সভ্যতা ধ্বংসে সক্ষম যত মারণাস্ত্র

  আজহারুল ইসলাম অভি

১৭ এপ্রিল ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৭, ০৯:৫৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে শুক্রবার জিবিইউ-ফরটিথ্রি,বি বোমা নিক্ষেপ করে মার্কিন বাহিনী। এই বোমাকে বলা হয় মাদার অব অল বম্বস। লম্বায় ৩০ ফুট বোমাটির ওজন ১১ টন, গায়ে লেখা রয়েছে এমওএবি অর্থাৎ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স ওয়ার বাস্ট, বাংলায় বলা যেতে পারে ব্যাপক বিধ্বংসী বায়ু-বিস্ফোরক। এ রকম আরও অসংখ্য বোমা রয়েছে বিভিন্ন দেশে, যা সভ্যতা ধ্বংস করে দিতে পারে। সেসবই জানাচ্ছেন, আজহারুল ইসলাম অভি

হাইড্রোজেন বোমা : পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বোমাটি হচ্ছে, হাইড্রোজেন বোমা। হাইড্রোজেন বোমা চালনা কিংবা তার এক্সপ্লোসনের জন্য যে পরিমাণ শক্তি লাগে তার পুরোটাই আসে নিউকিয়ার ফিউশন নামক নিউকিয়ার বিক্রিয়া থেকে। মূলত ফিউশন ব্যবহার করে হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করা হয়ে থাকে। সূর্য যেভাবে শক্তি সংগ্রহ করে হাইড্রোজেন বোমাও ঠিক একই প্রক্রিয়ায় বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। হাইড্রোজেনের ভারী আইসোটপগুলো চাপ সৃষ্টি করলে প্রচ- বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয়। এ বোমাগুলো হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমা থেকেও কখনো কখনো হাজার গুণ শক্তিশালী হয়ে থাকে। একবার বিস্ফোরণের পর তাপ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পারমাণবিক বিচ্ছুরণ বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে এর শক্তি বৃদ্ধি এবং ধ্বংসমতাও বিস্ময়কর। এ পর্যন্ত পরীা চালানো সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমা হচ্ছে ‘জার বোমা’। ১৯৬১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বোমাটির পরীা চালিয়েছিল, যার সমতা ছিল ৫০ হাজার কিলোটন বা ৫০ মেগাটন।

নিউকিয়ার বোমা: এই বোমায় ব্যবহৃত হয় ইউরেনিয়াম আর প্লুটোনিয়াম। এদের ভারী নিউকিয়াসগুলোকে আঘাত করা হয় নিউট্রন দ্বারা। আঘাত করার ফলে নিউকিয়াস দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একে বলা হয় নিউকীয় বিভাজন। ইউরেনিয়ামের নিউকিয়াস ভেঙে তৈরি হয় বেরিয়াম আর ক্রিপ্টনের নিউকিয়াস। সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড তাপশক্তি। এ সময় আবার কিছু মুক্ত নিউট্রনের জন্ম হয়। শুরু হয় চেইন রিঅ্যাকশন। এভাবে বোমাটির অভ্যন্তরে বিস্ফোরণ চলতে থাকে আর বের হয়ে আসে প্রচণ্ড শক্তি। ঘটে পারমাণবিক বিস্ফোরণ। পারমাণবিক বোমার জন্য ব্যবহৃত হয় ইউরেনিয়াম-২৩৫ বা প্লুুটোনিয়াম। ভেতরে তাদের আলাদা আলাদা জারে রাখা হয়। কাজ হলো এদের যে কোনোভাবে এক করে দেওয়া। যদি একটি আরেকটির সংস্পর্শ পায়, তবেই শুরু হয়ে যাবে ফিউশন। ফলে প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হয়। ঘটে প্রচ- বিস্ফোরণ। বর্তমানে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এবং মজুদ রয়েছে এমন দেশগুলো হলোÑ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, ভারত ও পাকিস্তান। এ ছাড়া এটা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, উত্তর কোরিয়া, ইরান, ইসরায়েলেও পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।

নিউট্রন বোমা : এর একটি বৈজ্ঞানিক নামও আছে আর তা হলো বহযধহপবফ ৎধফরধঃরড়হ বিধঢ়ড়হ । নিউট্রন রেডিয়েশন অস্ত্র নামেও পরিচিত। আসলে নিউট্রন বোমায় নিউট্রন আর গামারশ্মি বের হয়ে আসে। আর গামারশ্মি বা এক্স-রে যে কোনো প্রাণীর জন্য চরম তিকর। অতিরিক্ত মাত্রায় বের হয়ে আসার কারণে প্রাণীর জৈবিক দেহ মৃত্যুবরণ করে। নিউট্রন বোমায় ব্যবহৃত হয় ইউরেনিয়াম ও লিড আর তার সঙ্গে অল্প পরিমাণে ট্রিটটিয়াম। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি ঘরবাড়ি ও গাছপালার কোনো তি করে না। শুধু প্রাণী ধ্বংস করে। এক থেকে দুই কিলোটনের প্রতিটি বোমার সাইজ। প্রচ- বিস্ফোরণ আর তাপের সৃষ্টি করে এটি। তাই ১৩০-৩৫০ মিটার এলাকার সবকিছু এটি ধ্বংস করে দিতে পারে। আর অন্যকিছু ধ্বংস করে এক-দুই কিলোমিটার ব্যাসার্ধে। মূলত পারমাণবিক বোমার বিকল্প হিসেবেই একে তৈরি করা হয়েছে। তাই এর ধ্বংসলীলা শুধু প্রাণীদের ওপরই, কিন্তু অবকাঠামোর কোনো পরিবর্তন করে না। ১৯৫৮ সালে স্যামুয়েল টি কোহেন এ ধরনের বোমার ধারণা প্রথম দেন। ১৯৬৩ সালে নেভাদার মাটির নিচে প্রথম পরীা করা হয়। তবে জিমি কার্টার ১৯৭৮ সালে এর উৎপাদন বন্ধ করে দেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ১৯৮১তে এর পুনঃউৎপাদন শুরু করেন। আমেরিকা অবশ্য বলছে, এখন তাদের কাছে আর এ ধরনের কোনো বোমা নেই।

ফাদার অব অল বম্বস : পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অপারমাণবিক বোমা আছে রাশিয়ার হাতে। যে বোমার নামকরণ করা হয়েছে ‘ফাদার অব অল বম্বস’। ‘মাদার অব অল বম্বস’ থেকে এর ওজন কম হলেও ধ্বংসের মতার দিক থেকে এটি চার গুণ বেশি ধ্বংস বয়ে আনতে পারে। ২০০৭ সালে রাশিয়া এ ধরনের বোমার প্রথম পরীা চালায়। ফাদার অব অল বম্বসের ওজন ৭ হাজার ৫৮ কেজি হলেও ৪৪ টন বিস্ফোরক বহন করতে এটি সম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এমওএবি বহন করতে পারে ১১ টন বিস্ফোরক।

মাদার অব অল বম্বস : ইরাক যুদ্ধ সামনে রেখে ৯ হাজার ৮০০ কেজি ওজনের এ বোমাটি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যদিও সে যুদ্ধে এ বোমা ব্যবহারের প্রয়োজন হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের। এর সাঙ্কেতিক নাম জিবিউ-৪৩। আসল নাম ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট বা এমওএবি। এমওএবি বলা হয় কারণ এটি মাদার অব অল বম্বস নামে পরিচিত। ২০০৩ সালে প্রথম পরীামূলক বিস্ফোরণ হয় ফোরিডায়। বিস্ফোরণের আগে মাটি ভেদ করে ২০০ ফুট এবং কংক্রিট ভেদ করে ৬০ ফুট গভীরে ঢুকে যাওয়ার মতা রয়েছে বোমাটির। আর ভয়াবহতার দিক থেকেও এ বোমাটি ভয়ঙ্কর। কারণ এক মাইল এলাকার মধ্যে যে কোনো ল্যবস্তুতে আঘাত হানার পর এটি ১৮ হাজার পাউন্ড টিএনটি মতাসম্পন্ন বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। কলম আকৃতির বোমাটির সামনের দিকটি ধারালো আর দুটো পাখাও রয়েছে এর শরীরে। এর বিস্ফোরণশক্তি ১১ টন ট্রাইনাইট্রোটোলুইন বা টিএনটির সমান, এমওএবির বিস্ফোরণে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা তিগ্রস্ত হতে পারে, মাটির নিচে প্রায় ৩০০ ফুট এলাকাও ধ্বংস করতে পারে জিপিএস নিয়ন্ত্রিত মাদার অব অল বম্বস, এক হাজার ইয়ার্ড পর্যন্ত এলাকায় সবকিছু ধ্বংস করার মতা, এক মাইল রেডিয়াস পর্যন্ত মানুষ, তাঁবু, পলকা বাড়ি, গাড়ি এবং জিপ উড়িয়ে দিতে পারে, ১ দশমিক ৭ মাইল পর্যন্ত এলাকায় মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে শক ওয়েভ, দুই মাইল পর্যন্ত এলাকায় শ্রবণশক্তি চলে যেতে পারে।

নাপাম বোমা : নাপাম বোমা তৈরি করা হয় ন্যাপথ্যানিক অ্যাসিড ও পামিটিক অ্যাসিড এই দুইয়ের মিশ্রণে। এই দুই অ্যাসিড মিশে এক ধরনের জেলিজাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি হয়। এই জেলির সঙ্গে পেট্রল বা গ্যাসোলিন মিশিয়ে এক ধরনের থলথলে দাহ্য পদার্থ তৈরি করা হয়। সেটাকে বিস্ফোরকের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা হয় নাপাম বোমা। বোমা ফুটে চারদিকে আগুন তো ছড়াবেই, তার সঙ্গে সঙ্গে এই জেলির মতো থলথলে পদার্থ কাদা বা আলকাতরার মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে। এ জেলি একবার কোনো কিছুর সঙ্গে লেগে গেলে আর সহজেই তা ছোটানো যায় না, আলকাতরারই মতো লেগে থাকে। জ্বলন্ত এই নাপাম মানুষের গায়ে, চামড়ায় বা কাপড়ে লাগলে চরম সর্বনাশ হয়ে দাঁড়ায়। কাপড় পুড়ে ভেদ করে চামড়ার সঙ্গে আটকে যাবে, এরপর চামড়া পুড়ে পুড়ে গলে খসে যাবে, কিন্তু সেই নাপাম ছাড়ানো যাবে না। অনেক অনেক হতভাগ্যের চামড়া-মাংস ঝলসে, পুড়ে অ্যাসিডের রিঅ্যাকশনে হাড় পর্যন্ত ফুটো হয়ে গিয়েছিল। পানিতেও এর কোনো নিষ্পত্তি নেই। পানি দিলেও কিছু হবে না, যতণ না পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিস্ফোরক পুড়ে শেষ হবে। ১৯৪২ সালে এ বোমা তৈরি করা হয়। ১৯৪৫ সালে আমেরিকা ৬ লাখ ৯০ হাজার পাউন্ড নাপাম টোকিওতে ছাড়ে। এ বোমা বিশ্বের অন্য অনেক দেশের যুদ্ধে ব্যবহৃত হলেও, ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকানরা নিষ্ঠুরতার সঙ্গে এটির সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে।

এমকে-৪১ : এমকে-৪১ হচ্ছে তিন ধাপের একটি পারমাণবিক অস্ত্র। এই অস্ত্রের আবিষ্কারক আমেরিকা। ১২ ফুট লম্বা ও ৪ ফুট ব্যাসার্ধের এ বোমাটির ওজন ১ হাজার ৬৭০ পাউন্ডস। চার মাইল ব্যাসার্ধবিশিষ্ট একটা জায়গায় যাতে আগুনের কুণ্ডলী দিয়ে ভরে ফেলা যায় এ রকম চিন্তা করে এ বোমাটি তৈরি করা হয়েছিল। নিেেপর জায়গা থেকে আট মাইল দূরের কোনো ইট-কাঠের স্থাপনা সফলভাবে ভাঙতে সম এই বোমা।

রেডিওলজিক্যাল ওয়েপন : এটিকে আসলে মূলধারার পারমাণবিক অস্ত্রের পর্যায়ে ধরা যায় না, কারণ এটিতে পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট শক্তি বিস্ফোরণের জন্য কাজ করে না। আর এ জন্যই হয়তো এর এই অদ্ভুত নামকরণ। এটি এক প্রকার Radial dispersion devices (RDD). কোনো সাধারণ রাসায়নিক বিস্ফোরকে যদি ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়ামের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থ মিশিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই বিস্ফোরকের বিস্ফোরণের ফলে সেটার স্বাভাবিক য়তির বাইরে অতিরিক্ত যে ঘটনাটা ঘটে তা হলো বিস্ফোরণ-আক্রান্ত অঞ্চল ও বস্তুতে তেজস্ক্রিয় দূষণ। বিস্ফোরণ অঞ্চল ও বিস্ফোরণে তিগ্রস্ত প্রাণী, উদ্ভিদ ও বস্তুতে তেজস্ক্রিয় দূষণ দেখা দেয়। আক্রান্ত অঞ্চলের মানুষ বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে, এমনকি মারাও যেতে পারে। তেজস্ক্রিয় দূষণে দূষিত বস্তু থেকেও অল্পমাত্রার তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নির্গত হয়, যা মানবদেহের জন্য তিকর। এভাবে সাধারণ বিস্ফোরক অস্ত্রের সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তার মিশেলে তৈরি হয় ‘ডার্টি বম্ব’ বা রেডিওলজিক্যাল বোমা। আমেরিকার রিপোর্ট মতে, ইরাক ১৯৮৭ সালে এই বোমা তৈরি করে।

কেমিক্যাল ওয়েপন : এই অস্ত্র তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে, যা সাধারণত রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করবে। এসব অস্ত্র আবার নানাভাবে বিভক্ত। কিছু কেমিক্যাল ওয়েপন আঘাত করে রক্তে, আবার কিছু মানুষের নার্ভ সিস্টেম নষ্ট করে দেয়। যেমন হাইড্রোজেন সায়ানাইড হচ্ছে এমন একটি পদার্থ, যা রক্তকে নষ্ট করে দেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কেমিক্যাল ওয়েপনের হামলা হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ১৬ মার্চ। জানা যায়, ইরাক এই হামলা চালিয়েছিল এবং এতে ৫ হাজার লোক মারা যায় এবং ১০ হাজারের বেশি আহত হয়। বায়োলজিক্যাল ওয়েপন : প্রায় ২ হাজার বছর ধরে এই অস্ত্রের ব্যবহার হয়ে আসছে। বলা হয়ে থাকে আধুনিক শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ অস্ত্র হচ্ছে এটি। যেমন অ্যানথ্রাকস একটি অন্যতম অস্ত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়। বায়োলজিক্যাল ওয়েপন এতটাই ভয়াবহ হতে পারে যে, এক গ্রাম বটুলিনাম ১০ লাখ মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্রের একটি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে