লা ল শা প লা র রা জ্যে

  মো. জাভেদ হাকিম

১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৩:০২ | প্রিন্ট সংস্করণ

অনেক বছর ধরে যাই যাই করে যাওয়া হয়নি। এবার সুযোগ পেয়ে গেলাম। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা প্রস্তুত। দুদিনের ট্রিপ। প্রথম দিনটি বরিশালে থাকা ভাগ্নির জন্য বরাদ্দ। পরের দিন দে-ছুট। বুধবার রাতে একজনকে সঙ্গী করে জাহাজে চড়ি। বৃহস্পতিবার যাবে বাকি দুজন। আমি বুড়িগঙ্গা পারের মানুষ হলেও জাহাজে ভ্রমণ আমাকে বাড়তি আনন্দ দেয়। রাত নয়টায় সদরঘাট থেকে জাহাজ ছাড়ে। সব ঠিকঠাক থাকলে বরিশাল ঘাটে পৌঁছাবে ভোর চারটায়। এই দীর্ঘসময় ফেসবুকিং, গপসপ [গল্প-গুজব] আর ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম। জাহাজ সময়মতো পৌঁছল। ঘাট থেকে অটোতে করে চলে যাই শহরের এক নম্বর পুলঘাট ভগ্নিপতির বাসায়। বৃহস্পতিবার পুরো দিনটা তাদের সঙ্গে আড্ডা, নাশতা, বিশ্রাম, ভোজন অতঃপর বিকালে ভাগ্নিকে নিয়ে বরিশাল শহরের প্ল্যানেট পার্কে  ঘোরাঘুরি করি। সাতলা বিলের ফুটন্ত লাল শাপলা দেখতে হলে যতটা সম্ভব ভোরে পৌঁছতে হবে উজিরপুর। বরিশালবাসীর জনপ্রিয় বাহন মাহেন্দ্রর চালক গিয়াসকেও সেভাবেই বলা। আমিও আজ বেশি রাত না জেগে মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। ভ্রমণসঙ্গী ইউশা দুপ্রান্তের ঘুমকাতুরে মানুষগুলোকে সময়মতো জাগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন চারটা। রনিকে ফোন দিই। সে হাসতে হাসতে জানায়, দোস্ত লঞ্চ তো চরে আটকাইয়া রইছে। ইয়া খোদাÑ যেখানে এক মিনিটও সময় নষ্ট করা যাবে না আর সেখানে কিনা এখনো তারা চরে। ওদের জন্য অপেক্ষা না করে ঘাট থেকে ড্রাইভারকে ডেকে এনে ওয়াক্তমতো ফজর নামাজ আদায় করে বের হয়ে যাই। সকালের ফাঁকা রাস্তার সুযোগে প্রায় দেড় ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছাই নয়াকান্দির কালবিলা। সড়কের পাশেই খেয়াঘাট। গাড়ি থেকে নেমেই হুড়মুড় করে গিয়ে নৌকায় বসি। দূর থেকেই চোখে ধরা দেয় লাল শাপলা। ছোট নৌকা এগিয়ে যায়। যতই আগায় ততই যেন চোখে-মুখে মুগ্ধতা ভর করে। এক সময় নিজেকে আবিষ্কার করি বিশাল লালের মাঝে আমি বড় একা। লাল শাপলার রাজ্যে নৌকা চলে, আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি। পুরো সাতলা বিলটিই যেন মনে হয় ফরাসি লাল মখমলে ঢাকা। এক জোড়া যুগল ছাড়া তখনো কোনো পর্যটক আসেননি। ফলে বিলের মাঝে একটা নিঝুম ভাব। মাঝে মধ্যে টুপটাপ মাছের লম্ফঝম্প। সাতলা বিলের চারপাশ পুরোটাই নৈসর্গিক। লাল শাপলার ওষুধি গুণও বেশ। বিশাল আয়তনের এই সাতলা বিল থেকে অনেক পরিবার শাপলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। থৈ থৈ পানির বুকে মাথা উঁচু করে থাকা, সবুজে ঘেরা বিচ্ছিন্ন বাড়িগুলোর সৌন্দর্য বেশ দৃষ্টিনন্দন। আর নারকেল গাছে ঝুলে থাকা থোকায় থোকায় ডাব তৃষ্ণার্থ ভ্রমণপিয়াসীদের বেশ হাতছানি দেয়। মাঝি মতিলাল রায় জানালেন, আগে এখানে সাদা ও বেগুনি শাপলাও ফুটত। এখন আর দেখা যায় না। তিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবৎ এই বিলে এ রকম হাজার হাজার শাপলা ফুটতে দেখেন। আগে তেমন পর্যটক আসতেন না। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আনাগোনাও বাড়তে থাকল। ধীরে ধীরে নৈঃশব্দ্য ভাবটা গিলে খেল হইচই করা পর্যটকদের বিচরণে।
সকাল যখন ৮টা ৩০ মিনিট, তখন সেলফোন বেজে ওঠে। অপর প্রান্ত থেকে জানায়, দোস্ত আমরা ঘাটে। দ্রুত চলে আয়। ওদের জন্য টঙ দোকানে বসে অপেক্ষা না করে গ্রামটা ঘুরে দেখি। বরিশাল থেকে গোপালগঞ্জ যাওয়ার জন্য কচা নদীর ওপর নবনির্মিত সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে এক অন্যরকম প্রকৃতি উপভোগ করি। কচা নদীর চারপাশে অসাধারণ সব নয়নাভিরাম চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য। দোস্তদারদের লঞ্চ চরে আটকে যাওয়া যেন আমার জন্য শাপেবর। বেলা প্রায় সোয়া দশটায় সঙ্গীরা এসে পৌঁছায়। ওদের নিয়ে আবারও পানিতে ভাসি। ততক্ষণে শাপলা অনেকটাই গুটিয়ে যাচ্ছে। তবুও যতটুকু দেখল তা দেখেই ওরা খুশি। হঠাৎ দৃষ্টিতে এলো বিলের একপাশটায় সাদা সাদা কী যেন ভাসছে। মাঝি জানালেন, ডেপ ফুল। নৌকা সেদিকটায় গেল। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে জানতে পারলাম এগুলো চাঁদমালা ফুল। ডেপ আঞ্চলিক নাম। সত্যি বলতে কী, আমরা এই ফুলের নাম কখনো শুনিনি। ফুলের নামও যেমন চাঁদমালা, তার বিচরণও তেমন। মালার মতোই পানিতে ভেসে আছে। চাঁদমালা ফুল দর্শন ভ্রমণে আমাদের বাড়তি আনন্দ দেয়। এবার বিদায়ের পালা।
কীভাবে যাবেন : বাসে ও জাহাজে দুভাবেই যাওয়া যাবে। প্রতিদিন রাত ৮টা ৩০ মিনিট থেকে ৯টা পর্যন্ত বেশ কয়েকটা বিলাসবহুল লঞ্চ সদরঘাট থেকে বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। লঞ্চ টার্মিনাল থেকে রিজার্ভ মাহেন্দ্রে অথবা নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে বাসে উজিরপুর উপজেলার হারতার নয়াকান্দি। বাস ছাড়ে সায়েদাবাদ ও গাবতলী থেকে।
ভাড়া : জাহাজে ডেকে জনপ্রতি ১৫০ টাকা ও কেবিন ১০০০ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকার ওপরে। মাহেন্দ্র সারাদিনের জন্য ২০০০ টাকা। নৌকা ভাড়া দরদাম করে নেওয়াই শ্রেয়।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে