যুগে যুগে শরণার্থী

  ফয়সাল চৌধুরী স্বরূপ

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:২৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

শরণার্থী- শব্দটা শুনলে প্রথমেই মনে আসে কিছু করুণ, অসহায় মুখ। জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয় রাজনৈতিক, সামাজিক বা অন্য কোনো কারণে। ’৭১-এর উত্তাল সময়ে আমাদের দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় সাত কোটি মানুষ নিজের দেশছাড়া হয়ে আশ্রয় খুঁজছে অন্য দেশে। প্রতিটা দিন কাটাতে হচ্ছে মানবেতরভাবে। কী আছে তাদের ভাগ্যে? বিভিন্ন দেশের শরণার্থী সংকট নিয়ে জানাচ্ছেন- ফয়সাল চৌধুরী স্বরূপ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শরণার্থী : প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা বেলজিয়াম আক্রমণ করলে প্রায় আড়াই লাখ বেলজিয়াম অধিবাসী গৃহহারা হয়। আবার সোভিয়েত জার্মান আক্রমণ করলে প্রচুর জার্মান, বিশেষত ইহুদিরা দেশত্যাগ করে। শুধু সোভিয়েতে আশ্রিত ছিল বিভিন্ন দেশের প্রায় ৬০ লাখ লোক । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভিন্ন দেশে আশ্রিত সর্বহারা শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক কোটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শরণার্থী : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিভিন্ন দেশে আশ্রিত সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, যুগোসেøাভাকিয়া, জার্মান শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ছয় কোটি। এসব শরণার্থীর পুনর্বাসিত করতে লেগেছিল পরবর্তী প্রায় ১০ বছর। জীবন বাঁচাতে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া থেকে অসংখ্য ইহুদিরা বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে আশ্রয় নেয়। এই বিশ্বযুদ্ধে প্রায় এক কোটি সাধারণ মানুষ প্রাণ হারায়।

১৯৭১-এ বাঙালি শরণার্থী : ’৪৭-এ দেশভাগের ফলে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয় ভারতবর্ষ। প্রায় দেড় হাজার মাইলের দূরত্ব থাকলেও বর্তমান বাংলাদেশ চলে যায় পাকিস্তানের সঙ্গে। ২৪ বছর ধরে পাকিস্তান শাসনের ইতিহাস বাংলাদেশের জন্য শোষণের ইতিহাস। ’৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ক্ষমতা ছাড়েনি শাসকরা। ’৭১-এর মার্চে বর্বর পাকিস্তানি সেনারা এ দেশে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। পাকিস্তানিদের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে প্রাণভয়ে ভারতে পাড়ি জমায় প্রায় এক কোটি বাঙালি। নয় মাস বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে থেকে যুদ্ধ শেষে অনেকে দেশে ফিরে আসে, অনেকে ভারতে নতুন জীবন শুরু করে উদ্বাস্তু হিসেবে।

ফিলিস্তিন : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিরা আসতে থাকে ফিলিস্তিনে। দাবি করে তাদের জন্য স্বতন্ত্র দেশ ইসরায়েলের। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের ওপর বিভিন্ন সময় আক্রমণ করে ইহুদিরা। ১৯৪৮-এ ইহুদিদের সৃষ্ট দাঙ্গায় কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। এর পর বিভিন্ন সময়ে ফিলিস্তিন, মিসর ও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের সঙ্গে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের ওপর অত্যাচার যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি চলতে থাকে তাদের ভূমি দখল। যার ফলে বাড়তে থাকে বাস্তুহারা ফিলিস্তিনির সংখ্যা। বর্তমানে সিরিয়া, মিসর, লেবাননসহ বিভিন্ন আরব দেশে আশ্রয় পাওয়া ফিলিস্তিনি শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ।

ইরাকি শরণার্থী : সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম ও ক্ষতিকর পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ ঠেকানোর অজুহাতে ২০০৩-এ ইরাক আক্রমণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অত্যাধুনিক অস্ত্র আর বোমার আঘাতে ধ্বংস হয় শহরকে শহর, প্রচুর সাধারণ মানুষ প্রাণ হারায় মার্কিনিদের আক্রমণে। প্রায় আট বছর ধরে ধ্বংসযজ্ঞ চলার পর ২০১১ সালে ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের শুরু থেকেই দেশ ছাড়ে প্রচুর ইরাকি। ২০০৩ থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ ইরাক ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে শরণার্থী হিসেবে পাড়ি জমিয়েছে। ২০ লাখের বেশি মানুষ তাদের ঘর, কর্মক্ষেত্র সব হারিয়ে নিজ দেশেই বর্তমানে শরণার্থীর মতো।

সিরিয়ান শরণার্থী : ২০১১ সালে আরব বিশ্বের দেশে দেশে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়লে তার রেশ আসে সিরিয়াতেও। সিরিয়ার ক্ষমতায় থাকা বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে জনতা। আন্দোলন ঠেকাতে সেনাবাহিনী নামায় আসাদ সরকার। যার ফলে বহু মানুষ হতাহত হয়। এর পর বিদ্রোহী কুর্দিশ বাহিনী ও জিহাদি সালাফি বাহিনী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে গৃহযুদ্ধে পতিত হয় সিরিয়া। প্রতিদিন প্রাণ হারাতে থাকে হাজারো মানুষ, যার ফলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় সিরিয়ানরা। গত ছয় বছরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ তুরস্ক ও লেবাননে শরণার্থী হিসেবে রয়েছে ৫০ লক্ষাধিক সিরিয়ান নাগরিক।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা শরণার্থী : বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী যাদের অধিকাংশই ধর্মীয়গতভাবে মুসলিম, এরাই মূলত রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা সংকট বহু পুরনো, সেই মধ্যযুগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে এই অঞ্চলের মানুষের ওপর নির্যাতন হয়ে আসছে। কখনো মগদের আক্রমণ, কখনো জাপানি সেনাদের অত্যাচার আবার কখনো সরকার বাহিনীর নিপীড়নের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা নিজেদের রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশি সীমান্ত কাছাকাছি হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় পেয়েছে বাংলাদেশে। সম্প্রতি রাখাইন রাজ্যে সরকার বাহিনী কর্তৃক অগ্নিকা-, হত্যা, ধর্ষণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এ বছরই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা।

জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) জাতিসংঘের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এর দায়িত্ব হচ্ছে জাতিসংঘ বা কোনো দেশের সরকারের অনুরোধে স্বদেশহীন, বাস্তুহারা, বিতাড়িত, মাতৃভূমিচ্যুত শরণার্থীদের রক্ষা করা, তাদের অবস্থানকে সমর্থন জোগানো ও নিজ দেশে ফেরা বা যথোপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। বর্তমান হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি ২০১৬ সাল থেকে কর্মরত আছেন। তিনি ১১তম হাইকমিশনার। ইউএনএইচসিআরের সাবেক প্রধান ছিলেন জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব ও পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টোনিও গুতারেস। তিনি ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ওই দায়িত্ব পালন করেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের সদর দপ্তর অবস্থিত। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫০ সালের ১৪ ডিসেম্বর। ১৯৫৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ ইউএনএইচসিআর।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে