব-নিকাশে অনভ্যস্ত সেলিব্রেটি বা ভিআইপিরা। এদের একাংশ প্রথমে বুঝে উঠতে পারেন না, সরকারের আয়কর বিভাগ ও বিশেষায়িত সংস্থা কেন তাদের পেছনে লেগেছে। অনেক সময় এদের বয়স থাকে নেহাত কম। ৩০-৩৫ বছরের নিচে। কৈশোর থেকে খেলাধুলা ও নানারকম পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে টাকা উপার্জন শুরু হয়েছে। কখনো ধারাবাহিকভাবে, কখনো হঠাৎ করে সে আয় বেড়ে উঠেছে। হয়তো বা ব্যাংকের কোনো সাধারণ সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টে এ টাকা জমে আছে। এ অর্থের জন্য কীভাবে কর দিতে হবে, কীভাবে অন্যান্য দায় মেটাতে হবে এ সম্পর্কে তারা কোনো চিন্তাভাবনা করেননি। খেলাধুলা-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকা- কিংবা অন্যান্য পারফরম্যান্সের আনন্দ উল্লাস নিয়ে তারা মত্ত থেকেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ের একটি খবর অনেক পাঠকের দৃষ্টি কেড়েছে। মাঠে ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে গোল দিলেও আইনের প্রহরীদের ফাঁকি দিতে পারেননি লিওনেল মেসি। কর ফাঁকির ফাউলে ঠিকই ধরা খেয়েছেন, কপালে জুটেছে শাস্তিও। দিয়েছেন মোটা অর্থদ-। কারাদ-ের মেয়াদটা দুই বছরের কম হওয়ায় যেতে হয়নি জেলখানায়। তবে মেসির মতো সৌভাগ্য সবার নয়। জার্মানির সাবেক ফুটবলার ও বায়ার্ন মিউনিখের প্রেসিডেন্ট টনি হোয়েনেসকে জেল খাটতে হয়েছে। এ ছাড়া মরিনহো, রোনালদো, ফালকাও সবাই এখন কর ফাঁকির জালে। একই অভিযোগ যুক্ত হয়েছে ব্রাজিলের ফুটবল তারকা রোমারিও। ব্রাজিলের একটি আদালত কর ফাঁকির অভিযোগে তাকে আড়াই বছরের কমিউনিটি সার্ভিস সম্পন্ন করার শাস্তি দিয়েছে। ব্রাজিলের কর কর্তৃপক্ষ কর ফাঁকির অভিযোগে নেইমারের সম্পত্তি জব্দ করেছে।

সুকুমারবৃত্তি, এমনকি রাজনৈতিক জগতের প্রখ্যাত ব্যক্তিরা আয় ও সম্পদের হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে অনভ্যস্ত থেকে যান। বিশেষ করে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ কিংবা ভক্ত-অনুগতদের আনুকূল্যে যে আয় বা সম্পদ আসে সেটির দক্ষ ব্যবস্থাপনা তারা মোটেও করতে পারেন না। ফলে বিভিন্ন প্রকারে তারা সরকারের বিশেষ দপ্তর দ্বারা অভিযুক্ত হন; সে অভিযোগ সামাল দিতে গলদঘর্ম হন। ভাগ্য খারাপ হলে তাদের ক্যারিয়ার বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। কোনো দুরভিসন্ধিমূলক অপরাধের কারণে নয়, শুধু ব্যবস্থাপনায় অনভিজ্ঞ, হিসাব-নিকাশে অনভ্যস্ত হওয়ার কারণে তারা এরূপ হেনস্তার সম্মুখীন হন। আমাদের দেশে ১/১১-তে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনেক সজ্জন ব্যক্তিকে স্বাভাবিক সম্পদ নিয়ে ত্রস্ত থাকতে দেখা গেছে। তাদের আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটাতে দেখেছি। আয়-সম্পদের দিন-মাসওয়ারি বিশদ হিসাব-নিকাশ তাদের কাছে ছিল না। বিশেষ করে উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক হয়েছেন এমন সম্পত্তির হিসাব-নিকাশ অনেকেই স্বাভাবিকভাবে রাখেননি, তাদের পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ পরিবারের কোনো অগ্রজ সদস্য দেখাশোনা করেছেন। বছরের শেষে টাকা-পয়সা বা উৎপন্ন ফসলাদির ভাগ দিয়েছেন, সে নিয়ে তারা সন্তুষ্ট থেকেছেন। পরিবারে মুরব্বি বা অগ্রজ সদস্যের কাছে এ টাকা-পয়সার হিসাব-নিকাশ চাননি। কিন্তু ১/১১ সরকার যখন সবার সম্পত্তির হিসাব নিতে শুরু করে, তখন এই শ্রেণির লোকজন বড় রকমের অসুবিধার মধ্যে পড়েন। তাদের চরম অস্বস্তির মধ্যে দিন কাটাতে দেখেছি। এমনকি বাড়ির গৃহিণী যারা নানাভাবে টাকা জমিয়ে ব্যাংকে রেখেছেন তাদেরও আতঙ্কে দিন কেটেছে। কারণ টাকার দিন বা মাসওয়ারি হিসাব তাদের কাছে ছিল না। পরে অবশ্য ১/১১ সরকার এ নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করেনি। সম্পদশালী সজ্জনরা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। ১/১১-এর সরকারের নির্দেশ এবং পদ্ধতির আদলে হিসাব-নিকাশ দিতে হলে উপমহাদেশের অনেক নমস্য ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক নেতা বিপদে পড়তেন। বিব্রত এবং অপমানিত হতেন। তাদের রাজনৈতিক জীবন (পধৎববৎ) বিপর্যস্ত হতো।

উপরোক্ত ক্যাটাগরির ভিআইপি, বিশেষ করে অল্প বয়সে যারা খেলাধুলা, সাহিত্যকর্ম, সাংস্কৃতিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সম্পদশালী হয়েছেন তাদের ব্যাপারে সরকারকে সহমর্মিতা দেখাতে হবে। লটারিতে জিতে হঠাৎ সম্পদশালী হওয়া ব্যক্তিকেও আমি এই ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করছি। এদের অসতর্কতা এবং ভুলের জন্য হেনস্তা না করে বন্ধুসুলভ আচরণ, সহমর্মিতা এবং পরামর্শের মাধ্যমে সহায়তা করা যথার্থ হবে বলে আমি মনে করি। ফান্ড ম্যানেজারের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে তাদের প্রফেশনাল হিসাবরক্ষক বা ফান্ড ম্যানেজার নিয়োগ করার জন্য পরামর্শ, প্রয়োজন হলে অনুশাসন দেওয়া যেতে পারে। তাদের যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তাতে এক বা একাধিক ফান্ড ম্যানেজার নিয়োগ তাদের জন্য মোটেই কষ্টসাধ্য ব্যাপার হবে না। তবে এটি তাদের ধারণা বা অভ্যাসবিরুদ্ধ কাজ হতে পারে। সরকার উদ্যোগ নিয়ে তাদের এরূপ ভুল ধারণা এবং ক্ষতিকর অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এতে ভিআইপিদের এবং দেশের বড় উপকার হবে।

য় ড. সা’দত হুসাইন : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে