বন্যা প্রতিরোধ ও মানুষ মানুষের জন্য

  অজয় দাশগুপ্ত

১৯ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৭, ০০:১৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের নেতাদের কথা মানুষ বিশ্বাস করে না। এই অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে কীভাবে? এককালে মানুষ তাদের নেতাদের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত থাকত। শুধু কি তাই? একটি দেশ স্বাধীন করার জন্য যে পরিমাণ শক্তি ও সামর্থ্যরে প্রয়োজন সেটা না থাকার পরও মানুষ নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যুদ্ধ তাও পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী বর্বর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। সেটা সম্ভব হয়েছিল কি কেবল মুক্তি চাইত বলে? দুনিয়ার কত দেশে এমন মুক্তি চাওয়ার কাহিনি বুটের তলায় চাপা পড়ে আছে। ভারত-পাকিস্তানের দিকেই তাকিয়ে দেখুন। আজ সুযোগ পেলে কাল তিব্বত চীনের মায়া ত্যাগ করবে। মিজোরাম নাগাল্যান্ডের কথা ভাবুন। আজ চান্স দিলে কাল করাচি মোহাজেরারা দখলে নেবে। আছে বেলুচিস্তানের সমস্যা। তার পরও তারা পারেনি। কারণ নেতাদের সে ক্যারিশমা নেই। আমাদের যেসব নেতা করতে পেরেছিলেন তারা আজ বিগত। এখন যারা নেতা নামধারী তাদের সকালের কথার সঙ্গে বিকালের কথা মেলে না।

প্রশ্ন জাগছে, দেশে যদি টাকার সমস্যাই না থাকে তো বন্যাদুর্গত এলাকায় রিলিফ আর খাদ্য দেওয়ার দরকার পড়ছে কেন? আর যদি তা দুর্গত এলাকা বলে হয়ে থাকে তবে কোনো একটা প্যাকেটের জন্য এতগুলো হাত আসে কোন দুঃখে? কেন এত এত মানুষের অসহায় মুখ ভাসছে মিডিয়ায়? টাকা নেই তা কিন্তু নয়। না থাকলে সামান্য একটা খবরের জন্য অর্থমন্ত্রী ২০০ কোটি টাকার মানহানির মামলা করার ভয় দেখাতেন না। টাকা যে কী পরিমাণ আছে সেটা কেলেঙ্কারির পর মন্ত্রীদের কথায়ও স্পষ্ট। ১শ-২শ কোটি টাকা গায়েব হলে তারা ফুঁ মেরে উড়িয়ে দেন। এমনও শুনি রিজার্ভের টাকা গেলেও নাকি কোনো পরোয়া নেই। তেমন দেশে বন্যা হলে মানুষের ঋণ মাফ হতে পারে। তাদের বাসাভাড়া বা বিদ্যুতের বিল মাফ করা যেতে পারে। তাদের কিছু টাকা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু খাবারের জন্য লাইন আর সাহায্যের হিড়িক দেখে এটা বোঝা যায়, গর্জন অনুযায়ী বর্ষণ হচ্ছে না।

এই গর্জনটা কিন্তু তাদেরই বেশি, যারা বহিরাগত। বহিরাগত বলতে বোঝাচ্ছি যারা আমাদের চেনা আওয়ামী লীগের কেউ ছিলেন না। এদের দাপটে এখন আসলরা কথা বলতে পারে না। তা পারুক আর না পারুক আমাদের সমস্যা সেসব মানুষকে নিয়ে যারা বিশ্বাস করে বসে আছেন দেশ এগোচ্ছে। সামনে সোনালি দিন। দেশ যে এগোচ্ছে সেটা অন্ধও টের পায়। কিন্তু সেই সঙ্গে সবাই যে এগোচ্ছে না সেটাও টের পাচ্ছে তারা। আমাদের সমাজকে আমরা বলি মায়ার সমাজ। বলি মায়ার দেশ। আসলে কি তাই? সেদিন আমার এক বন্ধু ফোনে বলছিল, ভারী বর্ষণের ফলে ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাওয়া মা-মেয়ে-ছেলে ভেসে গেছে নর্দমার স্রোতে। এই স্রোত কোনো দলের তৈরি নয়। কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ হওয়ার পরও চলে কীভাবে? কেন সেই জায়গাটা কালভার্ট দিয়ে বা দেয়াল তুলে নিরাপদ রাখা হয় না? টাকাখোর কমিশনার আর মেয়রের দায়িত্ব কি বাড়ি বসে হিসাব কষা? না মাঝে মাঝে এগুলোর খবর নেওয়া? কোনো কথাই আজকাল কেউ শোনে না। বিশ্বজিৎ হত্যার রায় নিয়ে কদিন লাফালাফির পর সামাজিক মিডিয়া নীরব। অথচ সুযোগ ছিল একে কেন্দ্র করে সামাজিক আন্দোলনে এমন হত্যাকা-ের পুনরাবৃত্তি রোধ করার। সেটা এখন আর এজেন্ডায় নেই। সবার মন পড়ে আছে কতগুলো লাইক মিলল আর কত শেয়ার হলো, কে কত বড় সেলিব্রেটি হলেন সে ধান্ধায়।

সামাজিক মিডিয়ার শক্তিও আজ নিঃশেষ হওয়ার পথে। এই যে বন্যা, এই যে পানিবন্দি মানুষ, এদের প্রতি কর্তব্যের বাইরে মনোযোগ কোথায়? আগে পাড়ায়-পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায় মানুষ গান গেয়ে কেঁদেকেটে টাকা তুলতেন। হয়তো তার দরকার পড়ে না। কিন্তু যাদের হাতে টাকা তাদের তো সে মনমানসিকতা নেই। মনস্তত্ত্বের সহজ হিসাব হচ্ছে, যে কেউ প্রথমে শখের বশে কোনো অপরাধ বা খারাপ কাজ করে পার পেলে ধীরে ধীরে সেটাই তার স্বভাব হয়ে ওঠে। যারা টাকার পাহাড় গড়েছেন তারা খুব ভালো জানেন এই সম্পদ তারা খেয়ে শেষ করতে পারবেন না। আর দরকার নেই তাদের। তার পরও তারা দিতে পারবেন না। তাদের রক্তে-ধমনিতে শুধু নেওয়া আছে। এই আনিসুর রহমানরা জীবনেও দানিসুর রহমান হতে শিখবে না।

তাই আজ মানুষের পাশে মানুষকেই দাঁড়াতে হবে। সরকারে যারা ভালো লোক, বিশেষত আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বদান্যতা ও ভালোবাসা অবিচল। তিনি নিশ্চয়ই ডাক দেবেন। কিন্তু কথায় বলে বেনিবার পো মায়ের কানের দুল বানানোর সোনায়ও খাদ দেয়। দেশের এই বন্যার পেছনে যদি ভারতের নদীর পানি ছেড়ে দেওয়া কাজ করে থাকে সে ব্যাপারে কথা বলার উদ্যোগ নেই কেন? কেন আমাদের পানিমন্ত্রী ছুটে যাচ্ছেন না? আমাদের জীবনের বদলে কি কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে হবে? আর যদি অনিয়ম ও প্রকৃতি বৈরী হয়ে থাকে তারও বিহিত করা দরকার। মন খারাপ হলেও দেখছি একটি খাবারের প্যাকেট পাওয়ার জন্য একগাদা মানুষ একগলা জলে দাঁড়িয়ে। আজ বাংলাদেশের লাখো লাখো মানুষ দেশে-বিদেশে এত সচ্ছল, এত অর্থবান তাদের টাকায়ও খাবারের সহজ সমাধান হতে পারে। কিন্তু কে মানে কার কথা? আপনি ডাক দেন সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যাবে প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের এক প্রথিতযশা কথাশিল্পী ফেসবুকে মুক্তিযুদ্ধে জেগে থাকার নামে টাকা তোলেন। তার পর যারা হিসাব চায় তাদের বন্ধু তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলেন। তো কে কাকে বিশ্বাস করবে বলুন।

বলছিলাম অবিশ্বাসের কথা। নেতা বা রাজনীতির প্রতি মানুষের এমনিতেই কোনো অনুরাগ নেই। এসব বন্যা বা দুর্যোগে তাদের অবহেলা আর ব্যর্থতা রাজনীতিকে আরও বেশি প্রশ্নময় করে তুলবে। সরকারি এমনকি বিরোধী দল কেউই এখনো সেভাবে এগিয়ে আসতে পারেনি। সরকারি দল মানতে চায় না যে পরিবেশ বা বন্যা আসলেই ভয়াবহ। আর বাকিদের কাজ বন্যার নিরসন নয়, সরকারের পতন। মাঝখানে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস।

আসুন সবাই মিলে পাশে দাঁড়াই। মানুষের শক্তিতে তৈরি হোক বন্যা উত্তরণের পথ। প্রমাণ হোক মানুষ মানুষের জন্য।

য় অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক, সিডনি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে