পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ কিছু দুর্ঘটনা

  আজহারুল ইসলাম অভি

১৭ জুলাই ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৭, ০০:৪৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই মানুষ সম্মুখীন হয়েছে নানা রকম দুর্ঘটনার। এসব দুর্ঘটনার কোনোটি প্রাকৃতিক, কোনোটি আবার ভুলবশত অথবা মনুষ্যসৃষ্ট। কারণ যা-ই হোক, দুর্ঘটনা মানেই যে ভালো কিছু না, তা আমাদের সবার জানা। এতে তি হয় জীবনের, বিপন্ন হয় মানবসমাজ, তি হয় অর্থের। এসব তি বয়ে বেড়াতে হয় দিনের পর দিন। আর্থিক ও প্রাণহানির দিক থেকে বিবেচনা করে আজকে তুলে ধরা হলো পৃথিবীর ভয়াবহ এবং আলোচিত কিছু দুর্ঘটনার কথা। অনলাইন থেকে তথ্য নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন- আজহারুল ইসলাম অভি

চেরনোবিল দুর্ঘটনা
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল স্থানীয় সময় অনুযায়ী রাত ১টা ২৩ মিনিটে ইউক্রেন ও বেলারুশ সীমান্তে অবস্থিত পরমাণু কেন্দ্রটির চতুর্থ (বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট রিঅ্যাক্টরের সংখ্যা চারটি) রিঅ্যাক্টর থেকেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত। দুর্ঘটনাটি মূলত ঘটেছিল নিরাপদ শীতলীকরণের ওপর একটি পরীা চালানোর সময়। রাতের শিফটে দায়িত্বরত কর্মীরা ভুল করে রিঅ্যাক্টরটির টার্বাইনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শীতল পানি প্রবাহিত করেন। ফলে সেখানে বাষ্প কম উৎপাদিত হয়। এতে করে রিঅ্যাক্টরটি উত্তপ্ত হতে থাকে এবং একপর্যায়ে প্রচ-গতিতে বিস্ফোরণ ঘটে। পরপর প্রায় একই সঙ্গে ঘটা দুটি বিস্ফোরণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চতুর্থ রিঅ্যাক্টরের ওপরের প্রায় এক হাজার টন ওজনের কংক্রিটের ঢাকনা সরে যায় এবং ছাদ ভেঙে যাওয়ার ফলে এক বিশাল গহ্বরের সৃষ্টি হয়। দুর্ঘটনার ২০ ঘণ্টা পর বাইরের বাতাস ঢুকে রিঅ্যাক্টরের দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে সেখানে বিরাট অগ্নিকা-ের সূত্রপাত হয়। এ আগুন ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এতে করে পারমাণবিক বিক্রিয়ায় তৈরি পদার্থ পরিবেশে প্রায় এক কিলোমিটার উঁচু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল এবং প্রচুর পারমাণবিক ধুলো পরিবেশে দূষণ ছড়িয়েছিল। পরিবেশে পারমাণবিক পদার্থ বেরিয়ে পড়েছিল প্রায় ৫০০টি ১৯৪৫ সালে হিরোশিমার ওপর আমেরিকার ফেলা পারমাণবিক বোমার সমান। পারমাণবিকভাবে সক্রিয় মেঘ এই দুর্ঘটনার ফলে উদ্ভূত হয়ে ইউক্রেন, বেলোরাশিয়া, রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়া, গ্রেট ব্রিটেনে এমনকি পূর্ব আমেরিকার ওপরও গিয়েছিল। এতে তি হয় ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

টাইটানিকডুবি
পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত দুর্ঘটনা টাইটানিক ডুবে যাওয়া। ১৯১২ সালে সাগরের বুকে গা ভাসিয়েছিল বিলাসবহুল সেই প্রমোদতরী। ওই সময় টাইটানিকই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রমোদতরী। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, টাইটানিক তার প্রথম যাত্রাতেই ডুবে যায়। টাইটানিকটি ১৯১২ সালে ব্রিটেনের সাউদাম্পটন থেকে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে রওনা হয়েছিল। কেউ ভাবেনি টাইটানিক ডুবে যাবে। কিন্তু ১৫ এপ্রিল মধ্যরাতে বিশাল এক বরফ খ-ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে যায় টাইটানিক। এতে পানিতে ডুবে মারা যান প্রায় দেড় হাজার যাত্রী। টাইটানিক নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল তৎকালীন ৭০ লাখ ডলার, যা আজকের হিসাবে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সমান।

চ্যালেঞ্জার এক্সপ্লোশন
স্পেস শাটল চ্যালেঞ্জার দুর্ঘটনা হচ্ছে, একটি মহাকাশ যানসংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা, যা সংঘটিত হয় ১৯৮৬ সালের ২৮ জানুয়ারি। সেদিন উড্ডয়নের ৭৩ সেকেন্ড পর যান্ত্রিক সমস্যার কারণে স্পেস শাটল চ্যালেঞ্জার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় এবং এর আরোহী সাতজন মহাকাশচারী মারা যান। এর ধ্বংসাবশেষ পতিত হয় আটলান্টিক মহাসাগরে, যুক্তরাষ্ট্রের ফোরিডা উপকূলের কাছে। দুর্ঘটনাটি ঘটার সময় ছিল উত্তর আমেরিকার পূর্বাঞ্চলীয় আঞ্চলিক সময় বেলা ১১টা ৩৯ মিনিট, বিকাল ৪টা ৩৯ মিনিট (ইউটিসি)। এই মহাকাশ ফেরির প্রতিস্থাপন খরচ ২ বিলিয়ন ১৯৮৬ সালে (বর্তমানে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার)। এ দুর্ঘটনায় মোট তি হয়েছিল প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

স্পেস শাটল কলম্বিয়া
মহাকাশ কলম্বিয়া ২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারিতে টেক্সাসে ধ্বংস হয়। শাটলটির মূল খরচ ১৯৭৮ সালেই ছিলো ২ বিলিয়ন, যা আজকের হিসাবে ডলার ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন। এ ছাড়া তদন্তের জন্য আরও প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল এবং গবেষণায় প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। সব মিলিয়ে বর্তমানের ১৩ বিলিয়ন ডলারের সমমান অর্থের তি হয়েছিল, যার পুরোটাই বহন করেছিল আমেরিকান ইনস্টিটিউট অ্যারোনটিকস ও অ্যাস্ট্রোনটিকস। দুর্ঘটনার কারণ ছিল পাখার নিচে ছোট একটা ছিদ্র।

পাইপার আলফা অয়েল রিগ
তেল উত্তোলনকারী কোম্পানির দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে পাইপার আলফা অয়েল রিগের দুর্ঘটনা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। একটা সময় এ কোম্পানি পৃথিবীর সর্বোচ্চ তেল উত্তোলনকারী ছিল। দৈনিক ৩ লাখ ১৭ হাজার ব্যারেল তেল উত্তোলন করত। ১৯৮৮ সালের ৬ জুলাই এ কোম্পানিতে ঘটে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনা। তেল উত্তোলনের পাইপে তরল গ্যাস উৎপাদন বন্ধের জন্য নিত্যদিন ১০০টি সেফটি ভাল্ব খুলে পরীা করতেন টেকনিশিয়ানরা। কিন্তু ওইদিন ভুলক্রমে একটি বাল্ব লাগাতে ভুলে যান তারা। রাত ১০টার দিকে একজন টেকনিশিয়ান তরল গ্যাস পাম্প করার জন্য স্টার্ট বোতাম চাপলে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটে। ২ ঘণ্টার মধ্যে ৩০০ ফুট উচ্চতার প্লাটফর্মের পুরোটায় আগুন ধরে যায়। শেষ পর্যন্ত পুরো প্লাটফর্ম ধসে যায় এবং এতে ১৬৭ জন শ্রমিক নিহত হন। আর্থিক তি হয় ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের।

এক্সন ভ্যালদেজ অয়েল স্পিল
১৯৮৯ সালের ২৪ মার্চ আলাস্কার প্রিন্স উইলিয়াম সাউন্ডে তেল ছড়িয়ে পড়ার ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। বিশাল আকার এক ট্যাংক ডুবে গিয়ে ১১ মিলিয়ন গ্যালন তেল ছড়িয়ে পড়ে। এ তেল আলাস্কার উপসাগরীয় এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। পরিবেশ বিপর্যয়ের মাধ্যমে মানুষের সবচেয়ে বড় তি হিসেবে এ ঘটনাকে দেখা হয়। আর এ ঘটনা প্রাণ ও পরিবেশের ওপরও ফেলেছিল মারাত্মক প্রভাব। এটা খুব আশ্চর্যের ব্যাপার যে, ছড়িয়ে পড়া তেল পরিষ্কারের ব্যয় হয়েছিল ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

বি-২ বম্বার ক্র্যাশ
২০০৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এঁধস ধরৎ নধংব থেকে উড্ডয়নের পর পরই কম্পিউটারের সমস্যার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়। মোট তির পরিমাণ ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

চ্যাটসওয়ার্থে ট্রেন বা মেট্রোলিংক সংঘর্ষ
২০০৮ সালে ১২ সেপ্টেম্বর ঘটে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ক্যালির্ফোনিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের চ্যাটসওয়ার্থে দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ইউনিয়ন প্যাসেফিক মালবাহী ও মেট্রোলিংক যাত্রীবাহী ট্রেনের এই ভয়াবহ সংঘর্ষ পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহ দুর্ঘটনার মধ্যে একটি। এ দুর্ঘটনায় ২৫ জন মারা যান। দুর্ঘটনাটি ঘটে যাত্রীবাহী মেট্রোলিংক ট্রেনটি রেড সিগন্যাল অমান্য করার কারণে। এর জন্য দায়ী করা হয় মেট্রোলিংক ট্রেনের প্রকৌশলীকে, কারণ তিনি তখন লিখিত বার্তা আদান-প্রদানে ব্যস্ত ছিলেন। আর এই দুর্ঘটনার কারণে মেট্রোলিংকের ৫০০ মিলিয়ন ডলার তি হয়।

ট্যাংকার ট্রাক আর কার সংঘর্ষ
২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট একটি প্রাইভেট কার জামার্নির ডরবযষঃধষ ইৎরফমব-এর ওপর ট্যাংকার ট্রাককে আঘাত করে। ট্যাংকার ট্রাক সিঁড়ির রেলিং ভেঙে ৯০ ফুট নিচে পড়ে যায় এবং বিশাল এক বিস্ফোরণ হয়। ব্রিজটি মেরামত করতে খরচ হয় ৪০ মিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তী সময়ে নতুন নির্মাণ খরচ ৩১৮ মিলিয়ন ডলার। এতে মোট তির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫৮ মিলিয়ন ডলার।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে