রোহিঙ্গা: নির্যাতিত এক জাতির নাম

  আজহারুল ইসলাম অভি

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:২৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘মানবাধিকার’ নামে যে শব্দটি আছে, অনেকের কাছেই মনে হতে পারে এখন তা ডিকশনারির শব্দ। অন্তত রোহিঙ্গা নির্যাতনের চিত্র আমাদের তা-ই ভাবতে সাহায্য করে। মানুষের প্রতি সরকারের আচরন কতটা নির্মম হতে পারে, তারই একটি বাস্তব উদাহরণ বর্তমানের রোহিঙ্গা নির্যাতন। জানাচ্ছেন- আজহারুল ইসলাম অভি

মিয়ানমারের ইতিহাস : আগে দেশটি বার্মা নামে পরিচিত ছিল। ১৩ হাজার বছর আগে এ ভূখ-ে প্রথম মানব বসতি স্থাপিত হয়; যা এর পর থেকে আধুনিক মিয়ানমারের সময়কাল পর্যন্ত ব্যাপ্ত। মিয়ানমারের সবচেয়ে প্রাচীন অধিবাসী ছিল তিব্বতীয়-বার্মান ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এই জনগোষ্ঠী পাইয়ু নগর-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। নবম শতকে বার্মার জনগোষ্ঠী নামে এর একদল মানুষ ইরাবতী উপত্যাকা থেকে এসে এ অঞ্চলে বসবাস শুরু করে এবং বেগান রাজ্য (১০৪৪-১২৮৭) স্থাপন করে। এ রাজ্য ছিল ইরাবতী এবং এর আশপাশের অঞ্চলকে একীভূত করে গঠিত একটি স্বাধীন রাজ্য। এই সময়ে বর্মি ভাষা এবং বার্মার সাংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে। ১২৮৭ সালে প্রথম মঙ্গল আগ্রাসনের পর আভা রাজ্য, হান্তাওয়ারি রাজ্য, ও মারুক ইউ রাজ্য ছিল এ অঞ্চলের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। ষোলো শতকে টাউঙ্গু রাজবংশ (১৫১০-১৭৫২) পুনরায় বার্মাকে একীভূত করে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। তবে এই সম্রাজ্য ছিল ক্ষণস্থায়ী। পরবর্তী টাউঙ্গু সম্রাটরা কিছু অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যা সতেরো এবং আঠারো শতকে বার্মাকে একটি সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

আঠারো শতকের দ্বিতীয় অংশে, কনবাউং বংশ (১৭৫২-১৮৮৫) ক্ষমতা দখল করে এবং টাউঙ্গুদের রাষ্ট্র সংস্কার নীতি অনুসরণ করে। তারা আশপাশের অঞ্চলগুলোয় কেন্দ্রীয় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে এবং বার্মাকে এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে স্বাক্ষর রাষ্ট্রে পরিণত করে। এই বংশের শাসনামলে বার্মা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৮২৪-৮৫ সালের অ্যাংলো-বর্মি যুদ্ধের সূচনা হয়। এই যুদ্ধের ফলস্বরূপ বার্মায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

ব্রিটিশরা বার্মায় বেশ কিছু স্থায়ী সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার সাধন করে।

আরাকান রাজ্যের ইতিহাস : আরাকান মিয়ানমারের (বার্মা) একটি অঙ্গরাজ্য। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত এবং অতি প্রাচীনকাল থেকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদীর দক্ষিণ-পশ্চিম মোহনাবেষ্টিত আরাকান-ইয়োমা নামের দীর্ঘ পর্বতশৃঙ্গ আরাকানকে মিয়ানমারের অন্যান্য অংশ থেকে আলাদা করেছে। আরাকানের প্রাচীন নাম ‘রাখাইনপিয়ে’। রাখাইন শব্দটি এসেছে সংস্কৃত রাক্ষস ও পালি শব্দ ইয়াক্কা (যক্ষ) থেকে, যার অর্থ দৈত্য অথবা দানব। বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের আগে অধিকাংশ আরাকানি ছিল প্রকৃতি পূজক।

১৮২৬ সালে ব্রিটিশ শাসনের আগে এটি ছিল একটি ছোট্ট মৎস্যপল্লী। অন্যান্য প্রধান শহর ও বন্দরগুলো হচ্ছে কিয়াকটং, মংডো, বুথিডং ও স্যান্ডোয়ে।

আরাকানিদের প্রধান খাদ্য ভাত। জনসংখ্যা প্রায় দুই মিলিয়ন, এর মধ্যে অধিকাংশই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। জনসংখ্যার অবশিষ্ট অংশের মধ্যে রয়েছে ইসলাম, হিন্দু, খ্রিস্ট এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। সংখ্যার দিক থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পরই মুসলমান সম্প্রদায়ের অবস্থান। এরা চারটি দল যথা তামবুকিয়া, তুর্ক-পাঠান, কামাঞ্চি ও রোহিঙ্গা নামে পরিচিত।

১৬৬৬ সালে চট্টগ্রামের পতনের পর আরাকান রাজ্য সংকুচিত হয়ে একটি ছোট্ট অঞ্চলে পরিণত হয় এবং রাজনৈতিকভাবে বেশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ১৭৩১ থেকে ১৭৮৪ সালের মধ্যে আরাকান রাজ্যকে ১৩ জন রাজা শাসন করেন এবং এ রাজাদের গড় শাসনকাল দুই বছরের বেশি ছিল না। ১৭৮৪ সালে বোদাউপায়ার (১৭৮২-১৮১৯) সময়ে আরাকান রাজ্য বার্মা পর্যন্ত বর্ধিত করা হয় এবং ১৮২৬ সালে এটি ব্রিটিশ ডোমিনিয়নের অংশে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এটি সাময়িকভাবে জাপানের দখলে ছিল। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের যে কারণে বের করে দেওয়া হচ্ছে : ১৯৪৬ সালে যখন ভারত ও পাকিস্তান ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল, তখন আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলিম নেতারা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা করেন। পাকিস্তানের মুসলিম লিগ নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাদের পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করতে আগ্রহ দেখাননি। বর্মি সরকার অভিযোগ উত্থাপন করে যে, রোহিঙ্গারা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সদ্য অভিবাসিত একটি উপজাতি। অতএব তাদের স্থানীয় আদিবাসী গণ্য করে বর্মি শাসনতন্ত্র অনুযায়ী বার্মার নাগরিকত্ব দেওয়া যায় না। মূলত বার্মার প্রকৃত নাগরিক না হওয়াটাই রোহিঙ্গাদের বার্মা থেকে বের করে দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে ধরা হয়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে