মিন অং হ্লাইং এক বিতর্কিত সেনানায়ক

  অনলাইন ডেস্ক

২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনের নৃশংস অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিটি হচ্ছেন দেশটির সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল

মিন অং হ্লাইং। মিয়ানমারের সংবিধানের খসড়া করেছে সামরিক বাহিনী। এই সংবিধান অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীর ওপর সু চির

কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বরং সামরিক বাহিনী দেশটিতে স্বাধীন। ফলে কাউকে তোয়াক্কা না করে একে একে হাজারো নৃশংসতার

জন্ম দিচ্ছেন সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। আরও বিস্তারিত জানাচ্ছেনÑ আজহারুল ইসলাম অভি

একনজরে মিন অং হ্লাইং

কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আগে জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে একজন মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে। বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকের মতে, মানবাধিকার রক্ষায়, গণতন্ত্র পুনর্গঠন, শান্তি ও আধুনিকায়নের জন্য সে একটি বড় বাধা। মিন অং হ্লাইং জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৫৬ সালে তাভয়ে। ১৯৭২ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন এবং ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত তিনি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। এটাও বলা হয়Ñ তিনি পড়াশোনার সময় ও তার সহপাঠীদের কাছ থেকে বর্জিত হয়েছিলেন তার চাপা স্বভাবের কারণে। তার তেমন কোনো বন্ধুবান্ধবও ছিল না। ২০১১ সালের ৩০ মার্চ থেকে তিনি নতুন করে মিয়ানমার আর্মড ফোর্সের কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শুরু করেন।

মিন অং হ্লাইংয়ের অপকর্মের কিছু নমুনা

মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী বিশ্বের অন্যতম নৃশংস মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সেনাবাহিনী। মিন অং হ্লাইংয়ের সেনাবাহিনী ঘরোয়া বিভিন্ন সংঘাতেও যুক্ত ছিল নানা সময়ে। কাচিন ও শান রাজ্যে প্রচুর বেসামরিক মানুষ মেরেছিল তার নিয়ন্ত্রণাধীন সেনাবাহিনী। জাতিগত নিধনের জন্য মিন অং হ্লাইং সম্পূর্ণরূপে দায়ী। তার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জাতিসংঘ তদন্ত চালাচ্ছে। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথেও প্রধান বাধা তিনিই।

রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে লুকোচুরি

২০১৪ সালে মিয়ানমারের ম্যাগাজিন ইউনিটি উইকলি সরাসরি অভিযোগ করে যে, মিয়ানমারের ম্যাগওয়ে অঞ্চলে সেনারা রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ১৯৯১ সালে এ নিয়ে জোরদার অভিযোগ ওঠার পর তা অস্বীকার করে মিয়ানমার। এ সংবাদ প্রকাশের জন্য ম্যাগাজিন ইউনিটি উইকলির প্রধান ও এক সাংবাদিককে ১০ বছরের জন্য জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

শিশুদের হাতেও তুলে দেয় মারণাস্ত্র!

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি রিপোর্টে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর শিশু সেনাদের প্রকৃত সংখ্যা বলা মুশকিল। তবে জোর করে শিশুদের সেনাবাহিনীতে নাম লেখানো যোদ্ধার সংখ্যা ৭০ হাজারেরও বেশি! এদের সবার বয়সই ১৮ বছরের নিচে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এই শিশুদের হাতে তুলে দিয়েছে মারণাস্ত্র। তারা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নামে, তাদের সে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়Ñ এ রকম অভিযোগ এসেছে শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে।

সু চির সঙ্গে সেনাপ্রধানের

সম্পর্ক

রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চালানো নির্যাতনের কারণে বিশ্ব সমালোচনা, পর্যবেক্ষণ, তিরস্কার ও নিন্দার মুখে রয়েছেন অং সান সু চি। জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান জায়েদ রাদ আল হোসেইন রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতাকে জাতি নিধনের এক ন্যক্কারজনক উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সু চিকে তোয়াক্কা না করে যেভাবে নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে দেশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেনাবাহিনীর হাতে এবং তা স্পষ্টতই প্রতীয়মান। দেশের নেত্রী, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির হাতে দেশের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। ১৯৬২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার শাসন করে সামরিক জান্তা। এ সময় তারা গণতন্ত্রের পক্ষে আন্দোলন করায় গ্রেপ্তার করে অং সান সু চিকে। সেই সামরিক বাহিনী এখনো দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী, পুলিশ ও সরকারের মন্ত্রিসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এর ফলে করার মতো কিছুই আসলে নেই সু চির হাতে। সিডনিতে লোউয়ি ইনস্টিটিউটের ইস্ট এশিয়া প্রোগ্রামবিষয়ক রিসার্চ ফেলো আরোন কোনলি বলেন, মিয়ানমারের সংবিধানের অধীনে কমান্ডার ইন চার্জ (মিয়ানমার সেনাবাহিনীর) নিজেই নিজের বস। তিনি অং সান সু চির কাছে রিপোর্ট করেন না। দেশের নিয়ন্ত্রণ অথবা আন্তর্জাতিক সম্মানের মধ্যে কোন একটা পছন্দ করে বেছে নিতে বলা হলে সেনাবাহিনী প্রধান হয়তো নিয়ন্ত্রণকেই বেছে নেবে। অং সান সু চির প্রয়াত স্বামী ছিলেন একজন ব্রিটিশ। তাই তাদের দুই সন্তানও ব্রিটিশ নাগরিক। এ কারণে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি সু চি। কিন্তু তিনি যাতে মূল দায়িত্ব পালন করতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন সে জন্য একটি বিশেষ পদ সৃষ্টি করা হয়। তা হলো স্টেট কাউন্সেলর। কিন্তু সংবিধানের অধীনে কমান্ডার ইন চিফ, যিনি সেনা কর্তৃপক্ষেরও প্রধান, তিনি প্রেসিডেন্টেরও উপরে। তার মধ্যে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত আসনে কাকে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে সেটা নির্ধারণ করেন তিনি। এ ছাড়া সংবিধানের অধীনে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কর্তৃত্বও কমান্ডার ইন চিফের হাতে। মিয়ানমারে ফের সেনা অভ্যুত্থানের শঙ্কা রয়েছে বলেও জানান বিশ্লেষকরা। ‘সু চির অবস্থান নড়বড়ে। মিয়ানমারে গণতন্ত্র এখনো ভঙ্গুর। সু চি ২০১৫ সালের নির্বাচনে জয় পেলেও এখন সেনাশাসন ফেরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ডার্ক ফোর্স। একটি ভুল পদক্ষেপেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হতে পারেন এবং মিয়ানমারে গণতন্ত্রের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটতে পারে।’

বৃহস্পতিবার টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিয়ানমারের ক্যাথলিক ধর্মগুরু কার্ডিনাল চার্লস মং বোসেনা এসব কথা বলেন। এ থেকেই আন্দাজ করা যায়, কেমন হতে পারে সু চির সঙ্গে সেনাপ্রধানের সম্পর্ক।

রোহিঙ্গা নিয়ে সেনাপ্রধানের ভাবনা

সম্প্রতি জেনারেল মিন অং হ্লাইং ফেসবুকে এক কমেন্টে বলেন, “রাখাইনের ওই জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি চায়, কিন্তু এরা কখনই মিয়ানমারের নৃগোষ্ঠী নয়। ‘বাঙালি’ ইস্যু এখন জাতীয় সংকট, তাই সত্য স্থাপনে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে”Ñ মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী নিন্দার মধ্যেই সেনাবাহিনীর পক্ষে এসব কথা বলেন তিনি। মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান রোহিঙ্গা নিধনের বিষয়ে পুরো দেশকে একত্রিত হয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। অথচ এই তিনিই বলেন, এ দেশে রোহিঙ্গাদের কোনো শিকড় নেই। তিনি জানান, উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে তাদের ‘নির্মূল অভিযানের’ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জঙ্গিদের বের করে দেওয়া। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট পুলিশের বেশ কিছু চৌকিতে হামলার পর সেখানে অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরুর পর থেকে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে ঢুকেছে। তবে রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর সৃষ্ট সহিংস পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে ঢোকা রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই বলছে, সন্ত্রাস দমনের নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা করছে এবং তাদের ঘরাবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। জাতিসংঘ বলছে, রোহিঙ্গাদের ‘জাতিগতভাবে নির্মূল’ করছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা নিয়ে এই সেনা শাসকের যে কোনো মাথা ব্যথা নেই, বরং তাদের উৎখাতই যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য, তা এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে