ঢাকা নগরীর জলাবদ্ধতা : কারণ বর্জ্যজট

ম. ইনামুল হক

২৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৭, ০৩:৪০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী ও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নগরী। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরী। যদিও এর পরিকল্পনার জন্য আইন ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আছে। তবে তাদের কাজ দেখতে পাওয়া যায় না। যা দেখা যায় তা হলো, নগরীর যেখানে সেখানে বসতবাড়ি, শিল্প প্রতিষ্ঠান আর বস্তি। সুদৃশ্য দালান ও শপিংমলের পাশে রাস্তায় চরম যানজট। দেখা যায় রাস্তা ও ফ্লাইওভার নির্মাণের কর্মযজ্ঞ আর খোঁড়াখুঁড়ি। দেখা যায় যেখানে সেখানে ছড়ানো আর স্তূপীকৃত ময়লা। দেখা যায় ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পয়ঃ ও শিল্পবর্জ্যরে প্রবহমান নালা। এসবই রয়েছে উন্নয়নের ঢাকঢোল পেটানো শোরগোলের মধ্যে। সরকারি প্রচারণায় বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর হতে আর দেরি নেই। যারা কখনো সিঙ্গাপুর যাননি তারা হয়তো বসুন্ধরা শপিংমল দেখে চোখ ছানাবড়া করতে পারেন, কিন্তু যারা গেছেন তারা বাকরুদ্ধ হয়ে যান। তারা দেখেন রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোর ধারে কঠিন বর্জ্য উপচে পড়ছে, হাতীরঝিলের মতো মহা উন্নয়নের লেক থেকে তরল বর্জ্যরে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে, একটু বৃষ্টি হলেই নগরীর ড্রেনগুলো থেকে পয়ঃবর্জ্য বেরিয়ে এসে রাস্তা ভাসাচ্ছে তা হলে ঢাকা কীভাবে সিঙ্গাপুর হতে চলছে?

ঢাকা নগরীর বাসিন্দাদের কাছে যানজট ও ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধ এখন প্রায় সহনীয় হয়ে গেছে। লুটপাটের অর্থনীতিতে গুলশান-বনানীর বিশাল বাড়ি এবং সকাল-সন্ধ্যা ২৪ ঘণ্টা এসিতে থাকা মানুষরা দশ-বিশ, শত-হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ও বিদেশে সেকেন্ড হোম করে বেশ সুখে আছে। যারা এর নিচের অবস্থানে আছে তারা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ফ্ল্যাট বাড়ির মালিক হয়েও বেশ ভালোই আছেন। ঢাকার বস্তিবাসীরা যারা এই দুই জাতের মানুষের সংস্পর্শে আসতে পারে না তারা চুইয়ে পড়া অর্থের কিছু উচ্ছিষ্ট পেয়ে বেশ ভালোই আছে। কিন্তু বিপদে আছে বস্তিবাসী ও বিত্তবানদের মাঝের মানুষ, যারা বাসা ভাড়া করে থাকে, বাসে চড়ে। এই নগরীকে নিজের মনে করলেও অনেক সংগ্রাম করে তাদের টিকে থাকতে হয়। তবে ঢাকা নগরীর আশপাশের নদীর মাছ ও অন্যান্য জীব দূষণের নাগপাশে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, ডাঙার গাছপালা, পশুপাখিও প্রায় উধাও হতে বসেছে। উন্নয়নের জোয়ারে ভাসা নগরীর সব জাতের মানুষই বিপদে পড়ে যখন আকাশ থেকে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। তখন এই নগরীর পয়ঃবর্জ্য আর শিল্পবর্জ্যরে ময়লা পানি রাস্তায় ও গলিতে উপচে পড়ে বাড়ির ভেতরে ঢোকে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৬ বছর, ঢাকা নগরী এই স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী এবং সারা পৃথিবীতে নানা কারণে উল্লেখযোগ্য নগরী। কত যে সরকার বাহাদুর এই দেশ পরিচালনা করেছে, এখনো করছে; কিন্তু ঢাকা নগরীর পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের কিছুই হলো না। ঢাকা নগরীর পানি সরবরাহ ও পয়ঃবর্জ্য শোধনের দায়িত্ব ছিল ঢাকা ওয়াসার, এখনো আছে। ‘পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৯৬’-এর মাধ্যমে এর ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ করা হয় এবং বাজার থেকে বিশেষভাবে দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা হয়। অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তি এই পদে কাজ করে গেছেন, এখনো করছেন। এই আইনের পর কুড়ি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি নয় বরং অবনতি হয়েছে। ‘পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৯৬’ অনুযায়ী ১৭(২) ধারায় এই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বলা হয়েছে, ধারা ১৭(২) কর্তৃপক্ষ উহার এখতিয়ারাধীন এলাকা বা এলাকার কোনো অংশবিশেষের জন্য নিম্নলিখিত সব বা যে কোনো বিষয়ে এক বা একাধিক স্কিম প্রণয়ন করিতে পারিবে, যথাÑ (ক) সুপেয় পানি সংগ্রহ, শোধন, পাম্পিং, সঞ্চয় এবং সরবরাহের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা নির্মাণ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ; (খ) স্বাস্থ্য-পয়ঃ এবং শিল্পবর্জ্য সংগ্রহ, পাম্পিং, প্রক্রিয়ায়ন এবং অপসারণের জন্য পয়ঃপ্রণালি ব্যবস্থা নির্মাণ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ; (গ) কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় বিদ্যমান অপ্রয়োজনীয় বা অকেজো নর্দমা বন্ধকরণ বা করান; (ঘ) বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনসহ নিষ্কাশন সুবিধার জন্য ময়লা নির্গমন প্রণালি নির্মাণ ও সংরক্ষণ।

ঢাকা মহানগরীর নিষ্কাশন নিয়ে গত ১৬ জুলাই, ২০১৭ অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান এক বিস্ময়কর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশে খাবার পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ড্রেন পরিষ্কার করে না’ (একটি জাতীয় দৈনিক, ১৭ জুলাই ২০১৭)। উল্লেখ্য, ওয়াসার কাজ শুধু খাবার পানি সরবরাহ নয়, ১৭(২)(খ) ধারা অনুযায়ী নগরীর পয়ঃ এবং শিল্পবর্জ্য সংগ্রহ, পাম্পিং, প্রক্রিয়ায়ন তার কাজ। কিন্তু ওয়াসা তার ড্রেনেজ সার্কেল দিয়ে নগরীর বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের খালগুলো বক্স কালভার্ট নালা নির্মাণ করেছে এবং নগরীর পয়ঃ ও শিল্পবর্জ্য প্রক্রিয়ায়ন না করেই সেখানে ঢেলে দিচ্ছে। ফলে ঢাকা নগরীর আশপাশের জলাভূমি ও চারটি নদী ওয়াসার পয়ঃবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্যরে ভারে চরমভাবে দূষিত হয়ে ত্রাহি ত্রাহি করছে। এই অবৈধ পরিবেশ দূষণের কাজটির জন্য তার প্রতিষ্ঠানই একমাত্র দায়ী। প্রকৌশলী তাকসিম এ খান আবার বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের একজন নেতা। তিনি কি জানেন না, পৃথিবীর কোনো দেশেই বৃষ্টির পানির নালায় পয়ঃবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য ফেলা হয় না। তিনি কেন পয়ঃ এবং শিল্পবর্জ্য প্রক্রিয়ায়নের কাজ করছেন না?

গত ১৬ জুলাই ওই সমন্বয় সভায় ঢাকা সিটি করপোরেশনের ড্রেনগুলোর ময়লা তোলার দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হয়। সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নগরীর সড়ক থেকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ওয়ার্ডভিত্তিক নালাগুলোর মুখ পরিষ্কার করা হয়তো সিটি করপোরেশন দুটি করতে পারে, কিন্তু কয়েকটি ওয়ার্ড মিলে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের বড় নালাগুলো (যেগুলো আগে বড় খাল ছিল) তারা কীভাবে পরিষ্কার করবে? ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন, তিনি এই দূষণ বিষয়ে কোনো আপত্তি তোলেননি এবং ঢাকা মহানগরীর ভেতরে নরাই ও তুরাগ নদীর অববাহিকার বেগুনবাড়ী খাল, ধোলাই খাল, রমনা খাল, আরামবাগ খাল, জিরানী খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, কল্যাণপুর খাল, মহাখালী খাল ইত্যাদি ভরাট করে যে জলাবদ্ধতা তৈরি করা হয়েছে সে ব্যাপারে কিছুই বলেননি। ঢাকা নগরীতে ৩৮টিরও অধিক খাল ছিল যার মধ্যে ওই খালগুলো প্রধান। এগুলোসহ অন্যান্য খাল অবিলম্বে দখলমুক্ত ও ভরাটমুক্ত করা দরকার।

ঢাকা নগরীর জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়া অতীতের খালগুলো উদ্ধার করে ডিজাইন মোতাবেক কেটে চওড়া করা ও উন্মুক্ত করা দরকার। ‘বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০০০’-এর ৬(১)(ক) ধারায় বলা আছে, ধারা ৬। বোর্ডের কার্যাবলি।-(১) সরকার কর্তৃক গৃহীত জাতীয় পানিনীতি ও জাতীয় পানি মহাপরিকল্পনার আলোকে এবং এই ধারার অন্যান্য বিধানাবলি সাপেক্ষে বোর্ডের নিম্নবর্ণিত কার্যাবলি সম্পাদন ও তদুদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও মূল্যায়নসংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণ করিতে পারিবে, যথাÑ কাঠামোগত কার্যাবলি : (ক) নদী ও নদী অববাহিকা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন, সেচ ও খরা প্রতিরোধের লক্ষ্যে জলাধার, ব্যারাজ, বাঁধ, রেগুলেটর বা অন্য যে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ ...। এই আইনের ধারা ১৫ অনুযায়ী ১০০০ হেক্টরের অধিক এলাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাকেই দেওয়া হয়েছে। ঢাকা নগরীর ওয়ার্ডগুলো কোনো কোনোটি ১০০০ হেক্টর এলাকার কম, যেখানে নিষ্কাশন নালাগুলো ওয়াসা নির্মাণ করেছে। কিন্তু যে কোনো দুটি ওয়ার্ডের মিলিত এলাকা ১০০০ হেক্টরের বেশি, যার জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডই আইনগতভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাই তাকেই এই কাজ করতে দেওয়া দরকার।

য় ম ইনামুল হক : চেয়ারম্যান, জল পরিবেশ ইনস্টিটিউট

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে