মায়ার টানে মায়াবী ঝরনায়

  আলমগীর হোসাইন

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়ের বুক চিরে ঝরে পড়ছে স্বচ্ছ জলের ঝরনাধারা। পাথর ফেটে শিরশিরে সে শীতল জল প্রবল বেগে আঁছড়ে পড়ছে পাথর থেকে পাথরের গায়। কোমল জলে গা ভিজিয়ে সৌন্দর্যের পিয়াসা মেটাচ্ছে সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটকের দল। ঝরনার গায়ে পাথুরে প্রাকৃতিক সিঁড়ি বেয়ে একেবারে চূড়ায় চড়ে দুরন্ত পর্যটকরা দিচ্ছে আনন্দের হাতছানি। মনে জেগেছে তাদের এভারেস্ট জয়ের আনন্দ। তাই তো জয়োল্লাস পৌঁছে গেছে পাহাড়ের চূড়ায়। এভারেস্ট জয়ের সিকিভাগ কষ্ট হয়তো এখানে নেই, তবু পাহাড়ি গাছের শিকড় ধরে, আর মস্ত বড় সব পাথর ডিঙিয়ে অ্যাডভেঞ্চারময় পাহাড় জয় মোটেই কম আনন্দের নয়। আর এতসব সৌন্দর্য আর মনভোলানো আনন্দের শিহরণ যে স্থানকে ঘিরে, তার প্রতি তো পর্যটকদের মায়া বসারই কথা। পর্যটকদের মায়ার নজর কেড়েছে বলেই হয়তো এ ঝরনার নাম হয়েছে ‘মায়াবী ঝরনা’। বলছি জাফলংয়ের মায়াবী ঝরনার কথা। সিলেটের মাধবকু-, রাতারগুল, উল্লারপার, লালাখাল, জৈয়ন্তিয়া, চা-বাগান, খাসিয়াপুঞ্জি, বিছনাকান্দি আর জাফলং জিরো পয়েন্টের মতোই সিলেটের প্রাকৃতিক বহুরূপী সাজের আরেক অলঙ্কার যেন জাফলংয়ের মায়াবী ঝরনা।

গত ঈদুল ফিতরের তৃতীয় দিন। সকালে হঠাৎ আমার মামার ফোন ‘খইবা ফ্রি আছোনি? জাফলং গেলে তাড়াতাড়ি রেডি অউ !!!’ ঈদের দিন থেকেই জ্বরে জর্জরিত হয়ে বিছানায় শুয়েছিলাম। মামার ফোন পেয়ে আর প্রিয় জায়গা জাফলংয়ের কথা শুনে জ্বর কোথায় যে পালিয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। মাত্র পনেরো-বিশ মিনিটে প্রস্তুতি সেরে নিলাম, প্রায় আধা ঘণ্টার ভেতরে মামাদের নোয়া গাড়ি আমার বাড়ির সামনে হাজির। আমিসহ তখন যাত্রী দশজন। অর্থাৎ নয় মামার সঙ্গে আমি অনলি ওয়ানপিস ভাগনা। প্রচ- জ্বর নিয়ে মায়াবী ঝরনার বরফঠা-া জলে গোসল করে জ্বর কোথায় আরও বেড়ে গিয়ে বিছানায় কাত করে দেবে, তা না হয়ে সেখানে উল্টো জ্বর পানির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। তবে বিকালের দিকে সে জ্বর কিন্তু মামাদের দিকে ধাওয়া করেছিল। সে যাহোক সবকিছু ছাপিয়ে সেই যাত্রা আর আনন্দ আড্ডা যেন এক মধুর স্মৃতি হয়েই স্মৃতির অ্যালবামে যোগ হয়েছে।

ঢাকা বা অন্য শহর থেকে যারা সিলেট আসবেন, তারা কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে নেমেই ধরতে পারেন জাফলংয়ের বাস কিংবা ওসমানী শিশুপার্কের সামনে থেকে জাফলংগামী লেগুনা। গাড়িতে আধা ঘণ্টা চড়েই যে কারো ভ্রমণ ক্লান্তি মিশে যাবে প্রকৃতির বুকেÑ যখন দেখবেন গাড়ির গতির সঙ্গে শহুরে সব দৃশ্য পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির অপরূপ লীলায়। জাফলং যাওয়ার মূল সড়ক সিলেট তামাবিল সড়ক। ঘটেরচটির জৈন্তাগেট পেরিয়ে ৫-৭ মিনিটের মাথায় চিকনাগুল বাজার পেরিয়ে পর্যটকের চোখ আবিষ্কার করবে দুধারে সারি সারি চায়ের বাগান। প্রতিদিন সকালে যে চা না হলে বাঙালির চলেই না, ওই চায়ের বাগান পর্যটক মনে একটা মৃদৃ ধাক্কা তো দেবেই। গাড়ি এখানে থামাবে না, ছুটে যাবে সম্মুখে। তবু নাছোড়বান্দা পর্যটক কিংবা রিজার্ভ গাড়ি হলে নেমে কয়টা ছবি তো তোলাই যায়।

চিকনাগুল পেরিয়ে গেলে হরিপুরের বিস্তীর্ণ হাওরের বুক চিরে বাতাসের সঙ্গে দোল খেয়ে শাঁ শাঁ করে ছুটে চলবে আপনার গাড়ি। সারি সারি গাছ আপনাকে জানাবে সাদর সম্ভাষণ। সারিঘাট বাজারে ঢুকতেই স্বাগতম জানাবে নীলাভ সারী নদীর হালকা হাতছানি। গাড়ি চলতে চলতে মনে হবে অল্প দূরেই মেঘালয় পাহাড়। পাহাড় তবু দেয় না ধরা। গাড়ি চলছেই। কবে ওই পাহাড়ের নাগাল পাওয়া যাবে? রাস্তার মাঝবরাবর হঠাৎ দাঁড়িয়ে যেন পর্যটকদের মনে ভাবনার শিহরণ ঢেলে দেয় জৈয়ন্তীয়া রানি ইরা দেবীর বিশ্রামাগার। জৈন্তাপুর বাজার, শ্রীপুর চা বাগান, তামাবিলে কয়লার কালো কালো স্তূপ আর মেঘালয় পাহাড়ে মেঘের ওড়াওড়ি দেখতে দেখতে প্রায় দেড়-দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে কখন যে জাফলং মামার দোকানে এসে পৌঁছাবেন টেরই পাবেন না। মামার দোকান থেকে ডানদিকে মাত্র ২০ মিনিটি হাঁটলেই জিরো পয়েন্ট।

জাফলংয়ে কেউ যদি শুধু মায়াবী ঝরনা দেখতে যান, তাহলে বাকি সব অতিবোনাস। কেননা সৌন্দর্যের হিরো জিরো পয়েন্ট বরাবরই জাফলং আসা সার্থক করে তোলে। ডাউকির ঝুলন্ত ব্রিজ আর তার নিচ দিয়ে বাংলাদেশ অভিমুখে ছুটে আসা আয়নার মতো ঝকঝকে স্বচ্ছ জলে শরীরের সঙ্গে যেন ভিজে যায় মন। জিরো পয়েন্ট থেকে ১০ টাকায় নৌকা পাড়ি দিয়ে তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে ১৫ মিনিট হাঁটলেই চোখের সামনে চোখ ধাঁধানো ওই মায়াবী ঝরনা। পাহাড়ের একদম ওপর থেকে শুরু হওয়া জলপ্রপাতের বড় পাথরের কারণে প্রথমে ভাগ হয়ে গেছে দুই ভাগে। দুই ভাগ থেকে চার ভাগে। এভাবে বিভিন্ন খ-ে ভাগ হয়ে নিচে নেমেছে তীব্র সুন্দর ঝরনার মধ্য দিয়ে। নিচের ওই ছোট ঝরনাতেও একসঙ্গে চার-পাঁচজন দাঁড়িয়ে গোসল করা যায়। এ এক অপূর্ব দৃশ্য। বড় বড় পাথর এমনভাবে সাজানোÑ যেন মনে হয় সিঁড়ি। ওই সিঁড়ি বেয়ে একেবারে পাহাড়ের ওপর ঝরনাটার কাছে চলে যান যে কেউ।

ঝরনাটি সম্পূর্ণ পাথুরে হওয়ায় আছে পা পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা, সতর্ক না হলে যে কোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। তাই উপরে ওঠা বা নামার সময় পর্যটককে এদিকে অবশ্যই দিতে হবে বিশেষ খেয়াল। একটু সতর্ক হয়ে ঝরনার দ্রুতগতির জলে গা ভিজিয়ে একমুঠো স্বপ্ন ছোঁয়ার মতো আনন্দে শিহরিত হোক আমার মতো শত-সহস্র পর্যটকমনÑ এটিই আমার প্রত্যাশা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে