রাতারগুল বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির বন

  প্রভাষক জ্যোতিষ মজুমদার

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাট থানার ফতেপুর ইউনিয়নে দেশের স্বীকৃত একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট (জলার বন) রাতারগুলের অবস্থান। জলাভূমিতে নানা জাতের ছোট ছোট উদ্ভিদ এমনিতেই জন্মে। এসব উদ্ভিদের সঙ্গে বড় বড় পানিসহিষ্ণু গাছপালা জন্মে একটা বড় বনের রূপ ধারণ করার জন্য রাতারগুলকে সুয়াম ফরেস্ট বা জলার বন বলে আখ্যায়িত করা হয়। সিলেট বনবিভাগের উত্তর সিলেট রেঞ্জ-২ এর অধীন রাতারগুল, বাগবাড়ী ও মহেশখাল নিয়ে বিশাল জায়গাজুড়ে এ জলাভূমি। বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৩ সালে রাতারগুলের ৫০৪ একর এলাকাকে বন্যপ্রাণীর জন্য অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১০-২০১১ সালে রাতারগুল বনের ভেতরে পাখির আবাসস্থল হিসেবে ৩ দশমিক ৬ বর্গ কিমি.র একটি বড় লেক খনন করা হয়। শীতকালে এ জলাশয়ে নানান পাখির মিলনমেলা বসে।

সিলেটের সুন্দরবন নামে পরিচিত রাতারগুল ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে প্রস্তাবিত জাতীয় উদ্যান পরিকল্পনায় রাতারগুলে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণের কাজ শুরু করে। সুউচ্চ এই অরক্ষিত টাওয়ার নিয়ে গ্রামবাসী পড়েছেন মহাবিপাকে। অরক্ষিত এই টাওয়ারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওঠানামা করে রাতারগুলে বেড়াতে আসা লোকজন। সংরক্ষিত বন এলাকায় টাওয়ারসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে বনের প্রাকৃতিক পরিবেশকে ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন মানববন্ধন, আমরণ-অনশনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে নামলে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ অনিন্দ্যসুন্দর বন সিলেট থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে। লোনাপানি ও মিঠাপানির বনের মধ্যে বাংলাদেশের সুন্দরবন লোনা পানির বন হিসেবে পরিচিত। সারা বিশ্বের কিছুসংখ্যক মিঠাপানির বনের মধ্যে বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির বন হলো রাতারগুল। এ বনের যেদিকে তাকাবেন সেদিকে মুগ্ধ নয়নে জল আর বনের মিতালী উপভোগ করবেন। বর্ষাকালে অপরূপ সাজে সজ্জিত এ বনের বেশিরভাগ অংশই থাকে ২০ থেকে ৩০ ফুট পানির নিচে। নিস্তব্ধ বনের শীতল পানিতে বৈঠার ছলাত ছলাত শব্দ এবং রোদ আর জলের ঝিকিমিকি আপনাকে হারিয়ে নিয়ে যাবে অজানা এক সুখানন্দে। বর্ষায় রাতারগুল দেখতে খুবই সুন্দর। নৌকায় করে ঘুরে ঘুরে দেখা যেন অনেকটা আমাজানের মতো দেখায়। ভেতরের দিকে জঙ্গলের গভীরতা এত বেশি যে, সূর্যের আলো গাছের পাতা ভেদ করে জল ছুতে পারে না। এ বিশাল বনে রয়েছে জারুল, করচ, কদম, বরন, হিজল, অর্জুন, জালিবেত, মূর্তাবেতসহ জলসহিষ্ণু প্রায় ২৫ প্রজাতির উদ্ভিদ। এ ছাড়া বটগাছ ও শণ জাতীয় গাছের মনমাতানো দৃশ্য দেখতে দেখতে হারিয়ে যাবেন আপন মনে। এখন পর্যন্ত এখানে সর্বমোট ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৭৫ প্রজাতির পাখি এবং ৯ ধরনের উভয়চর প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এ বনের ৮০ শতাংশ এলাকাই উদ্ভিদের আচ্ছাদনে আবৃত। অনিন্দ্যসুন্দর বিশাল এ বনের গাছগাছালির বেশিরভাগ অংশই বছরের সাত মাস পানির নিচে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে পানি শুকিয়ে গেলে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় গোটা বন। শীতের শুরুতেই এখানে অতিথি পাখিদের আনাগোনা শুরু হয়। বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া লেকে চলে পাখপাখালির খেলা। বনজুড়ে চরে বেড়ায় নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। রাতারগুলে যেসব পাখি রয়েছে তাদের মধ্যে সাদাবক, কানিবক, মাছরাঙা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি, ঘুঘু, চিল ও বাজপাখি প্রধান। শীতে মাঝে মধ্যে আসে বিশালাকার সব শকুন। লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে এখানে ঘাঁটি গাড়ে বালিহাঁসসহ নানা জাতের পাখি। শীত মৌসুমে ভিন্নরূপ ধারণ করে এ বন। এ দৃশ্য আসলেই দুর্লভ। এ বনে রয়েছে বিষাক্ত সাপের আনাগোনা। এদের মধ্যে রয়েছে অজগর, গোখরা, জলধরা ও গুইসাপসহ অনেক প্রজাতির সাপ। বনের ভেতর দাপিয়ে বেড়ায় মেছোবাঘ, বানর, কাঠবিড়ালি, ভোঁদড়, বনবিড়াল, বেজি, শিয়ালসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। তা ছাড়া এখানে যেসব সুস্বাদু মাছ পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে রিটা, পাবদা, আইড়, রুই, খলিসা, কালিবাউস ও টেংরাসহ আরও অনেক ধরনের মাছ। নৌকায় বসে বসে যখন নীল আকাশের মেঘের ভেলার দিকে তাকাবেন আর ডানা-ঝাপটানো সাদা বকের পাল দূর দিগন্তে উড়ে যেতে দেখবেন তখন সত্যিই বুকটা ভরে উঠবে এক অন্যরকম ভালো লাগায়।

লেখক : প্রভাষক, ইছামতি কলেজ, জকিগঞ্জ সিলেট

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে