চিকুনগুনিয়াবৃত্তান্ত

  ইকবাল খন্দকার

১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

যারা দেশকে ভালোবাসেন, দেশের কল্যাণ প্রত্যাশা করেন, তারা সব সময়ই চান এ দেশের মানুষ যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি বলছে, এ দেশের মানুষ সহসাই মেরুদ- সোজা করে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। আরে বাপুরে, চিকুনগুনিয়ার কারণে হাঁটু সোজা করেই দাঁড়াতে পারছে না, মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে কীভাবে! দেড় মাস আগে যার চিকুনগুনিয়া হয়েছে, সেও এখন পর্যন্ত বসলে উঠতে পারে না, উঠলে বসতে পারে না। আর যারা নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে, তারা তো নড়াচড়াই করতে পারে না। বামকাত থেকে ডানকাত হওয়ার সময় পুরো পাড়ার মানুষ জানে। এত ব্যথা! আমার এক সিনিয়র প্রতিবেশী গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাক দিলেন। আমি তার কাছে যেতেই তিনি বলতে লাগলেনÑ মানুষের লোভ চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। এবার যদি একটু কমে। আমি তার কথার অর্থ বুঝতে পারলেও উদ্দেশ্য বুঝতে না পারায় হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। প্রতিবেশী আমার না বুঝতে পারার বিষয়টি অনুধাবন করে বললেনÑ আরে বুঝলেন না! আমি বলছিলাম বিদেশি জিনিসের প্রতি এ দেশের মানুষের মাত্রাতিরিক্ত লোভের কথা। শুধু মুরগি কিনতে গিয়ে দেশি মুরগি খোঁজে। বাদবাকি যা আছে, সবকিছু বিদেশি চাই। আমি এমন বহু লোক দেখেছি, সার্ভেন্ট টয়লেটের জন্য একটা বদনা কিনবে, সেই বদনার গায়েও খোঁজে মেড ইন চায়না বা জাপান লেখা আছে কিনা। তো যারা বিদেশি জিনিসের প্রতি আসক্ত, এবার তাদের একটা উচিত শিক্ষা হয়েছে। ভবিষ্যতে বিদেশি জিনিসের প্রতি লোভ করার আগে দশবার ভাববে। আমি আগের মতোই কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বললামÑ কী এমন ঘটনা ঘটল যার কারণে বিদেশি জিনিসের প্রতি মানুষের লোভ কমবে? প্রতিবেশী বিদ্রƒপের হাসি হেসে বললেনÑ আপনি তো দেখছি মিয়া দুনিয়াদারির কোনো খোঁজখবরই রাখেন না। দেশের মানুষ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পঙ্গু হয়ে গেল, আর আপনি আছেন ঘুমে। আমি বললামÑ চিকুনগুনিয়ার খবর জানি। কিন্তু আপনি এতক্ষণ যা বললেন, তার সঙ্গে চিকুনগুনিয়ার কী সম্পর্ক? প্রতিবেশী আমার কথার উত্তর সরাসরি না দিয়ে বললেনÑ চিকুনগুনিয়া রোগটা আমদানি হয়েছে আফ্রিকা থেকে। বিদেশি জিনিসের প্রতি যাদের মাত্রাতিরিক্ত লোভ তারা বুঝুক, বিদেশ থেকে যা আসে, তার সবই ভালো নয়। কিছু খারাপ জিনিসও থাকে। প্রতিবেশী প্রসঙ্গ এখানেই শেষ। তবে চিকুনগুনিয়া প্রসঙ্গ শেষ হতে দেরি আছে। আপনারা নিশ্চয়ই ইতোমধ্যে জেনে গেছেন চিকুনগুনিয়া শব্দের অর্থ। জি, আফ্রিকান ভাষার এই শব্দটার অর্থ হচ্ছে বাঁকা ধনুক। যেহেতু প্রচ- ব্যথায় রোগীর শরীর ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে যায়, তাই এই নামকরণ। অনেকেই বলছেন, চিকুনগুনিয়া বাংলাদেশে নতুন। কথাটা ঠিক নয়। এই রোগ বাংলাদেশে এর আগেও হানা দিয়েছিল। বিশেষ করে ২০০৮ ও ২০১১ সালে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল এ দেশের বেশকিছু মানুষ। কিন্তু এর নাম যে চিকুনগুনিয়া, সেটা তখনো সেভাবে জানা বা বোঝা যায়নি। এখন এই রোগ মহামারী আকার ধারণ করায় সবার টনক নড়েছে। তবে সবার টনক নড়লেও সরকারের টনক সেভাবে নড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ কিছুদিন আগে সরকারি যে জরিপটা হয়েছিল, সেটি ছিল হাস্যকর। হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে চিকুনগুনিয়ায়, অথচ সরকারি জরিপে এসেছিল আক্রান্তের সংখ্যা নাকি মাত্র পাঁচশর কিছু বেশি। এই ধরনের জরিপ শুধু হাস্যকরই নয়, দুঃখজনকও বটে। চিকুনগুনিয়া হয় মূলত মশার কামড় থেকে। আর শহরকে মশা থেকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব মেয়রের। কিন্তু সাধারণের অভিযোগÑ ঢাকার মেয়রদ্বয় ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন না। যে কারণে অনেকেই ব্যঙ্গ করে বলছেÑ ‘ম’-তে মশা, ‘ম’-তে মেয়র। এই যে মেয়রদ্বয়ের প্রতি সবার অভিযোগের আঙুল, তাতে তারা খুব বেশি উদ্বিগ্ন বলে মনে হয় না। যদি তাই হতো, তাহলে উত্তরের মেয়র বলতে পারতেন নাÑ ‘ঘরে ঘরে মশারি টানিয়ে দিয়ে আসা সম্ভব না।’ অবশ্য তিনি তার এই বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আর আমরা তাতেই খুশি। এ দেশের অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বেফাঁস কথা বলেন। দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কিন্তু তারা দুঃখ প্রকাশের কথা চিন্তাও করেন না। আমাদের মেয়র দুঃখ প্রকাশ করেছেন, এর জন্য আমরা যেমন খুশি, এর পাশাপাশি জোর দাবি জানাচ্ছি যেন মশা নিধনে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেন। আবারও বলিÑ ‘কার্যকর’ ব্যবস্থা। আসলে ব্যবস্থা এর আগেও নেওয়া হয়েছে। মশা মারতে ঢাকার উত্তর-দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশন গত অর্থবছরে পেয়েছিল প্রায় ৩৭ কোটি টাকা। তাই ব্যবস্থা নেওয়া হতেই পারে। কিন্তু মশার দাপট দেখে মনে হচ্ছে মশা নিধনের সব ব্যবস্থাই ছিল লোকদেখানো। মশা তো আর বাঘ-সিংহের মতো বড় কোনো প্রাণী নয় যে, গুলি করে মারতে হবে বা ফাঁদ পেতে ধরতে হবে। একটু দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করলে খুব সহজেই মশার বংশ সমূলে ধ্বংস করতে না পারলেও ধ্বংস করা সম্ভব। কিন্তু এই সম্ভব কাজটাকে রীতিমতো অসম্ভব বানিয়ে ফেলা হয়েছে নানা গাফিলতি করে। ঢাকা শহরের অনেক খোলা ডাস্টবিন এখন আর খোলা নেই। সিটি করপোরেশন সেগুলোর চারপাশে ওয়াল তৈরি করে দিয়েছে, ওপরে দিয়েছে চালা। ঠিক এভাবে যদি নর্দমা আর পচা ডোবার মতো জায়গা অর্থাৎ যেসব জায়গায় মশা নির্বিঘেœ ডিম পাড়ে, সেসব জায়গা চিহ্নিত করে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হয়, তা হলে মশার উপদ্রব কমতে বাধ্য। জলাবদ্ধতার সঙ্গে মশার বংশ বিস্তারের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, জলাবদ্ধতা কেবল বাড়ছেই। কমছে না। আর এই জলাবদ্ধতা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কমানোর সুযোগ নেই। যা করার সিটি করপোরেশনকেই করতে হবে। ঘুরেফিরে অভিযোগটা মেয়রের দিকেই যায়। তাই আমাদের মেয়রদের বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তারা যদি মশা নিধন আর জলাবদ্ধতা নিরসনের ক্ষেত্রে দ্রুত সাফল্য দেখাতে না পারেন, তাহলে মানুষের দীর্ঘশ^াসে ঢাকার আকাশ কেবল ভারীই হতে থাকবে। আর তাদের ভুলে গেলে চলবে না, যারা দীর্ঘশ^াস ফেলছে বা ফেলবে, তারা কিন্তু ভোটারও বটে। নির্বাচনের মৌসুমে তাদের কাছেই যেতে হবে ভোটের জন্য। তাই এখন থেকে সাবধান হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তরা বলে থাকেনÑ আমার শত্রুরও যেন এই রোগ না হয়। এ থেকেই বোঝা যায়, এই রোগের যন্ত্রণা কত ভয়াবহ। ধরা যাক আপনি চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গেলেন। তখন আপনার যন্ত্রণার ভাগ কিন্তু কেউ নেবে না। আপনি মেয়রের ওপর হাজারটা দোষ চাপাতে পারবেন, মেয়রও হয়তো দুঃখ প্রকাশ করবেন, সমবেদনা জানাবেন, আপনার যন্ত্রণা কিন্তু কমবে না। তার মানে এটাই বলতে চাচ্ছি, রোগ একবার হয়ে গেলে সব যন্ত্রণা যেহেতু নিজেকেই পোহাতে হয়, তাই কে কী করে দেবে, সেসবের আশা ছেড়ে দিয়ে আসুন নিজেরা সচেতন হই। মেয়ররা ঠিকঠাক উদ্যোগ নিলে হয়তো মোটা দাগে মশক নিধন সম্ভব। কিন্তু আপনার বাসার ফুলের টবে যে পানি জমে আছে আর সেই পানিতে যে মশা ডিম পাড়ছে, সেই ডিম ধ্বংস করা তো আর মেয়রের পক্ষে সম্ভব নয়। আর আপনাকে কামড়ালে দূর-দূরান্তের মশা এসে কামড়াবে না। টবে উৎপাদিত মশাগুলোই কামড়াবে। তাই আপনার নিরাপত্তা আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে। এমন অনেকেই আছেন, মশারি টানাতে আলসেমি করেন। কেন? সারাদিন এত কাজ করতে পারেন, রাতে শোয়ার আগে মশারিটা টানিয়ে নিলে কী এমন পরিশ্রম হয়ে যায়? আবার কেউ কেউ আছেন মশারি না টানিয়ে ভরসা রাখেন কয়েলের ওপর। এটা একদমই ঠিক নয়। কারণ আজকাল বাজারে যেসব কয়েল পাওয়া যায়, সেগুলো মশার হাত থেকে আপনাকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারে না। দু-চার-দশটা মশা ঘরে থেকেই যায়। আরেকটা বিষয়, ঘুমানোর আগে হয়তো কয়েলটা জ¦ালালেন, ঘুম থেকে ওঠার আগেই সেটা শেষ হয়ে গেল। আপনি ঘুমের ঘোরে জানলেনও না কখন শেষ হয়েছে আর কয়টা মশা আপনাকে কামড়িয়েছে। তাই নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই মশারি টানানো জরুরি। সবশেষে কথা এটাইÑ সতর্ক থাকুন, চিকুনগুনিয়ামুক্ত থাকুন।

য় ইকবাল খন্দকার : কথাসাহিত্যিক ও টিভি উপস্থাপক

iqbalkhondokar@yahoo.com

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে