পরিচালকমুখী ঈদের নাটক

  ইশতিয়াক আহমেদ

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:২০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঘটনাটা ঘটে গেছে গত ঈদেই। মোস্তফা সরয়ার আর তার ভাইব্রাদারের ছবিয়াল রিইউনিয়নে আদনান আল রাজীব এক মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প বলে মোটামুটি বদলে দিয়েছেন দর্শক রুচির দীর্ঘ সময়ের ট্রেন্ড। ঈদ যে শুধু হাসির গল্প নিয়েই আসবে না, তা খুব একটা ব্যাপকভাবে আসেনি এতদিন। বিচ্ছিন্নভাবে হয়েছিল কিছু, কিন্তু আলোচনায় আসেনি তেমন।

এবারও সেই যাত্রার সফলতা দেখা গেছে ঈদের নাটকগুলোতে। সে ক্ষেত্রে আলোচনা, প্রতিক্রিয়া আর সমালোচনায় এগিয়ে মিজানুর রহমান আরিয়ানের নাটক ‘বড়ছেলে’।

সেই মধ্যবিত্ত গল্প, পাওয়া না পাওয়ার হতাশা আর নিদারুণ কষ্টের আবহে নির্মিত নাটকটি হঠাৎ করেই চলে আসে আলোচনার শীর্ষে। খুব আহামরি কিছু না হলেও দর্শক সেন্টিমেন্ট পুরোটাই স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে। সেক্ষেত্রে সফলতার কৃতিত্ব অবশ্যই পেতে পারেন পরিচালক মিজানুর রহমান আরিয়ান। এ নাটকের কাছে ম্লান হয়ে গেছে তার অন্যান্য নাটক। আলোচনায় তেমন না এলে কিছু নাটক অসাধারণ হয়েছে তার মান, গল্পে আর নির্মাণে। সেগুলোর একটি আবু শাহেদ ইমনের ‘গোল্ডেন এ প্লাস’। সমসাময়িক গল্প এবং সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের প্রত্যাশার ভার নিয়ে নির্মিত এই নাটকের সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, এই নাটকে কোনো তারকা ছিল না। না কোনো অভিনেতা, না অভিনেত্রী। কিছু নাটকের গল্পই যে হয়ে ওঠে নাটকের প্রধান চরিত্র, ইমনের ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ তার বড় প্রমাণ। টানটান গল্প আর নিখুঁত নির্মাণে সিনেমায় সফল আবু শাহেদ ইমন তার মেধার ঝলকানি আরেকবার দেখালেন ছোটপর্দার এই গল্প নির্মাণে। দর্শক এ নাটকের পর যদি আবু শাহেদ ইমনকে নিয়মিত ছোটপর্দায় নির্মাতা হিসেবে দেখতে চান তা হলে হয়তো দোষের কিছু হবে না।

তবে এবারের ঈদে সবচেয়ে সুন্দর নাটকটি নির্মাণ করেছেন সৈয়দ আহমেদ শাওকী। নাটকের নামÑ ‘কথা হবে তো?’ অস্থির সময়ে স্বস্তির গল্প সিরিজে এ নাটকটি ছিল গল্পের দিকে খুব ঝরঝরে ও পরিচ্ছন্ন। এই গল্পের জন্য প্রথমেই বিশেষ ধন্যবাদের দাবি রাখেন গাউসুল আজম শাওন। নির্মাণে দারুণ যতœ এবং অসাধারণ সমন্বয় ছিল নাটকজুড়ে। সহজ-সরল নাগরিক জীবনের গল্প যে সুন্দর করে বলা যায় তা দেখিয়েছেন নির্মাতা শাওকী।

এবারের ঈদে অন্যতম আকর্ষণ ছিল হুমায়ূনপুত্র নুহাশের নাটক। হোটেল অ্যালবাট্রোস। গল্প, মেকিং ও অন্য সব বিষয় খুব সুন্দর ছিল এ নাটকে। কিন্তু দর্শকের অনেকে এর গল্প ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন, কারণ গল্পে ডিটেলিংয়ের কিছুটা অভাব ছিল। তার সঙ্গে সম্পাদনার কাঁচি হুটহাট করেই নিয়ে গেছে এদিক-সেদিক। সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক পরিম-লে নির্মিত নাটকের মতোই ছিল নুহাশের হোটেল, যা নুহাশের সুন্দর আগামীর কথা জানান দেয়।

রেদোয়ান রনি গত ঈদে ব্যতিক্রমী কনসেপ্টের গল্প মিঃ জনি নির্মাণ করে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। এবার নির্মাণ করেছেন সম্পূর্ণ জীবনঘনিষ্ঠ এবং সম্পর্কের গল্প পাঞ্চক্লিপ। রেদোয়ান রনির আলাদা একটা দর্শকশ্রেণি ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে আছে। এবারের নাটকও ছিল উপভোগ্য।

অন্যধারার গল্প নির্মাণে দিদার মাহমুদ বিগত অনেক বছরই ছিলেন সিদ্ধহস্ত। এবারও তিনি তার আয়োজন নিয়ে ছিলেন অনন্য। স্বৈরাচার ও প্রেমিকা নাটকে তিনি অসাধারণ এক টপিক নিয়ে কাজ করেছেন। এ রকম আইডিয়া এবং এর সফল চিত্রায়ণ উল্লেখ করার মতো।

এমন ঘরানার আরেকটি নাটক ছিল দাস কেবিন। মাসুদ হাসান উজ্জ¦লের এ নাটক আলাদা

মাত্রার ছিল। ভালো নাটকের তালিকায় আরও কিছু নাটক ছিল। মাসুদ সেজানের অ্যাবনরমাল। নাটকটি বিষয়বৈচিত্র্যে ছিল আলাদা এবং উপভোগ্য। মাবরুর রশীদ বান্নার ব্রাদার্স টু নাটকটি ছিল সুন্দর। নির্মাতা হিসেবে সব ধরনের গল্প নির্মাণে বান্না তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন। প্রতিটি উৎসবে।

ভালো ছিল শাফায়াত মনসুর রানার ক্যাফে ট্রিপল নাইন। বিদেশি শর্টফিল্মের অনুপ্রেরণায় নির্মিত হলেও নাটকটি পরিবেশনগত জায়গা থেকে দেশি ঘরানার, যা নির্মাতার মুন্সিয়ানার প্রমাণ দেয়।

ইমেল হকের মায়া ও মমতার গল্প নাটকটি ছিল দর্শকপ্রিয় নাটকের একটি। কমেডি, থ্রিলার নাটকের পর ঘরোয়া গল্প নির্মাণেও যে ইমেল প্রতিনিয়ত পরিপক্ক হচ্ছেন এই নাটক তারই প্রমাণ।

অভিনয়ে এবার দর্শকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ ছিল দীর্ঘদিন পরে টিভিতে আসাদুজ্জামান নূরের উপস্থিতি। নুহাশের নাটকের শেফের চরিত্রে অভিনয় হুমায়ূন আহমেদের সময়েই ফিরিয়ে নিয়ে গেছে দর্শকদের। বুকের ভেতর কিছু পাথর থাকা ভালো নাটকে অসাধারণ অভিনয় করেছেন নুসরাত ইমরোজ তিশা। তার অভিনয় প্রতিনিয়ত তাকেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে এ কথা বলা ছাড়া আর কিছুই বলার থাকে না তাকে নিয়ে। বড় ছেলেতে অভিনয়ে আলোচনার শীর্ষে ছিলেন অপূর্ব, মেহজাবীন। মেহজাবীনের প্রাণবন্ত অভিনয়ই বলা যায় বড়ছেলের আবেগকে ছড়িয়ে দিয়েছে দর্শকদের মাঝে।

নাবিলা ভালো করেছেন, ভালো করেছেন মিথিলা, স্পর্শিয়া, শবনম ফারিয়া। অভিনেতাদের মধ্যে বরাবরের মতো ইরেশ যাকের, মিশু সাব্বির, আফরান নিশোসহ অনেকেই তাদের অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন কয়েক বছর ধরে। বিস্ময়করভাবে আলোচনায় ছিলেন না বিগত কয়েক বছরের ঈদে রাজত্ব করা মোশাররফ করিম।

তবে তরুণদের মধ্যে অনেকেই তার অবস্থান জানান দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে সিয়াম, সৌমিক, শাওন, ইভান। তবে সবার চেয়ে আলাদা করে উঠে আসছেন একজন, তিনি মনোজ কুমার। অভিনয়ে প্রাণবন্ত উপস্থাপনা আর চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার স্বতঃস্ফূর্ততা তাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে এক কথা বলাই যায়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে